‘প্রকৃতি ধ্বংস করে উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদে আত্মঘাতী’

প্রবাস ডেস্ক
প্রবাস ডেস্ক প্রবাস ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৯:২৫ এএম, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
ড. জাসিয়া তাহজিদা

ড. জাসিয়া তাহজিদা, পরিবেশ অর্থনীতিবিদ

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নতুন সরকার গঠনের এই মুহূর্তে জাতির সামনে যেমন রয়েছে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির হাতছানি, তেমনি রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের এক রূঢ় বাস্তবতা। জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ সুরক্ষা ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন-এই তিনটি বিষয় আজ বাংলাদেশের জন্য একে অপরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশ কীভাবে টেকসই উন্নয়নের পথে এগোতে পারে, সে বিষয়ে জাগো নিউজের সঙ্গে কথা বলেছেন পরিবেশ অর্থনীতিবিদ ড. জাসিয়া তাহজিদা।

‘উন্নয়ন এবং পরিবেশকে আর আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। পরিবেশের ক্ষতি মানেই অর্থনীতির ক্ষতি। আমরা যদি প্রকৃতির প্রকৃত মূল্য হিসাব না করি, তাহলে উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদে আত্মঘাতী হয়ে দাঁড়ায়।’ - ড. জাসিয়া তাহজিদা।

জাগো নিউজ: বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলো কী বলে আপনি মনে করেন?

ড. জাসিয়া: বাংলাদেশ এমন একটি দেশ, যেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়-এটি বর্তমান বাস্তবতা। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, নদীভাঙন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং তাপমাত্রার অস্বাভাবিক পরিবর্তন মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও জীবিকার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। এই পরিবর্তন শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। বিশেষ করে উপকূলীয় ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

জাগো নিউজ: জলবায়ু পরিবর্তনকে আপনি কেন একটি অর্থনৈতিক সমস্যা হিসেবেও দেখেন?

ড. জাসিয়া: পরিবেশের ক্ষতি মানেই অর্থনীতির ক্ষতি। আমরা প্রায়ই উন্নয়ন বলতে শুধু অবকাঠামো বা জিডিপি বৃদ্ধিকে বুঝি। কিন্তু বন উজাড়, নদী ও জলাভূমি ধ্বংস, জীববৈচিত্র্যের ক্ষয়-এসবের আর্থিক মূল্য আমরা হিসাব করি না। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সুন্দরবন উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জন্য একটি প্রাকৃতিক সুরক্ষা দেয়াল। এটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে রাষ্ট্রকে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হবে। তাই দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশ সংরক্ষণই সবচেয়ে লাভজনক অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত।

জাগো নিউজ: আপনার গবেষণায় লিঙ্গ ও নারীর ভূমিকা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

ড. জাসিয়া: জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সবার ওপর সমানভাবে পড়ে না। নারী, শিশু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী তুলনামূলকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গ্রামীণ সমাজে পানি সংগ্রহ, খাদ্য প্রস্তুত, পরিবার দেখাশোনার দায়িত্ব নারীদের ওপর বেশি থাকে। যখন পানি সংকট বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়, তখন নারীদের কাজের চাপ ও ঝুঁকি দুটোই বাড়ে। তাই জলবায়ু অভিযোজন ও উন্নয়ন নীতিতে নারীর অভিজ্ঞতা ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত না করলে সেই নীতি কার্যকর হয় না।

জাগো নিউজ: প্রাণি সংরক্ষণ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার গুরুত্ব কীভাবে অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত?

ড. জাসিয়া: জীববৈচিত্র্য শুধু পরিবেশের সৌন্দর্য নয়, এটি আমাদের জীবনের ভিত্তি। বন, নদী ও জলাভূমি কৃষি, মৎস্য ও পর্যটনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। এসব ধ্বংস হলে মানুষের জীবিকা হুমকির মুখে পড়ে। প্রাণি সংরক্ষণ মানে শুধু নৈতিক দায়িত্ব নয়, বরং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। টেকসই বনব্যবস্থাপনা, ইকো-ট্যুরিজম এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা করলে পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়ন একসাথে সম্ভব।

জাগো নিউজ: রাজনীতিবদি ও নীতিনির্ধারকদের জন্য আপনার প্রধান পরামর্শ কী?

