‘মমি’

শায়লা জাবীন
শায়লা জাবীন শায়লা জাবীন অস্ট্রেলিয়া
প্রকাশিত: ১১:১০ এএম, ০৮ আগস্ট ২০২২
ছবি- সংগৃহীত

ভোর ৫টার সময় মেসেঞ্জারে রিং হচ্ছে, চোখ খোলার আগেই মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো অনিলার। রিঙ্গার টোন সাইলেন্টই থাকে। ঠিক সকাল ৬টা ৩০ মিনিটে অ্যালার্ম বাজার কথা। লেপের ভেতর থেকে হাত বের করে খুবই কষ্ট করে এক চোখ খুলে দেখে মিলা আপা কল করেছে, ফোন সাইলেন্ট করে লেপের ভেতরে ঢুকে গেলো অনিলা। মনে মনে খুবই বিরক্ত সে!

বাংলাদেশে থাকা মানুষ নিয়ে এই এক সমস্যা। যখন মন চায় ফোন দিয়ে বসে, না ধরলে কথা শোনায়। কিন্তু তখন আমাদের কয়টা বাজে। সেটা ফোন করার ঠিক সময় কি-না সেটা মাথায় রাখবে না। আর ফোন করেই শুরু করে দেবে সমস্যা আর সমস্যা। যেন আমরা বেহেস্তে আছি, কোনো সমস্যা নাই।

আমরা বলি না তাদের যে টেনশন করবে, এত দূর থেকে কি বা করার আছে তাছাড়া। ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে গেলো অনিলা। ঠিক সাড়ে ৬টার অ্যালার্মে ঘুম ভাঙলো, অ্যালার্ম বন্ধ করতে গিয়ে দেখে মিলা আপা ৮ বার কল করেছে। আর মেসেজ, ‘ফোন ধরিস না কেন? কেউ এত ঘুমায়?’

যাহ বাবা, ঘুমানোও যাবে না দেখছি। অনিলা উঠে বাথরুম সেরে কিচেন এ কেটলিতে পানি ভরে সুইচ অন করে মোবাইলে হেডফোন লাগাতে লাগাতে ভাবছে, আবার খারাপ কোনো খবর না তো! সকাল বেলা কি শুনতে হয় কে জানে! মিলা তার বড় খালার মেয়ে, উঁনারা তিন বোন মিলা, শিলা, পলা। (এরপরের মেয়ের নাম বড় খালা ‘গলা’ রাখতো কিনা এটা আম্মুকে জিজ্ঞাসা করে একদিন ভীষণ বকা খেয়েছে অনিলা)

অনিলার অনেক বড়, প্রায় ১o বছরের বড় মিলা আপা। এরপর শিলা আপা তার ৭ বছরের বড়। শুধু পলাই অনিলার ৩ বছরের ছোটো, বড় খালার বুড়ো বয়সের মেয়ে পলা। ৩ বোনই খুবই ভালো এবং সরল, কোনো এক অজ্ঞাত কারণে সবাই অনিলাকে খুবই পছন্দ করে। যা কিছু হবে তাকে বলা চাই।

অনিলার হয়েছে জ্বালা, ১০ বছর হলো প্রবাসী, কিছুতেই ব্যস্ততায় সময় মেলাতে পারে না কিন্তু মুখের ওপরে না বলতেও পারে না, মায়া লাগে। বয়সে বড় এক বোন ফোন করে একটানা কথা বলে যায়, আমরা কেমন আছি না আছি সেটাও জিজ্ঞাসা করবে না! অস্থির কিশোরী বড় বোন।

সকালের নাস্তা রেডি করতে করতে ফোন দিলো অনিলা, একবার রিং হতেই ফোন ধরে ফেললো মিলা আপা। সাথে সাথে কান্নার শব্দ শুনতে পেলো অনিলা। কি হয়েছে আপা? কাঁদছো কেনো?

