মালয়েশিয়ায় সুমধুর কণ্ঠে মুগ্ধতা ছড়াচ্ছেন বাংলাদেশি হাফেজরা

আহমাদুল কবির
আহমাদুল কবির আহমাদুল কবির , মালয়েশিয়া প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ০১:৪০ পিএম, ০৮ মার্চ ২০২৬

বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের হাফেজদের উজ্জ্বল পদচারণা। হিফজুল কুরআন চর্চায় বাংলাদেশ এখন বিশ্বের কাছে এক উজ্জ্বল উদাহরণ। আন্তর্জাতিক কুরআন প্রতিযোগিতাগুলোতে প্রায় প্রতি বছরই বাংলাদেশি হাফেজরা চ্যাম্পিয়ন হয়ে দেশের নাম উজ্জ্বল করছেন। তাদের মধুর তিলাওয়াত শুধু প্রতিযোগিতার মঞ্চেই নয়, বরং বিশ্বের নানা দেশের মসজিদে মুসল্লিদের হৃদয়েও গভীর ছাপ ফেলছে।

বিশেষ করে পবিত্র রমজান মাসে তারাবির নামাজে ইমামতি করার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আমন্ত্রণ পাচ্ছেন অসংখ্য বাংলাদেশি হাফেজ। তাদের সুমধুর কণ্ঠে কুরআন তিলাওয়াত বিদেশের মাটিতে রমজানের রাতগুলোকে করে তুলেছে আবেগঘন ও প্রশান্তিময়। যদিও মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি হাফেজদের উপস্থিতি আগে তুলনামূলক কম ছিল, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাদের তিলাওয়াত মালয়েশিয়ার ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের হৃদয় জয় করতে শুরু করেছে।

কুয়ালালামপুরে মুগ্ধতা ছড়াচ্ছেন বিশ্বজয়ী ক্বারি আবু রায়হান
মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরের কোতারায়া বাংলা মসজিদে তারাবির নামাজ পড়াচ্ছেন বিশ্বজয়ী কুরআন তিলাওয়াতকারী হাফেজ ক্বারি আবু রায়হান। তার সুমধুর কণ্ঠে কুরআন তিলাওয়াত শুনে প্রবাসী বাংলাদেশি ও স্থানীয় মুসল্লিরা মুগ্ধ হয়ে যান।

২০০৫ সালে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার বল্লবদী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। শৈশব থেকেই কুরআনের প্রতি তার গভীর অনুরাগ ছিল। নারায়ণগঞ্জের বল্লবদী আল-ইসলাহ একাডেমি ইন্টারন্যাশনাল মাদরাসা থেকে তিনি কুরআনের শিক্ষা গ্রহণ করেন।

তার মেধা ও তিলাওয়াতের সৌন্দর্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও স্বীকৃতি পেয়েছে। ২০১৮ সালে কাতারের টেলিভিশন চ্যানেল জিম টিভি আয়োজিত তিজান আন-নূর আন্তর্জাতিক হিফজুল কুরআন প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জন করেন তিনি। এছাড়া ২০২৪ সালে আফ্রিকার সেনেগালে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক কুরআন প্রতিযোগিতায় ৩০টি দেশকে পেছনে ফেলে প্রথম স্থান অধিকার করে আবারও বাংলাদেশের জন্য গৌরব বয়ে আনেন।

মালয়েশিয়ায় তারাবির নামাজে ইমামতি করার সুযোগ পেয়ে তিনি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করেন। বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের নাম আরও উজ্জ্বল করাই তার স্বপ্ন।

এক দশক ধরে মালয়েশিয়ায় তারাবি পড়াচ্ছেন হাফেজ ইয়াসিন
নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের ধন্ধি গ্রামের সন্তান হাফেজ মোহাম্মদ ইয়াসিন মালয়েশিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে জনতার সেবা করে যাচ্ছেন। তিনি সেলাঙ্গর রাজ্যের জেরাম কাম্পুং বুকিত চিরাকা তাহফিজ আর রোকাইয়া মাদরাসায় টানা ১০ বছর ধরে তারাবির নামাজ পড়াচ্ছেন।

