বাংলাদেশ–মেক্সিকো সম্পর্ক: কিছু কথা

প্রবাস ডেস্ক
প্রবাস ডেস্ক প্রবাস ডেস্ক
প্রকাশিত: ১২:০৯ পিএম, ২৫ জানুয়ারি ২০২২
মেক্সিকোতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত আবিদা ইসলাম

আবিদা ইসলাম, রাষ্ট্রদূত, মেক্সিকো বাংলাদেশ দূতাবাস

মেক্সিকোর নাম শুনলেই মনে হয় যোজন-যোজন দূরের একটি দেশ। এই ভাবনায় ভুল কিছু নেই। বাংলাদেশ থেকে মেক্সিকোর দূরত্ব প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি। মেক্সিকো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবেশী দেশ হলেও যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপারে এই ভৌগলিক দূরত্বের কথা আমাদের মাথায় আসে না। যুক্তরাষ্ট্রের কথা মনে হলেই মনে হয় সেখানে অনেক বাংলাদেশির বসবাস, আমাদের ছেলে-মেয়েরা সেখানে উচ্চশিক্ষা নিতে যায়। অনেকে উন্নত জীবনের আশায় পাড়ি জমান। বাণিজ্য ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক বহুমুখী, অত্যন্ত নিবিড়।

বাংলাদেশ–মেক্সিকো সম্পর্ক: কিছু কথাবাণিজ্য বাড়াতে বাংলাদেশ-মেক্সিকোর ব্যবসায়ীদের মধ্যে চুক্তি সই

বাংলাদেশের সঙ্গেও মেক্সিকোর যোগাযোগ এখন বাড়ছে। মেক্সিকোর স্বাধীনতার দুইশত বছর পূর্তিতে ২০২১-এর সেপ্টেম্বর মাসে সাত সদস্যের বাংলাদেশের একটি সাংস্কৃতিক দল দেশটি সফর করে। আর, বাংলাদেশ সামরিক বাহিনী ৩৯ সদস্যের একটি কন্টিনজেন্ট পাঠায় যা মেক্সিকোর আনুষ্ঠানিক কুচকাওয়াজে অংশ নেয়। এর প্রেক্ষিতে ১৬ ডিসেম্বরে বাংলাদেশের মহান বিজয় দিবস উদযাপন অনুষ্ঠানে মেক্সিকো সরকার একটি সামরিক প্রতিনিধি দল পাঠানোর আগ্রহ দেখিয়েছে, যা নিশ্চিতভাবেই দুই দেশের সম্পর্কোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বাংলাদেশ–মেক্সিকো সম্পর্ক: কিছু কথামেক্সিকোতে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর একটি সমন্বিত প্যারেড

বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১৯-গুন বড় মেক্সিকো প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর অত্যন্ত সম্ভাবনাময় এবং বৈচিত্র্যময় একটি দেশ- যা একটা সময় ছিল ওলমেক, সাপোটেক, তোলতেক, মায়া, ও অ্যাজটেক সভ্যতার চারণভূমি।

এছাড়া, দেশটির রয়েছে সমৃদ্ধ সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য। জাদুঘরের শহর মেক্সিকো সিটিতে প্রায় ১৬৩টি জাদুঘর আছে যা অনুবন্ধন করা। আর সারাদেশে ইউনেস্কো স্বীকৃত প্রায় ৩৫টিরও বেশি ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা আছে। এদিক থেকে মেক্সিকোর অবস্থান আমেরিকা মহাদেশে প্রথম, আর বিশ্বে সপ্তম। এমনকি, মেক্সিকোর খাবারও ইউনেস্কোর বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে।

মজার ব্যাপার হলো বিশ্বের সবচেয়ে বড় পিরামিডটি রয়েছে মেক্সিকোর পুয়েব্লা রাজ্যের চোলুলাতে- যা গিজার পিরামিডের চেয়েও উচ্চতায় দীর্ঘ। তাই ২০২০ সালে বিশ্বের সবচেয়ে ভ্রমণ করা দেশগুলোর মধ্যে মনোমুগ্ধকর এই দেশটি স্থান করে নিয়েছিল। আর ২০১৯ সালে প্রায় ৪৫ মিলিয়ন পর্যটক এই দেশটি ভ্রমণ করে।

বাংলাদেশ–মেক্সিকো সম্পর্ক: কিছু কথামেক্সিকোর পুয়েব্লা রাজ্যে একটি কাঁচা বাজার 

বিদেশিদের আপন করে নেওয়ার এক অদ্ভুত ক্ষমতাও আছে মেক্সিকোর মানুষদের। অত্যন্ত উষ্ণ, আন্তরিক, প্রাণবন্ত এবং অত্যন্ত আনন্দপ্রিয় মেক্সিকোর মানুষ। দুই দেশের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ আরও বাড়ানোর জন্য বাংলাদেশ এবং মেক্সিকো এখন সাংস্কৃতিক এবং পর্যটন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বৃদ্ধি নিয়ে আলোচনা করছে।

