বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়তে নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করুন

রহমান মৃধা
রহমান মৃধা রহমান মৃধা
প্রকাশিত: ১০:২০ এএম, ৩১ আগস্ট ২০২৫

মৌলবাদ শব্দটির আদি প্রয়োগ হয়েছিল খ্রিস্টান ধর্মীয় কিছু গোষ্ঠীর মধ্যে—যারা ধর্মগ্রন্থের আক্ষরিক অর্থকে প্রশ্নাতীত সত্য হিসেবে গ্রহণ করতে চাইতেন। পরে এই শব্দটি বিস্তৃত হয়ে সব ধর্মের ভেতরে সেই সব প্রবণতাকে বোঝাতে ব্যবহৃত হতে থাকে, যেখানে ধর্মের মূলনীতিকে অপরিবর্তনীয় ধ্রুবক ধরে রাজনীতি ও রাষ্ট্রপরিচালনায় চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ‘মৌলবাদ’ বিশেষ করে ইসলামকে ঘিরে রাজনৈতিক অভিধানে প্রবেশ করেছে। অথচ ইসলাম নিজেকে মানবমুক্তি ও ন্যায়বিচারের সর্বজনীন দর্শন হিসেবে উপস্থাপন করে। সমস্যার মূলে ধর্ম নয়—বরং ধর্মকে ব্যক্তিগত আচার–বিশ্বাসের জায়গা থেকে সরিয়ে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানানোর প্রবণতা। এর ফলেই মৌলবাদী আখ্যা শুধু ধর্ম নয়, রাষ্ট্রীয় রাজনীতির সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে যুক্ত হয়ে গেছে।

স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগ জাতীয় ঐক্যের ভিত্তি করতে চেয়েছিল ‌‘আমরা সবাই বাঙালি’ সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ওপর। কিন্তু এই একরৈখিক জাতীয়তাবোধে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একাংশ তাদের স্বতন্ত্র ধর্ম–ভাষা–সংস্কৃতির স্থান সংকোচনের শঙ্কা অনুভব করে। পরে বিএনপি ক্ষমতায় এসে উল্টো কৌশল নেয়—ধর্মীয় পরিচয়কে রাষ্ট্রের মুখ্য পরিচয়ে উন্নীত করে; সংবিধানের ভাষা ও রাষ্ট্রের প্রতীকে ধর্মীয় রং গাঢ় হয়। সারকথা—সংস্কৃতি ও ধর্ম দুটোকেই ক্ষমতার রাজনীতিতে হাতিয়ার করা হয়েছে; দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ, অন্তর্ভুক্তি ও নাগরিক সমঅধিকার বারবার গৌণ হয়েছে।

এই ধারাবাহিকতাতেই আসে সংবিধান সংশোধনীর পালা.

• ১৯৭৯ সালের পঞ্চম সংশোধনীতে (জিয়াউর রহমানের সময়) প্রস্তাবনায় ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ যুক্ত হয় এবং ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র জায়গায় ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহ’র ওপর আস্থা–বিশ্বাস’ বসানো হয়।

• ১৯৮৮ সালের অষ্টম সংশোধনীতে (এরশাদের আমলে) সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলাম সংযোজিত হয়।

• ২০১১ সালের ১৫তম সংশোধনীতে আবার ধর্মনিরপেক্ষতা নীতির ঘোষণা পুনর্বহাল হয়, কিন্তু রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম ও ‘বিসমিল্লাহ’—দুটিই থেকে যায়।

ফলে সংবিধানের ভেতরেই এক স্থায়ী দ্বৈততা থেকে যায়: একদিকে ধর্মনিরপেক্ষতার দাবি, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় ধর্মের ঘোষণা।

প্রশ্ন হলো—এই দ্বৈততা কি সত্যিই বাংলাদেশের বাস্তবতার প্রতিফলন? বাংলাদেশে প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ মুসলিম, কিন্তু বাকি প্রায় ১০ শতাংশ হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ আরও নানা ধর্ম–বর্ণ–সংস্কৃতির মানুষ আছেন। ভারতের উদাহরণ নিলে দেখা যায়—সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু হলেও রাষ্ট্রীয় নীতিতে একাধিক ধর্ম ও সংস্কৃতির সহাবস্থান নিশ্চিত করার চেষ্টা হয়, যদিও বাস্তবে ধর্মীয় নিপীড়নের ঘটনা কম নয়। বাংলাদেশেও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সমস্যা নেই, এমন দাবি করা যাবে না। তবে তুলনামূলকভাবে বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ অন্যরকম: এখানে রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে ধর্মকে ঢুকিয়ে দিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠের আধিপত্যকে সাংবিধানিক রূপ দেওয়া হয়েছে, যা প্রকৃত অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয়তাবোধের পথে বাধা।