শুধু ইমামতিই নয়, তিনি সেখানে শিক্ষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। ২০১৭ সালের এপ্রিলে মালয়েশিয়ার ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অধীনে অনুষ্ঠিত একটি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তিনি ওই মাদরাসায় শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান। এ পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রবাসী কমিউনিটি নেতা রাশেদ বাদলের সহযোগিতা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

১৯৮২ সালে ঢাকার গেন্ডারিয়ার এম শফি উল্লাহ হাফিজিয়া মাদরাসা থেকে হিফজুল কুরআন সম্পন্ন করেন ইয়াসিন এবং প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। তার সুমধুর তিলাওয়াত জেরাম কাম্পুং বুকিত চিরাকা তাহফিজ আর রোকাইয়া মাদরাসার শিক্ষার্থী ও স্থানীয় মুসল্লিদের কাছে অত্যন্ত প্রিয়। বিদেশের মাটিতে কুরআনের খেদমত করার সুযোগ পেয়ে তিনি আনন্দিত। ভবিষ্যতেও যেন আরও বেশি মানুষের মাঝে কুরআনের সৌন্দর্য ছড়িয়ে দিতে পারেন সেজন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন তিনি।

কুয়ালালামপুরে ইমামতি ও খতিবের দায়িত্বে ইকরামুল হক
হাফেজ মাওলানা মোহাম্মদ ইকরামুল হক কুয়ালালামপুরের তিতিওয়াংসা এলাকার সূরাও বায়তুল মোকাররামে দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি সেখানে একাধারে খতিবের দায়িত্ব পালন করছেন এবং গত ১০ বছর ধরে তারাবির নামাজে ইমামতি করে আসছেন।

জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ থানার পোড়া ভিটা গ্রামের সন্তান ইকরামুল হক। তার বাবা মুহাম্মদ আবু হানিফ শেখ। তিনি ২০০৬ সালে আল জামিয়াতুল রাফজুল বাড়িয়া থেকে হিফজুল কুরআন সম্পন্ন করেন। পরে উচ্চতর ইসলামী শিক্ষা গ্রহণ করে ২০১৫ সালে সাভারের আল জামিয়াতুল মাদানিয়া রাজফুলবাড়িয়া থেকে দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করেন।

বিদেশের মাটিতে দীর্ঘদিন ধরে কুরআনের খেদমত করার সুযোগ পেয়ে তিনি আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে তিনি মনে করেন, প্রবাসে দায়িত্ব পালন করা মানে শুধু ইমামতি করা নয়, বরং দেশের সুনামও বহন করা।

বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের সম্মান উজ্জ্বল করার প্রত্যয়
মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত এসব বাংলাদেশি হাফেজ তাদের তিলাওয়াত ও আচরণের মাধ্যমে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে চলেছেন। তাদের মধুর কণ্ঠে কুরআন তিলাওয়াত শুনে মালয়েশিয়ার মুসল্লিরা যেমন মুগ্ধ হন, তেমনি বাংলাদেশ সম্পর্কেও ইতিবাচক ধারণা লাভ করেন।

এই হাফেজরা মনে করেন, কুরআনের খেদমতই তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন। বিদেশের মাটিতে দায়িত্ব পালন করে তারা যেন বাংলাদেশের সম্মান আরও উঁচুতে তুলে ধরতে পারেন এটাই তাদের প্রত্যাশা।

পবিত্র কুরআনের সুমধুর তিলাওয়াতের মাধ্যমে তারা শুধু মসজিদের মুসল্লিদের হৃদয়ই স্পর্শ করছেন না, বরং বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের কুরআনপ্রেমী জাতি হিসেবে পরিচয়ও তুলে ধরছেন। এজন্য তারা দেশবাসীর কাছে দোয়া কামনা করেছেন, যেন কুরআনের এই আলো আরও দূরে ছড়িয়ে দিতে পারেন।

এমআরএম/জেআইএম

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]