ভাষার বৈচিত্র্যের দিক থেকেও অনন্য এই দেশে স্প্যানিশ মূল ভাষা হলেও প্রায় ৬৯টি ভিন্ন আদিবাসী ভাষার চল রয়েছে এখানে যা জাতীয় ভাষা হিসাবে স্বীকৃত। এদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য স্প্যানিশ ভাষা জানা অত্যন্ত জরুরি। এই ভাষা জানা থাকলে আমাদের শিক্ষার্থীরা মেক্সিকোর বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, মেডিকেল স্কুল, ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল এবং আইন স্কুলগুলিতে সহজেই উচ্চশিক্ষা নিতে পারবে। আর জীবনযাত্রার ব্যয় কম হওয়াতে বিদেশি শিক্ষার্থীদের পছন্দের অন্যতম দেশ মেক্সিকো।

jagonews24মেক্সিকোর রাষ্ট্রপতি আন্দ্রেস ম্যানুয়েল লোপেজ ওব্রাডরের কাছে পরিচয়পত্র পেশ দেশটিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত আবিদা ইসলামের

বাণিজ্যিক দিক থেকে বলা যায় যে, লাতিন আমেরিকার দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ মেক্সিকোর সঙ্গে দিন দিন আমাদের সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হচ্ছে। আমাদের পোশাক শিল্পের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময় বাজারগুলোর মধ্যে একটি মেক্সিকো। তবে পোশাক শিল্প ছাড়াও কৃষিজ দ্রব্য, চামড়া, প্লাস্টিক, সিরামিক, পাট, আইসিটি, বিদ্যুৎ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ফার্মাসিউটিক্যালস, হালকা প্রকৌশল, যানবাহনের যন্ত্রাংশ, চিকিৎসা সরঞ্জামসহ স্বাস্থ্যসেবা ও কৃষিভিত্তিক শিল্পে উভয় দেশের একসঙ্গে কাজ করার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশ–মেক্সিকো সম্পর্ক: কিছু কথালাতিন আমেরিকার দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ মেক্সিকো

আনন্দের খবর হলো গত ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১ মেক্সিকো সিটিতে এফবিসিসিআই এবং মেক্সিকান বিজনেস কাউন্সিল ফর ফরেন ট্রেড, ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড টেকনোলজির (COMCE) একটি সমঝোতা স্মারক (MOU) স্বাক্ষরিত হয়েছে যা দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বৃদ্ধিতে ইতিবাচক অবদান রাখবে বলে আশা করা যাচ্ছে। তাছাড়া, তারা একে অপরের দেশে অনুষ্ঠিত বাণিজ্য মেলা, প্রদর্শনী, সম্মেলন এবং অন্যান্য ব্যবসায়িক কার্যক্রমে অংশ গ্রহণসহ কারিগরি দক্ষতা প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তি স্থানান্তরে কাজ করবে বলেও জানিয়েছে।

সম্প্রতি মেক্সিকোর ২০০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এই সেপ্টেম্বর মাসে মেক্সিকো সফর করেন। সে সময় সেদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিষয়ক উপমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতকালে তিনি দুই দেশের বাণিজ্যের লক্ষ্যমাত্রা ১০০ কোটি ডলার নির্ধারণ করার প্রস্তাব করেন- যা উভয় দেশের ব্যবসায়ীদের আরও উৎসাহিত করবে বলে মনে করা হচ্ছে।

আর গত নভেম্বর মাসে দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠিত হয়ে গেল প্রথম ফরেন অফিস কনসালটেশনে (এফওসি)। সেখানে বন্ধুপ্রতীম এই দুটি দেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদার করার উপায় খুঁজে বের করতে এক সঙ্গে কাজ করার আশা প্রকাশ করেছে। এজন্য বৈঠকে অর্থনীতি ও বাণিজ্য অধিক গুরুত্ব পেলেও আলোচনা হয় রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়েও।

বাংলাদেশ–মেক্সিকো সম্পর্ক: কিছু কথাবাণিজ্য বাড়াতে বাংলাদেশ-মেক্সিকোর ব্যবসায়ীদের মধ্যে চুক্তি সই

রোহিঙ্গা বিষয়ে সব সময়ই বাংলাদেশকে সমর্থন জানিয়ে আসছে মেক্সিকো। তাই এই বৈঠকে মেক্সিকোর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বাংলাদেশ। আরও আলোচনা হয় ভিসা সহজীকরণ, উচ্চ শিক্ষা, দ্বিপক্ষীয় সাংস্কৃতিক, পর্যটন ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ঢাকায় মেক্সিকোর আবাসিক মিশন খোলার অনুরোধও জানানো হয়। মেক্সিকোর পক্ষ থেকে এসময় বাংলাদেশের নির্মাণ ও অটো পার্টস শিল্পে বিনিয়োগে তাদের আগ্রহের কথা জানানো হয়।

মেক্সিকোর সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। তবে, ভৌগলিক দূরত্বের এই মানসিক স্থবিরতা থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে। তাহলেই মেক্সিকোর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক আরও অনেক দূর পর্যন্ত এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।

যদিও এই মানসিকতার পরিবর্তন হচ্ছে তবে তা অত্যন্ত ধীরে, তবুও তা আশাব্যঞ্জক। আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশ ও মেক্সিকোর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে আরও গতির সঞ্চার হবে এবং এই সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হবে – এটাই সবার প্রত্যাশা।

আবিদা ইসলাম, রাষ্ট্রদূত, মেক্সিকো বাংলাদেশ দূতাবাস

এমআরএম/জেআইএম

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]