কেঁদেই যাচ্ছে, অনিলা চা বানিয়ে চুমুক দিচ্ছে আর হেডফোনে সকাল বেলা কান্নার রেয়াজ শুনছে! আপা আমি কি তাহলে ফোন রেখে দেবো? কিছু বলছো না তো, আর বাংলাদেশে তো অনেক রাত এখন, ঘুমাও না কেনো?

কান্নার শব্দ বেড়ে গেলো। ফুপাতে ফুপাতে বললো, তোর কি সময় আছে আমার কথা শোনার? কখন থেকে ফোন দিচ্ছি, ধরিসই তো না। বলে আবারো কান্না। অনিলা বিরক্ত হতে শুরু করলো, সাড়ে ৭টায় সবাইকে উঠাতে হবে ৮টার মধ্যে বের হয়ে যেতে হবে। বাচ্চাকে কিন্ডার গার্ডেনে ড্রপ করে অফিস যেতে হবে।

কান্নার যে গতি, কখন যে ছাড়া পায় ভাবছে মনে মনে। এমন সময় মিলা আপা বলে উঠলো, তোর দুলা ভাই আমাকে ‘মমি’ বলেছে, বলে আবারো কান্না। অনিলা হাফ ছেড়ে বাঁচলো, এতক্ষন যা ভেবেছে তা না, যাক ঘূর্ণীঝড় না, কাল বৈশাখী মনে হচ্ছে। অনিলা বললো, বলো কি।

দুলাভাইয়ের এত সাহস? তোমাকে মমি বলে। ঘটনা কি? তাড়াতাড়ি বলো বা আমি না হয় সন্ধ্যায় ফোন দেই, এখন একটু তাড়াহুড়ো আছে। মিলা আপা গলা উঁচিয়ে বললো না না ফোন রাখবি না, এখনই শুনতে হবে, ৮ বার কল করার পর কল ব্যাক করেছিস, একবার ফসকে গেলে আবার ৮ দিন পর ফোন দিয়ে বলবি ব্যস্ত ছিলি! তোদের আবার ব্যস্ততা শেষ হয় না।

আমাদের জীবন তোমরা বুঝবে না, আচ্ছা বলো তাড়াতাড়ি শুনছি।

শোন্, গেলো শুক্রবার সামায়লার বিয়ের প্রোগ্রাম হলো রাওয়া হলে, আপন মামাতো বোনের বিয়ে। একটু সাজবো না? পার্লারে গিয়ে আমরা তিন বোনই সেজে এসেছি। এরপর গত বছর চেন্নাই থেকে আনা কানচিপুরম শাড়িটা পরে গেলাম। সবাই খুবই সুন্দর বললো। তোর দুলাভাইয়ের সকালে সার্জারি ছিলো (দুলাভাই পিজি হাসপাতালের চিকিৎসক), আমি বলে দিয়েছিলাম বিয়েতে অবশ্যই আসতে হবে।

তা না হলে খুবই বাজে দেখাবে, তুমি বাড়ির বড় জামাই। তাই তোর দুলা ভাই হাসপাতাল থেকে সোজা বিয়ে বাড়িতে এসেছে। এসে এক কোনায় ঘাপটি মেরে বসে আছে। আমি তো জানতাম না, তোর ভাগ্নি রায়লা এসে বললো, আম্মু আম্মু আসো, আব্বু এসেছে। এসে না একটা কর্নার এ বসে আছে। আমাকে দেখেও কিছুই বললো না।

(এই বাড়ির সব মেয়ের নামের পেছনে ‘লা’ আছে, বোনের মেয়ে ও বাদ যায়নি) শুনে আমি খুশী হয়ে তার কাছে গেলাম, তোর দুলাভাই আমাকে দেখে বলে আস সালামু আলাইকুম, ভালো আছেন আন্টি?

আমি চোখ বড় করে বললাম, আমাকে তুমি সালাম দিয়ে আন্টি ডাকছো কেন? বয়স কি বাড়ছে না কমছে। আমার গলা শুনে তোর দুলাভাই থতমত খেয়ে বলে ওহ! তুমি।

কেমন লাগে বল, শাড়িটা কিন্তু তোর দুলাভাইয়ের সাথেই কেনা চেন্নাই থেকে। ১৪ বছর হলো বিয়ে হয়েছে। নিজের বিয়ে করা বউকে চেনে না? বলে আন্টি! এত সুন্দর শাড়িটা ও ভুলে গেলো!

