প্রবাসীর বোবা কান্না

মো. ইয়াকুব আলী
মো. ইয়াকুব আলী মো. ইয়াকুব আলী
প্রকাশিত: ০৪:১৩ পিএম, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১

ছবির এই মানুষটার নাম ‘শ্রীমতী আন্না কুমারী বিশ্বাস’, আমার কর্তা, আমার দাদি। নিজের দাদির বাইরে এই মানুষটা এবং তার জা ‘শ্রীমতী রেখা রানী বিশ্বাস’ ছিলেন নিজের দাদির চাইতেও আপন। নদী ভাঙনের পর যখন আমরা কুষ্টিয়ার শহরতলী বাড়াদীতে চলে এসেছিলাম স্বভাবতঃই দাদি ছোট দুই চাচার সঙ্গে চরভবানীপুর থেকে গিয়েছিলেন।

তখন আমাদের জীবনে দাদির অভাব পূরণ করেছিলেন এই দু’জন মানুষ। তাদের স্বামীরা যথাক্রমে শ্রী শ্রী বলাইচন্দ্র বিশ্বাস এবং শ্রী শ্রী কেশরিচন্দ্র বিশ্বাসকে আমরা ডাকতাম দাদু। লাই দাদু আমার দেখা সবচেয়ে মজার মানুষদের একজন। তার কাছ থেকে আমরা কত রকমের যে ধাঁধা শিখেছিলাম তার ইয়ত্তা নেই।

একটা ধাঁধার কথা এখনও মনে আছে। তিনি একদিন হঠাৎ আমাদের ডেকে বললেন মরা গরু হাঁটি যাতি দেখিছিস? আমরা বললাম: ধুর দাদু, খালি হেঁয়ালি করো। মরা গরু আবার হেঁটে যায় না কি? তিনি বললেন যা একদিন সময় দিলাম, এই ধাঁধাঁটার উত্তর খুঁজে নিয়ে আয়। আমরা সারাদিন এই ধাঁধা মাথায় নিয়ে ঘুরলাম। কোনো কাজে মন দিতে পারলাম না। এমনকি রাত্রে ঘুমও হলো না ঠিকমতো। পরেরদিন সকাল-বেলা আমরা দলবেঁধে দাদুর কাছে হাজির।

দাদু বললেন, তোদের দিয়ে কিচ্ছু হবে না। শোন মরা গরু রাস্তার পাশে পড়ি আছে আমি হাঁটি যাওয়ার সময় দেখিছি। আমরা তো রেগে আগুন। এটা কোনো ধাঁধা হলো। দাদুর শুধু হেঁয়ালি। এভাবে প্রায়ই দাদুর কাছে আমাদের ‘সবজান্তা দাদুর আসর’ বসত। দাদুর গায়ের রং ছিল দুধে আলতা যাকে বলে তাই।

দাদু খুব সুন্দর খোল বাজাতে পারতেন। দাদু যে কোনো কীর্তনের আসরে খোল বাজানোর দায়িত্ব নিতেন। খোল বাজানোর সময় দাদু খোলের শব্দের তালে তালে মাথা নাড়তেন। দাদুর মাথা নাড়ানো ছিল আমাদের কাছে একটা শিল্প। সেই তুলনায় তার ছোটভাই কেশরিচন্দ্র একটু চুপচাপ স্বভাবের ছিলেন। অবশ্য আমাদের সঙ্গে ঠিকই মজা করতেন।

এইবার আসি কর্তাদের কথায়। তারা সত্যিকার অর্থেই পরিবারের কর্তা ছিলেন। দাদুরা তো সামান্য উপার্জন করেই দায়িত্ব শেষ করতেন সংসার চালানোর গুরু দায়িত্ব ছিল কর্তাদের ওপর। কর্তা দু’জন আমাদের দলটাকে প্রচণ্ড স্নেহ করতেন। কেন জানি আমাদের দুভাইকে একটু বেশি আদর করতেন। হয়তোবা আমরা দুষ্টুকুল শিরোমণি ছিলাম এই কারণে।

প্রত্যেকটা পূজা পার্বণে আমরা ছিলাম তাদের অনিমন্ত্রিত অতিথি। আর কোনো সময় যদি আমরা মিস করতাম তাহলে হেঁটে এসে আমাদের বাসায় খাবার পৌঁছে দিয়ে যেতেন। তাদের গাছের আম, কুল আমরা সবাই দলবেঁধে পেড়ে দিতাম। আবার দরকার হলে রাতের আঁধারে চুরিও করতাম।

অনেক বয়স হওয়ার পর আমরা জেনেছি ধর্মীয় উৎসবগুলো আলাদা আলাদা। তার আগে পর্যন্ত ঈদ, পূজা সবকিছুতেই আমাদের ছিল সমান অংশ্রগ্রহণ। মসজিদে আসরের নামাজ পড়েই আমরা বাড়ির পেছনের অবারিত মাঠে হাঁটতে চলে যেতাম। ফিরতাম মাগরিবের আজানের সময়।

jagonews24

তারপর একবারে মাগরিবের নামাজ পরে বাড়ি ফিরতাম। তখন তো আর এত ঘড়ির চল ছিল না। সন্ধ্যার সময় কর্তারা শঙ্খে ফুঁ দিয়ে একটা পূজা দিতেন। আমরা কান খাড়া করে রাখতাম কখন তারা ফুঁ দেবেন। তার মানে হলো কিছুক্ষণের মধ্যেই মাগরিবের আজান দেবে।

