তরুণ প্রজন্মের বিবেকই হোক আগামীর বিশ্বনেতৃত্ব
আজকের বিশ্বকে পরিচালনা করছে বড়দের প্রজন্ম। রাজনীতিবিদ এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতাধারীরা প্রায়ই চল্লিশ বা পঞ্চাশ বছরের বেশি বয়সী। তারা যে সিদ্ধান্ত নেন, তা আমাদের ভবিষ্যতকে আকার দেয়, কিন্তু সবসময় সঠিক দিকেই নয়। যুদ্ধ, সংঘাত এবং সামাজিক অবিচার প্রায়শই এমন ক্ষমতায়ন কাঠামোর ফল যেখানে ব্যক্তিগত স্বার্থ মানবজাতির সমষ্টিগত স্বার্থের ওপরে থাকে।
তথ্য ও গবেষণা দেখায় যে, তরুণদের চিন্তা ভিন্ন। Pew Research Center অনুসারে, তরুণরা কূটনীতি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং মানবাধিকারের দিকে বেশি মনোনিবেশ করে। United Nations জানিয়েছে, তরুণরা বৈচিত্র্যকে বেশি গ্রহণযোগ্য মনে করে, বৈশ্বিক সমস্যার দিকে মনোযোগী এবং দীর্ঘমেয়াদি সমাধানকে প্রাধান্য দেয়, যেমন জলবায়ু পরিবর্তন ও জনসংখ্যা অভিবাসন। এই মনোভাব যদি নীতি নির্ধারণে প্রাধান্য পেত, বিশ্ব একেবারেই ভিন্ন হত।
নতুন প্রজন্ম যে ধারায় বিশ্বকে সামনে এগিয়ে নিতে চায়, তার সঙ্গে পুরনো রাষ্ট্র শাসন আর খাপ খাইয়ে নিতে পারছে না। এমনকি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাও অনেক ক্ষেত্রে ঠিকমতো কাজ করতে পারছে না। এরপর অনেকে পরিবারতন্ত্রের সুযোগ নিয়ে গণতন্ত্রকে ধ্বংস করে স্বৈরাচারী শাসন কায়েম করতে গিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করছে। পুঁজিবাদীরা টাকা দিয়ে রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করেছে, যার ফলে জালিয়াতি, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, প্রতারণা এবং নৈতিক অবক্ষয় বিস্তার করছে। এর থেকে রেহাই পেতে হলে নতুনত্বের অগ্রাধিকার দিতে হবে। তার আগে জানতে হবে, বুঝতে হবে সেই নতুনত্ব কী। এআই প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলমান প্রক্রিয়াকে মহাশূন্যে পৌঁছে দিতে চাওয়া, এখন মরনের ফাঁদে পা দেওয়ার মতো। এটি আর চলতে পারে না।
গণতান্ত্রিক বা রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের নামে সাধারণ মানুষকে ট্রায়াল বা পরীক্ষার মতো ব্যবহার করা এখন বিশ্বব্যাপী একটি অমানবিক বাস্তবতা। জালিয়াতি, প্রতারণা, স্বজনপ্রীতি এবং নৈতিক অবক্ষয়ের চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটে যখন ক্ষমতাবানরা গরিব ও সুবিধাহীন মানুষকে তাদের স্বার্থের হাতিয়ার বানায়। আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য বা দক্ষিণ এশিয়ার কিছু অঞ্চলে দেখা যায়, মানুষকে রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক পরীক্ষামূলক খাত হিসেবে ব্যবহার করা হয়, যেখানে তাদের জীবন ঝুঁকিতে পড়ে, কিন্তু কোনো বিচার বা ন্যায় প্রয়োগ হয় না। এই বাস্তবতা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে রাজনৈতিক নেতৃত্বের চরিত্রই সঠিক পথে মানবিকতা এবং ন্যায়ের মান নির্ধারণ করে।
আজকের বিশ্বকে দেখি, রাজনীতি, অর্থনীতি, পরিবেশ, সামাজিক ন্যায়, সবই বড়দের হাতে। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ক্ষমতা, স্বার্থ এবং স্বল্পমেয়াদি লাভের ভিত্তিতে। তার ফলাফল যুদ্ধ, সংঘাত, বৈষম্য এবং পরিবেশ ধ্বংস। আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, ইউক্রেন, প্রত্যেকটি উদাহরণ দেখায় যে বড়রা নিজেদের স্বার্থেই মানুষকে জীবন ঝুঁকিতে ফেলে।
তরুণরা ভিন্নভাবে চিন্তা করে। তারা কেবল জলবায়ু পরিবর্তন বা পরিবেশ সচেতন নয়; তারা চায় সকল মানুষের সমান সুযোগ, প্রফিটের ন্যায্য বণ্টন এবং শান্তিপূর্ণ বিশ্ব। তরুণরা ভবিষ্যৎ নয়, তারা ইতিমধ্যেই বর্তমান বিশ্বের নৈতিক প্রশ্ন। কেউ অভুক্ত থাকবে না, কেউ অতিরিক্ত সুবিধা ভোগ করবে না। শিক্ষার, স্বাস্থ্যসেবার, প্রযুক্তি এবং মানবিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সমান সুযোগ নিশ্চিত হবে।