এখানে একটি মৌলিক সত্য স্বীকার করতে হবে: বিশ্বের কোথাও আজ শতভাগ এক ধর্মের সমাজ নেই। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর ভেতরেও রাষ্ট্র পরিচালনায় কেবল ধর্মীয় বিধানকে মান্য করার কারণে স্থিতিশীলতা আসেনি—বরং প্রায়শই বিভাজন ও সংঘাত বেড়েছে। রাষ্ট্র যদি কারও ধর্ম পালনের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ না করে এবং একইসঙ্গে কারও ধর্ম না–মানার স্বাধীনতাও সুরক্ষিত রাখে—তবেই সত্যিকারের শান্তি ও স্থিতি আসতে পারে।

অতএব ‘সংখ্যাগরিষ্ঠ বনাম সংখ্যালঘু’—এই শূন্য–যোগের খেলাটা শেষ করতে হবে। রাষ্ট্রের ভিত্তি হতে হবে ‘মানুষ আগে, পরিচয় পরে’ নীতিতে।

ধর্ম তাই একান্তই ব্যক্তিগত বিষয়। আধুনিক বিশ্বে যখন আমরা বলি “We are the world, we are the people”, তখন রাষ্ট্রকে ধর্মের গণ্ডি থেকে মুক্ত করে মানবিকতা, নাগরিক অধিকার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর দাঁড় করানো ছাড়া বিকল্প নেই।

আজকের বিশ্বে কোনো দেশই শতভাগ একধর্মীয় সমাজ নয়। মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতে দেখা যায়, ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণা প্রায় সীমাবদ্ধ এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর বৈষম্য ও নিপীড়ন এখনও চোখে পড়ার মতো। পশ্চিমা দেশগুলো—ইউরোপ, আমেরিকা—চেষ্টা করছে বহুধর্মীয় সমাজ বজায় রাখতে; এখানে রাষ্ট্র ধর্মকে ব্যক্তিগত বিশ্বাস হিসেবে দেখে এবং সকল রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও সংবিধান মানুষ-কেন্দ্রিক। এই বাস্তবতা স্পষ্ট করে: আধুনিক রাষ্ট্র ও শান্তিপূর্ণ সমাজের ভিত্তি কখনো ধর্মের ওপর নয়; তা দাঁড়াতে হবে মানবিকতা, নাগরিক অধিকার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও একই পাঠ প্রযোজ্য। স্বাধীনতার মূল চেতনা ছিল—বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র গঠন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক প্রয়োজনে ধর্মকে সংবিধানে ঢোকানো হয়েছে, যার ফলে দেশ বিভক্ত ও দ্বৈততায় ভুগছে। পাশের দেশ ভারত সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু পরিচয়ের বাইরে গিয়ে বহুধর্মীয় সমাজ বজায় রাখার চেষ্টা করছে, কিন্তু বাস্তবতায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর বৈষম্য ও নির্যাতন এখনও চলমান। বাংলাদেশেও একই সমস্যা—কম মাত্রায় হলেও বিদ্যমান।

এই প্রেক্ষাপটে স্পষ্ট হয়, ধর্ম, বর্ণ বা সংস্কৃতির পার্থক্য ভুলে, সংখ্যাগরিষ্ঠতার বাইরে গিয়ে সবার সমান অধিকার নিশ্চিত করাই টেকসই রাষ্ট্রচিন্তার মূল ভিত্তি। আজকের বিশ্বে শান্তিপূর্ণ ও স্থিতিশীল রাষ্ট্র গঠন সম্ভব কেবল তখনই, যখন সংবিধান দাঁড়াবে মানবিকতা, নাগরিক অধিকার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে—কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম নয়।

রহমান মৃধা
গবেষক ও লেখক
(সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন)
[email protected]

এমআরএম/এমএস

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]