আর সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে ঘরে ধুপ জ্বালিয়ে মশা তাড়ানো ছিল নিত্যদিনের রুটিন। তখন সারা পাড়া ধূপের ধোঁয়া গন্ধে ভরে যেত।
একটা ঘটনা এখনও আমার মনে দাগ কেটে আছে। যতদূর মনে পড়ে আসরের নামাজ পরে আমরা বাইরে বের হয়েছি। দেখি মসজিদের বাইরে রাস্তার ওপর রেখা কর্তা তার এক নাতনীকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, হাতের টিনের গ্লাসে পানি।

আমরা জিজ্ঞেস করলাম: কী করছ এখানে? তিনি বললেন নাতনিটার শরীরটা একটু খারাপ তাই ভাবলাম হুজুরের কাছ থেকে একটু পানি পড়া নিয়ে আসি। একটু পরে হুজুর মসজিদ থেকে বের হয়ে প্রথমে কর্তার হাত থেকে গ্লাসটা নিয়ে পানিতে ফুঁ দিয়ে দিলেন।

এরপর তার নাতনির মাথায় হাত রেখে দোয়া পরে নাতিনীর মাথায় ফুঁ দিয়ে দিলেন। এটা আমার কিশোর মনে রেখাপাত করেছিল তাই এখনও চোখ বন্ধ করলে রেখা কর্তাকে দেখতে পাই। আর আমাদের ঠাণ্ডা কাশির একমাত্র ওষুধ ছিল কর্তাদের তুলসী গাছের পাতা। হিন্দু মুসলমান বন্ধনের এমন আরও অনেক উদাহরণ আমার স্মৃতিতে আছে।

ফিরে আসি কর্তাদের কথায়। বলাই দাদু গত হয়েছেন অনেক আগেই। রেখা কর্তাও গত হয়েছেন। এখন বেঁচে আছেন কেশরী দাদু আর আন্না কর্তা। দেশ ছাড়ার আগে তাদের আশীর্বাদ নিতে গিয়েছিলাম। মনপ্রাণ ভরে দোয়া করেছিলেন। দেশ ছেড়ে আসার পর প্রথমদিকে প্রায়ই কথা হত।

কর্তা আমাদের সময়ের পার্থক্য শুনে খুবই অবাক হয়েছিলেন। গত কদিন ধরে কর্তার শরীর খারাপ ছিল তাই হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। গতকাল বা পরশু হাসপাতাল থেকে ফিরেছেন। আজ সনৎ কাকুর মেসেঞ্জারে ফোন দিয়ে কথা হলো। সেই নির্মল হাসি।

সেই আবেগী কান্না। আমি বললাম: আমার দাদি তো ফাঁকি দিয়েছেন, তুমিই তো আমার দাদি। টিকিটও কাটা ছিল কিন্তু করোনার কারণে মনে হয় এইবারও আসা হবি না। দোয়া করি তুমি সুস্থ হয়ে ওঠ।

শুনেই কিশোরীর মতো কেঁদে দিলেন। আমি অনেক কষ্ট করে নিজেকে সামলে রাখলাম। যাই হোক আমাদের মাথার উপর থেকে একটা একটা করে ছায়া সরে যাচ্ছে। যেই মানুষগুলোর নিঃস্বার্থ আদরে বেড়ে উঠেছিলাম তারা সবাই একে একে বিদায় নিচ্ছে।

শ্রীমতী আন্না কুমারী বিশ্বাস বাংলাদেশ সময় ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১ রাত ১১টা ৫০ মিনিটে ইহলোকের মায়া ত্যাগ করে অনন্তলোকে পাড়ি জমিয়েছেন। মাথার উপর থেকে একটা একটা করে ছায়া সরে গেল। দাদি, কর্তা বলে ডাকার আর কেউ থাকলো না।

এটা আমাদের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষত। আমাদের যতসব দস্যিপনার উৎসাহদাতা এবং আশ্রয়দাতা ছিলেন আমাদের দাদি আর কর্তারা। তাদের সাহস পেয়েই জীবনের সব অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলাম আমরা কিন্তু নিঃস্বার্থভাবে মনের শক্তি জুগিয়ে যাওয়া এই মানুষগুলো একে একে হারিয়ে যাচ্ছে।

একটা সময় হয়তোবা আমরাও হারিয়ে যাব কালের গর্ভে। কর্তা যেখানেই থাকো, ভালো থাকো এই দোয়া করি। তোমার মুখের কোণে লেগে থাকা এক চিলতে নির্মল হাসি আর দেখতে পাব না ভেবেই মনটা ভারি হয়ে যাচ্ছে।

কর্তাকে শেষবারের মতো আর দেখতে পারলাম না। আপাতত ছোটভাই পথিকের পাঠানো ছবি দেখেই মনটাকে প্রবোধ দিতে হলো। যতবারই ছবিগুলো দেখছিলাম ততবারই দৃষ্টি ঝাঁপসা হয়ে আসছিল। এভাবেই দূর-পরবাসে বসবাসকারী আমাদের সঙ্গে শেকড়ের বাঁধনগুলো একে একে আলগা হয়ে আসছে।

আর আমরা আবারো বোবা কান্নাটা বুকের মধ্যে আটকে রাখছি। একদিন আমরা একা হয়ে যাব এবং একদিন আমাদের নিজেদেরও বিদায় ঘণ্টা বেজে ওঠবে। তবুও মন মানতে চাই না। সাত সমুদ্র তের নদীর পারে থেকে প্রিয়জনকে শেষবারের মতো দেখতে না পারার আক্ষেপটা বয়ে নিয়ে বেড়াতে হবে বাকি জীবন আর থেকে থেকে বুক থেকে বেরিয়ে যাবে এক একটা দীর্ঘশ্বাস।

এমআরএম/এএসএম

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]