যুদ্ধের উদাহরণ স্পষ্ট। ইয়েমেন, সিরিয়া, ইউক্রেন, সবই প্রমাণ করে, যুদ্ধের সিদ্ধান্ত বড়রা নেয়, কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হয় তরুণ ও শিশু। যে প্রজন্ম যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেয়, তারা খুব কমই যুদ্ধক্ষেত্রে মারা যায়; কিন্তু যে প্রজন্ম সেই যুদ্ধের মধ্যে জন্মায় ও বড় হয়, তারাই ভবিষ্যৎ হারায়। সামরিক শক্তি, স্বার্থসিদ্ধি এবং স্বল্পমেয়াদি লাভকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষেত্রেও একই ধরনের স্বার্থসংকীর্ণতা দেখা যায়। অ্যামাজন, কঙ্গো, সুন্দরবন, এইসব স্থান শুধু বন বা নদী নয়; তারা মানবজাতির দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা ও জীববৈচিত্র্যের কেন্দ্র।
তরুণরা কেবল সমস্যার চিহ্নিতকরণ করে না। তারা ভবিষ্যতের পৃথিবীকে ন্যায়সঙ্গত, শান্তিপূর্ণ এবং সমান সুযোগপূর্ণ করার উদ্যোগে কাজ করছে। আন্তর্জাতিক যুব আন্দোলন Fridays for Future এবং Greta Thunberg এর উদাহরণ প্রমাণ করে, তারা কেবল পরিবেশ সচেতনতা নয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায়ের বিষয়েও নেতৃত্ব দিচ্ছে।
তরুণদের নেতৃত্বে, পৃথিবী এমন হতে পারে:
কেউ অভুক্ত থাকবে না, খাদ্য, পানি এবং স্বাস্থ্য সবার জন্য সমানভাবে পৌঁছাবে।
প্রফিট এবং সম্পদ সমানভাবে বিতরণ করা হবে, কেউ অতিরিক্ত সুবিধা ভোগ করবে না।
শান্তি এবং সংহতি বজায় থাকবে, যুদ্ধ আর স্বার্থের হাতিয়ার হবে না।
পরিবেশ সংরক্ষণ এবং প্রযুক্তি ব্যবহার হবে মানবিক ও দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিকোণ থেকে।
ইতিহাস প্রমাণ করে, যুব আন্দোলন সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের চালিকা শক্তি। মার্কিন নাগরিক অধিকার আন্দোলন, এশিয়ার গণতান্ত্রিক প্রতিবাদ, ইউরোপের শ্রমাধিকার আন্দোলন, সবই তরুণদের নেতৃত্বে। তারা কেবল ভবিষ্যত নয়, বর্তমানকেও পরিবর্তন করতে সক্ষম।
যদি তরুণরা নেতৃত্ব নিত, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক ন্যায় এবং আর্থিক সমতার দিকে বেশি বিনিয়োগ হত। সামরিক শক্তি, স্বার্থসিদ্ধি এবং স্বল্পমেয়াদি লাভে কম বাজেট দেওয়া হত। বিশ্বজুড়ে সংলাপ, কূটনীতি এবং যৌথ সমাধান এগিয়ে আসত।
তরুণরা কেবল সহানুভূতিশীল নয়; তারা যুক্তিবাদী এবং দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে বিশ্বাসী। তারা বিশ্বকে মমতাময় ন্যায়ের ভিত্তিতে পরিচালিত করার ক্ষমতা রাখে, যেখানে মানবতা, দয়া, শান্তি এবং সমান সুযোগই প্রধান হবে। পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি মানুষ এখন ত্রিশ বছরের কম, যা দেখায় ভবিষ্যৎ এরই মধ্যেই তাদের হাতে।
মানবতার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে ক্ষমতা নয়, প্রজন্মের বিবেক।
তরুণদের নেতৃত্বে, বিশ্ব নিখুঁত হবে না, কিন্তু আরও মমতাময়, ন্যায়সঙ্গত এবং সমান সুযোগপূর্ণ হবে। সংহতি স্বার্থের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে। আশা থাকবে এগিয়ে চলার প্রেরণা। মমতাময় দৃষ্টিভঙ্গি নিশ্চিত করবে যে মানবতা, দয়া, ন্যায় এবং সমান সুযোগই হোক বিশ্বের মূল নীতি।
বিশেষ বার্তা: পৃথিবীকে শুধু পরিবেশ বা জলবায়ুর দিক দিয়ে ন্যায়সঙ্গত করা যথেষ্ট নয়। সমান সুযোগ, বৈষম্যহীন প্রফিট বণ্টন, সামাজিক ন্যায় এবং তরুণ নেতৃত্বের সমন্বয়ই পৃথিবীকে সত্যিই মমতাময়, স্থায়ী শান্তিপূর্ণ এবং মানবিক করে তুলবে।
রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন
[email protected]
এমআরএম/এএসএম