জোনাকি পোকার আলো

রহমান মৃধা
রহমান মৃধা রহমান মৃধা
প্রকাশিত: ১০:১৩ এএম, ০২ মার্চ ২০২৬
ছবি-এআই দিয়ে বানানো

জানি না গোটা বিশ্বের মানুষ বিষয়টি ঠিক কতটা জানে। কিন্তু যারা নিজ চোখে দেখেছে, যারা আমার মতো অন্ধকার রাতে পথ চলতে গিয়ে জোনাকি পোকার আলোকে সঙ্গী করেছে, তারা কখনো অবিশ্বাস করতে পারবে না। আবার এমন মানুষও আছেন, যারা পুঁথিগত বিদ্যার মাধ্যমে এই আলোকিত কীটপতঙ্গ সম্পর্কে অবগত, তবু এখনও অনেকে বিশ্বাস করতে চান না যে পৃথিবীতে সত্যিই এমন এক প্রাণ আছে, যার ক্ষুদ্র আলো একসময় মানুষের মনে ভরসা জাগিয়েছিল। বিশ্বাস করবেই বা কীভাবে, জোনাকি পোকা তো এখন বিলুপ্তির পথে।

বিশ্বে এখনও অনেকেই মানতে চান না যে মানব সভ্যতার শুরুর দিনে অন্ধকারে আলোর দিশা শুধু আকাশের তারা বা চাঁদের আলোই দেয়নি, মাটির কাছেই জন্ম নেওয়া এই ক্ষুদ্র জীবটিও মানুষের মনে আশা জাগাতে সক্ষম হয়েছিল। আমি বহুবার আমার ছোটবেলার স্মৃতি থেকে সেই গল্প বলেছি। বাংলাদেশে (এ সময়টি তখন পূর্ব পাকিস্তান) থাকাকালীন রাতের অন্ধকারে হাঁটতে গিয়ে কীভাবে জোনাকি পোকা আমার জীবনের সঙ্গী হয়ে উঠেছিল।

গ্রাম বাংলার চারদিকে তখন গভীর অন্ধকার। বিষাক্ত সাপ, বাঘের মতো হিংস্র প্রাণীর আতঙ্ক। সরু কাঁচা রাস্তার দুই পাশে কখনও খোলা নর্দমা, কখনও কাঁটা ভরা ঝোপঝাড়, অচেনা শব্দ আর অদৃশ্য ভয়ের উপস্থিতি। সেই ভয়ংকর দৃশ্যগুলো আমার শৈশবের চলার পথে প্রতিদিন বাধা হয়ে দাঁড়াত ঠিকই, কিন্তু সেই একমাত্র ভরসা জোনাকি পোকাগুলো তাদের আলো দিয়ে আমার যাত্রাটিকে সহজ করে দিত। আজ সেসব কেবল ইতিহাস, স্মৃতির ধুলোয় ঢাকা।

কিন্তু আশ্চর্যভাবে সেই পুরনো দিনের স্মৃতি আবার ফিরে এসেছে হৃদয়ে। শুধু একটিমাত্র কারণে। আজ আমি দেখছি, গোটা পৃথিবী নৈতিক অবক্ষয়ের দিকে এগোচ্ছে। আজ আলো আছে, তবু আমরা ক্রমে অন্ধকারে নিমজ্জিত হচ্ছি। প্রযুক্তি আছে, ক্ষমতা আছে, জ্ঞান আছে, কিন্তু দিশা নেই।

এই ভাবনাগুলোর ভিড়েই হঠাৎ মনে পড়ে যায় সেই ছোট্ট আলো জ্বলা পোকাটির কথা। মনে হয়, আমার জীবনের পথে একসময় যে জোনাকি আলো জ্বেলেছিল, তার অবদান শুধু আমার ব্যক্তিগত স্মৃতি নয়, সেটি ছিল মানুষের আলো খোঁজার ইতিহাসেরই এক নীরব অংশ।

এই কথাগুলো কোনো রূপক নয়। এটি প্রকৃতির এক নীরব বাস্তবতা। জোনাকি পোকা শুধু একটি পোকা নয়, এটি আলো। অন্ধকারে জন্ম নেওয়া এক জীবন্ত বাতি, যা মানুষকে পথ দেখিয়েছে, বিস্মিত করেছে এবং হাজার বছর ধরে চিন্তা করতে শিখিয়েছে আলো আসলে কী এবং অন্ধকার কাকে বলে।

