‘গেম হোম’ থেকে মুক্তিপণ: লিবিয়া হয়ে ইতালি যাত্রার নির্মম বাস্তবতা
বাংলাদেশ থেকে লিবিয়া হয়ে ইতালি পৌঁছানো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মিক্সড মাইগ্রেশন সেন্টারের (এমএমসি) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই রুটের ভয়াবহ চিত্র, যেখানে প্রতি বছর হাজার হাজার বাংলাদেশি যুবক উন্নত জীবনের আশায় সর্বস্বান্ত হচ্ছেন, এমনকি প্রাণও হারাচ্ছেন।
এমএমসির হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশ-লিবিয়া-ইতালি পাচার রুটের বার্ষিক বাজারমূল্য প্রায় ১৬ থেকে ১৯ কোটি মার্কিন ডলার (১৩.৮ থেকে ১৬.৪ কোটি ইউরো)। একেকজন অভিবাসনপ্রত্যাশীকে এই যাত্রার জন্য ১০ হাজার থেকে শুরু করে ১৭ হাজার ডলার পর্যন্ত খরচ করতে হয়। বাংলাদেশের গ্রামীণ ও শহরতলি এলাকার পরিবারগুলো জমি বিক্রি বা চড়া সুদে ঋণ নিয়ে এই টাকা জোগাড় করে, যা পাচারকারীদের কাছে এক প্রকার ‘নিশ্চিত বিনিয়োগ’ হিসেবে বিবেচিত হয়।
২০১২ সাল থেকে ইতালিতে বসবাসরত সোহরাব হোসেন জানান তার যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতার কথা। চার লাখ টাকা দিয়ে দালালের মাধ্যমে দুবাই ও মিশর হয়ে লিবিয়া পৌঁছান তিনি। কিন্তু সেখানে তাকে মাসের পর মাস বেতন ছাড়াই কাজ করতে বাধ্য করা হয়।
সোহরাব বলেন, আমি লিবিয়ায় ১০ মাস ছিলাম। বেনগাজিতে পৌঁছানোর পর কাগজপত্র না থাকায় পুলিশ ধরে ফেলে। পরে দালালের মাধ্যমে মুক্তি পেলেও এক বাড়িতে ৫ মাস কাজ করে কোনো বেতন পাইনি। বরং বেতন চাইলে মারধর করা হতো। অবশেষে গুলিবিদ্ধ নৌকায় ১৩২ জনের সঙ্গে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে অলৌকিকভাবে বেঁচে ফেরেন তিনি। কিন্তু চার বছর আগে তার ছোট ভাই বিপ্লব হাসান একই পথে যাত্রা করতে গিয়ে সাগরে প্রাণ হারান।
তিনি বলেন, পূর্ব লিবিয়ার সরকার রাজস্ব বাড়াতে ট্রানজিট ভিসা সহজ করায় দালালেরা একে মূল ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করছে। বৈধপথে ভিসা পেতে বছরের পর বছর সময় লাগলেও দালালরা এক মাসের মধ্যে পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দেয়।
বাংলাদেশের স্থানীয় দালালরা ‘নিজের ছেলেও ইতালিতে আছে’ এমন মিথ্যা আশ্বাসে বিশ্বাস অর্জন করে। অনেক ক্ষেত্রে ইতালির ‘ডিক্রেটো ফ্লুসি’ বা সিজনাল কাজের পারমিটের ভুয়া কাগজ দেখিয়েও মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর শুরু হয় ‘গেম হোম’-এর নির্যাতন, যেখানে মুক্তিপণের জন্য অভিবাসীদের আটকে রেখে মারধর করা হয়।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘লিবিয়া হয়ে ইউরোপ ভ্রমণ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। আমরা সচেতনতা বাড়াতে আইওএম-এর সাথে কাজ করছি এবং লিবিয়ায় আটকে পড়াদের ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করছি।’
তিনি আরও জানান, সরকার বিএমইটির মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং ভাষা শিক্ষার ওপর জোর দিচ্ছে যেন বাংলাদেশি কর্মীরা নিয়মিত ও বৈধপথে ইউরোপে মর্যাদা নিয়ে কাজ করতে পারেন।
সূত্র: ইনফোমাইগ্রেন্টস
এমআরএম