ড. জাসিয়া: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি। স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক লাভের জন্য যদি পরিবেশ ধ্বংস করা হয়, তার খেসারত ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দিতে হবে।

নীতিনির্ধারণে করণীয়

• পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (EIA) কঠোরভাবে বাস্তবায়ন এবং EIA কে আরও বেশি পরিবেশবান্ধব ও সমৃদ্ধকরণ। 

• নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি।

• টেকসই কৃষি ও পানি ব্যবস্থাপনা।

• নদী ও জলাভূমি সংরক্ষণ।

• নগর পরিকল্পনায় সবুজ অবকাঠামো।

• স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।

একটি দেশ যদি বৈজ্ঞানিক তথ্য ও সামাজিক ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়, তাহলে উন্নয়ন ও পরিবেশ সুরক্ষা একসাথে সম্ভব। নীতিনির্ধারণে স্বল্পমেয়াদি লাভের চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের আগে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা জরুরি। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ, টেকসই কৃষি ও জলব্যবস্থাপনা, নদী ও জলাভূমি সংরক্ষণ এবং নগর পরিকল্পনায় সবুজ অবকাঠামো অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মতামত ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

জাগো নিউজ: আপনি ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে কেমন দেখতে চান?

ড. জাসিয়া: আমি এমন একটি বাংলাদেশ দেখতে চাই, যেখানে উন্নয়ন মানে শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়, বরং মানুষের জীবনমান, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং পরিবেশ সুরক্ষা। জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো, টেকসই অর্থনীতি এবং নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে।

বর্তমান বিশ্বে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনার যে জোয়ার শুরু হয়েছে, বাংলাদেশকেও তাতে শামিল হতে হবে। আমাদের বিদ্যুৎ খাতের টেকসই রূপান্তর এখন সময়ের দাবি। নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা থাকবে।

jagonews24এআই নির্মিত ছবি

• নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ: সৌর ও বায়ু বিদ্যুতের প্রসারে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া।

• বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: নগর পরিকল্পনায় আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও ‘গ্রিন ইনফ্রাস্ট্রাকচার’ বা সবুজ অবকাঠামো যুক্ত করা।

• ব্লু ইকোনমি ও জীববৈচিত্র্য প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে সমুদ্র, নদী-নালা, খাল-বিল সমূহকে সংরক্ষণ করা।

সমুদ্র অর্থনীতি ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে কেবল নৈতিক নয়, অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিনিয়োগ বাড়ানো।রাজনীতিবিদদের প্রতি ড. তাহজিদার বার্তা অত্যন্ত স্পষ্ট, নীতিনির্ধারণ হতে হবে বৈজ্ঞানিক তথ্য এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে। আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই যেখানে উন্নয়নের জোয়ারে মানুষ, বিশেষত উপকূলবাসী বাস্তুচ্যুত হবে না, বরং তাদের জীবিকা হবে নিরাপদ। জলবায়ু উদ্বাস্তুদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন পরিকল্পনা এবং কৃষি খাতে জলবায়ু সহিষ্ণু প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা নতুন সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।

উন্নয়ন এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি আমাদের অস্তিত্বের প্রশ্ন। ২০২৬-এর নির্বাচনে যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন, তাদের মনে রাখতে হবে-ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যাওয়া আমাদের নাগরিক ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা। ড. জাসিয়া তাহজিদার স্বপ্নের মতো আমরাও দেখতে চাই এমন এক বাংলাদেশ, যা কেবল বড় অবকাঠামোয় নয়, বরং মানবিক মূল্যবোধ ও প্রকৃতির সুরক্ষায় হবে বৈশ্বিক দৃষ্টান্ত।

ড. জাসিয়া তাহজিদা

সহকারী অধ্যাপক, ইউনিভার্সিটি অব উডজ (University of Lodz), পোল্যান্ড

পরিবেশ অর্থনীতিবিদ 

সদস্য, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি

প্রতিষ্ঠাতা, রুহানিয়াহ ফাউন্ডেশন

ই-মেইল: [email protected]

এমআরএম

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]