জোনাকি পোকা মূলত বিটল গোত্রের একটি কীট। বৈজ্ঞানিকভাবে এদের বলা হয় ল্যাম্পিরিডি। পৃথিবীতে দুই হাজারেরও বেশি প্রজাতির জোনাকি পোকা রয়েছে। এরা মূলত উষ্ণ ও আর্দ্র অঞ্চলে বাস করে। নদীর ধারে, ধানক্ষেত, বনাঞ্চল, গ্রামবাংলার ঝোপঝাড় ছিল একসময় তাদের স্বাভাবিক আবাস।

জোনাকি পোকার সবচেয়ে বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য তার আলো। এই আলো কোনো আগুন নয়, কোনো বিদ্যুৎ নয়। এটি এক ধরনের জৈব রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া। পোকাটির দেহে লুসিফেরিন নামের একটি রাসায়নিক পদার্থ, অক্সিজেন ও লুসিফেরেজ নামের একটি এনজাইমের সংযোগে আলো উৎপন্ন হয়। এই আলো উৎপাদনের সময় প্রায় কোনো তাপ তৈরি হয় না। বিজ্ঞানীরা একে বলেন ঠান্ডা আলো। মানুষের বানানো বাতির তুলনায় এটি সবচেয়ে কার্যকর আলোর উৎসগুলোর একটি।

এই আলো শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়। জোনাকি পোকা এই আলো ব্যবহার করে যোগাযোগের জন্য। স্ত্রী ও পুরুষ জোনাকি পোকা আলোর সংকেতের মাধ্যমে একে অপরকে চেনে। কোন আলো কতক্ষণ জ্বলবে, কত বিরতিতে জ্বলবে, তার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে ভাষা। প্রকৃতির নিজস্ব সংকেত ব্যবস্থা।

জোনাকি পোকার জীবনচক্রও শিক্ষণীয়। ডিম, লার্ভা, পিউপা এবং পূর্ণাঙ্গ পোকা এই চার ধাপে তাদের জীবন সম্পন্ন হয়। লার্ভা অবস্থায়ও অনেক জোনাকি আলো দিতে পারে। অর্থাৎ আলো দেওয়া তাদের জীবনের বিলাসিতা নয়, এটি তাদের অস্তিত্বের অংশ।

মানব সভ্যতার ইতিহাসে জোনাকি পোকার উপস্থিতি গভীর। জাপানের সাহিত্যে জোনাকি আলো ক্ষণস্থায়ী জীবনের প্রতীক। চীনা কবিতায় এটি নীরব প্রেমের ভাষা। বাংলা লোককথায় জোনাকি রাতের সাথী। শিশুদের গল্পে এটি আশার চিহ্ন। পাশ্চাত্য সাহিত্যে এটি বিস্ময় ও কৌতূহলের প্রতীক হিসেবে এসেছে। বিজ্ঞান জন্ম নেওয়ার বহু আগে মানুষ জোনাকি পোকার আলো দেখে প্রশ্ন করতে শিখেছিল।

কিন্তু আজ এই আলো ক্রমশ নিভে যাচ্ছে। কৃত্রিম আলো, রাসায়নিক কীটনাশক, জলাভূমি ধ্বংস, বন উজাড় এবং শহুরে আগ্রাসন জোনাকি পোকার অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলেছে। অনেক এলাকায় যেখানে একসময় রাতে শত শত জোনাকি দেখা যেত, সেখানে এখন নীরব অন্ধকার।

এই অন্ধকার শুধু প্রকৃতির ক্ষতি নয়, এটি মানুষের মানসিক দারিদ্র্যেরও লক্ষণ। কারণ জোনাকি পোকা আমাদের শেখায় আলো মানে দখল নয়, আলো মানে দান। তারা আলো জ্বালায় কাউকে অন্ধ করার জন্য নয়, কাউকে পথ দেখানোর জন্য।

শিক্ষণীয় দিকনির্দেশনা এখানেই। আমরা যদি সত্যিই আলোকিত হতে চাই, তাহলে আমাদের জোনাকি পোকার কাছ থেকে শিখতে হবে। শক্তি থাকা মানেই দাপট দেখানো নয়। জ্ঞান থাকা মানেই অন্যকে ছোট করা নয়। প্রকৃতি আমাদের বারবার বলেছে, সবচেয়ে শক্তিশালী আলো সেটাই যা নিঃশব্দে পথ দেখায়।

জোনাকি পোকার আলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়, অন্ধকার যত গভীরই হোক, আলো আসতে পারে ক্ষুদ্রতম এক জীবনের মধ্য দিয়েও। প্রশ্ন হলো, আমরা সেই আলোকে বাঁচতে দিচ্ছি কি না।

রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
[email protected]

এমআরএম/জেআইএম

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]