অনিলা অনেক কষ্টে হাসি আটকালো, মিলা আপা হাসি শুনলে খবর আছে, ঢোক গিলে বললো, কি বল! তারপরে?

এরপর আমাকে বলে, এখানে একটু বসো, আমি বসলাম। বলে রেস্ট রুম কোনদিকে বল, তাড়াতাড়ি যেতে হবে। একটু আগে শিলাকে তুমি ভেবে বলে ফেলেছি, এই টয়লেট কোনদিকে তাড়াতাড়ি বল, ইমার্জেন্সি। সে কটমট চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলে, ছিঃ দুলাভাই, আপনার এত অধ:পতন! আমাকে টয়লেট দেখাতে বলেন।

আমি বিব্রত হয়ে বললাম, ও আমি ভেবেছি তুমি মিলা। এরপর আমার পাশ দিয়ে এক ভদ্রমহিলা হেঁটে যাচ্ছিলো, আমি বললাম, আপা রেস্ট রুমটা কোনদিকে। তিনি ভুত দেখার মতো চমকে উঠে বলে তুমি মিলার জামাই সাদিক না? আমাকে আপা বলছো কেন? আমি তোমার ছোটো মামি! এবার তো আমার ঘাম ছুটে গেলো।

সবাই দেখতে এক রকমের, চিনবো কি করে? কোনো রকমে ঢোক গিলে দুঃখিত বলে কোনায় এসে বসে আছি। সবাই মিলে মমি সেজে বসে থাকলে চিনবো কিভাবে? একটু আগে রায়লার মতো একটা মেয়ে দেখলাম। ভয়ে কাছে ডাকিনি, কার না কার মেয়ে, শেষে না বিয়ে বাড়িতে অন্যের মেয়েকে ইশারার অভিযোগে থাপ্পড় খেতে হয়!

এখন কি বলবা বাথরুম কোনদিকে? নাকি বাসায় চলে যাবো? বল কেমন লাগে? এই লোকের ঘর করি ১৪ বছর। অনিলা আর থাকতে পারলো না, হো হো করে হেসে দিলো, হাসতে হাসতেই বললো, আহা বেচারা দুলাভাই, উনি তো ঠিকি বলেছেন,
এখন তো পার্লারে এমনই সাজায়। সবাইকে একই রকমের দেখায়। কে বিয়ের বউ, কে মেয়ের মা, কে বোন, কে মামি শাশুড়ি চেনার কোনো উপায় নেই তো, সবার একই মেকআপ!

আমিও তো গতবার বাংলাদেশ গিয়ে রাতুলের বিয়েতে ওর বউয়ের মা কে ছোটো বোন মনে করে তুমি বলে ফেলেছিলাম, পরে সে কি লজ্জা, কতবার যে সরি বলেছি, পুরো বিয়ে বাড়িতে কাঁটা হয়ে ছিলাম। আমার তো দুলাভাইয়ের কথা ভেবে খারাপ ই লাগছে।

তোর এই এক সমস্যা, সবসময়েই শত্রু পক্ষের জন্য দরদ। শুধু কি তাই, তোর দুলাভাই পলাকে পেত্নী বলেছে, চিন্তা কর? আর ছোটো মামির কাছে তো আমি লজ্জায় মুখ দেখাতে পারি না, পুরো বিয়ে বাড়িজুড়ে ফিসফাঁস আর আমাকে দেখে সবাই চুপ হয়ে যায়, শেষ পর্যন্ত সামায়লার কাছে গিয়ে বসলাম, বোনটার বিয়ে হয়ে গেলো।

কেমন যে হয় পরের ঘর, অন্য জীবন! আমাকে দেখে সামায়লা বলে, মিলাপু এরপর থেকে যে শাড়ি পরে বিয়েতে আসবে সেটার ছবি তুলে আগেই বড় দুলাভাইকে পাঠাবে, যেন উনি তোমার শাড়ি দেখে তোমাকে চিনতে পারে, উনি সার্জারির ডাক্তার এতো মমি এক সাথে দেখে ভাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে!

চিন্তা কর অনিলা, একটু পর গাড়িতে উঠে শশুরবাড়ি যাবে, কই মামা মামির জন্য মন খারাপ করবে, তা না, তিনিও উপদেশ দেয় আর মুখ টিপে হাসে। কেয়ামতের বেশি দেরী নাই। বললাম তোকে এসব কে বললো? বলে রায়লা, একটু আগেই এসে বলে গেলো বাবা, মাকে মমি বলেছে! আর পলা আন্টিকে পেত্নী।

দেখেছিস ঘরের শত্রু কেমন বিভীষণ, সারাদিন রাত আমি খাওয়াই, পড়াই, স্কুলে দিয়ে নিয়ে আসি, ঘুম পাড়াই কিন্তু বাপের এক নম্বর চামচা। বলে আবার কান্না শুরু।

অনিলার হাসতে হাসতে পেটে খিল, হাসি থামিয়ে বললো, বুঝেছি , এখন যা বলি একটি শুনো। রায়লা মনি বেঠিক কিছুই করেনি, তুমিও খালুর নেওটা ছিলে, আমিও আমার বাবার, সব মেয়েরাই এমন।

পলা আমারো ছোটো, দুলাভাইয়ের তো অনেক ছোটো, এখন উনি যদি নিজের ছোট্ট শালীর সাথে একটু ইয়ার্কি দুষ্টামি করে, করুক না, বড় ভাই তো না, দুলাহ ভাই।

সামায়লাও ভুল কিছু বলেনি। ও একটা সহজ সমাধান দিয়েছে, একটা শিক্ষিত সাবলম্বী মেয়ে বিয়ে করছে, কান্না করবে কেনো বা মন খারাপ করবে কেনো? বিয়ে তো খুশীর খবর।

আর মনে করে দেখো ১৪ বছর আগে তোমার বিয়েতেও কিন্তু আমরা সবাই পার্লারে সেজেছিলাম, তখন কিন্তু সবাইকে চিনতে পেরেছিলো, কারোর ভুল হয়নি। তাহলে এখন কি সমস্যা?

দুলাভাইয়ের মতো নামকরা ডাক্তার যিনি কিনা এতো জটিল জটিল সার্জারি করেন তার তো চোখে সমস্যা না। সমস্যা হলো এখনকার মেকআপে, সবাইকে এক রকমের বানিয়ে ফেলে, একগাদা সাদা সিমেন্ট মুখে লাগিয়ে তার ওপর রঙ তুলি দিয়ে পেইন্ট করে, কাউকেই চেনা যায় না, সবাই এক রকমের দেখতে।

এটা কিছু হলো? পার্লার থেকে সেজে আসার পর যদি কে মিলাপা, কে শিলাপা চেনা না যায় তাহলে সেজে কি লাভ? সাজতে না বলছি না, কিন্তু সবার চেহারায় একটা নিজস্ব সৌন্দর্য আছে, সেটা ঠিক রেখে সাজো, বা নিজেই ঘরে সাজো, সাদা সিমেন্ট মাখতে যাও কেনো?

তুমি যে মিষ্টি মিলাপা এটা তো বোঝা যেতে হবে, তাই না?

অনিলা, তু্ই কি আমার বোন নাকি সাদিকের বোন?

অনিলা বললো, আমি দুজনেরই বোন।

মিলা আপা, আমার অফিস আছে, ফোন রাখতে হবে, অলরেডি আমার দেরী হয়ে গেছে, দুলাভাইকে সালাম দিও।

আচ্ছা একটা কথা বলে ফোন রাখ, মমি কি সাদা হয়?

উফ মিলাপা!!!

(বিঃ দ্রঃ উপরের গল্পের প্রতিটি চরিত্র কাল্পনিক, কারো সঙ্গে মিলে গেলে কাকতালীয় মাত্র।)

এমআরএম/জেআইএম

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]