সাইপ্রাসে বেকার দিন কাটাচ্ছেন হাজারো বাংলাদেশি শিক্ষার্থী
মাহাফুজুল হক চৌধুরী
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য রাষ্ট্র সাইপ্রাস। মাত্র ৯ হাজার ২৫১ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই দেশটি ভৌগোলিক সৌন্দর্য আর পরিচ্ছন্নতার কারণে পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। তবে বাহির থেকে দেশটিকে যতটা ঝকঝকে মনে হয়, এর ভেতরে লুকিয়ে আছে হাজারো প্রবাসী বাংলাদেশির চরম হতাশার গল্প।
শেনজেনভুক্ত না হওয়ায় এবং কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতার কারণে দালালদের খপ্পরে পড়ে অনেক বাংলাদেশি দেশটিতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন। রঙিন স্বপ্নের পেছনে ছুটে সাইপ্রাসে পাড়ি জমিয়ে শেষ পর্যন্ত সব হারিয়ে রিক্তহস্তে দেশে ফেরার এমন শত শত করুণ কাহিনি আজ এক রূঢ় বাস্তবে পরিণত হয়েছে।
দেশটি আবার দুইভাগে বিভক্ত যেটি সম্পর্কে বাংলাদেশ থেকে যারা আসে তারা আদৌ জানে না কোন সাইপ্রাসে তারা যাচ্ছেন। যাওয়ার পরে বুঝতে পারেন যে তারা কোথায় এসেছে। সাইপ্রাসের একটি অংশ তুরস্কের অধীনে তুর্কি সাইপ্রাস ও অন্যটা গ্রিসের
অধীনে গ্রিক সাইপ্রাস। গ্রিক সাইপ্রাসই মূলত সাইপ্রাস নামে পরিচিত হওয়ায় আসার আগে বোঝার সাধ্য নেই যে আসলে কোন সাইপ্রাসে আসছেন।
তবে দুইদেশের ভাষা, কাজের মান, শিক্ষাব্যবস্থা ও মুদ্রার মান ভিন্ন। বলছি গ্রিক সাইপ্রাসের কথা। এখানে প্রতি ২ থেকে ৩ বছর পর পর বাংলাদেশিদের স্টুডেন্ট ভিসা বন্ধ করে রাখে। ৩-৪ বছর বন্ধ রাখার পর আবারও চালু করে। এটা হলো সাইপ্রাস সরকারের
একটা কৌশল। যখনই তাদের অর্থের প্রয়োজন হয় তখনই বাংলাদেশ, ইন্ডিয়া, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তান থেকে শিক্ষার্থী এনে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেয়। আর তাদের সেই ট্যাপে পা দিয়ে পথে বসে হাজার হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী।
ভিসা খোলার সাথে সাথেই বাংলাদেশের বিভিন্ন এজেন্সি ও সাইপ্রাসে থাকা বাংলাদেশি দালালচক্র নানান প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশ থেকে শত শত শিক্ষার্থী নিয়ে আসে সাইপ্রাসে। এমনকি ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি থেকে বাংলাদেশি দালালচক্র সাইপ্রাসে শিক্ষার্থী নিয়ে আসে যারা মূলত সাইপ্রাস থেকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের অভিবাসী হয়েছে। সাইপ্রাস আসার জন্য অ্যাকাডেমিক কোয়ালিফিকেশনের পাশাপাশি আইএলটিএস এর সার্টিফিকেট লাগলেও এটা কেবল নামেমাত্র।
দালালরা একটা ইংরেজি কোর্সের ভুয়া সার্টিফিকেট বানিয়ে কলেজগুলোর শর্ত পূরণ করে। কলেজগুলো জানলেও না জানার ভান করে ভিসা দিয়ে দেয়। কারণ তাদের দরকার মোটা অংকের টিউশন ফি।
বর্তমানে সাইপ্রাসে আসতে একজন শিক্ষার্থীর ১০-১২ লাখ টাকা খরচ হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা আসার আগে জানে না তাদের জন্য এক নির্মম বাস্তবতা অপেক্ষা করছে। দেশ থেকে কোট শ্যূট আর গলাই টাই চোখে সানগ্লাস কানে হেডফোন লাগিয়ে বিমানে উঠলেও সাইপ্রাস আসার পর তাদের রঙিন স্বপ্ন কেবল স্বপ্নতেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। প্রতিদিন কেবল হতাশার গল্পই শুনতে হয় তাদের পরিবারগুলোতে। ছেলেকে সাইপ্রাস পাঠাতে ৮ লাখ ১০ লাখ লোন নেওয়ার সময় মা বাবা স্বপ্ন দেখেছিল এই টাকা ছেলে গিয়ে এক বছরের ভেতর পরিশোধ করে দেবে। কিন্তু সেই টাকা পরিশোধ করতে গিয়ে পরে ভিটেমাটি বিক্রি করতে হচ্ছে অধিকাংশ পরিবারকে।
শেখ আবদুল আহাদ নামে এক শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, কষ্টে কান্না চলে আসে টাকা শেষ হয়ে যায়, খাওয়ার টাকা থাকে না ২/৩ দিন না খেয়েও থাকতে হয় টাকা বাঁচানোর জন্য। ৮ মাসে কাজ খুঁজতে খুঁজতে পাসহ পায়ের জুতা ক্ষয় হয়ে গেছে তবুও কাজ পেলাম না। সাইপ্রাস এখন বিপজ্জনক।
জাহিদ আহমেদ জানিয়েছেন, সাইপ্রাস আসছি ৫ মাস হয়েছে, এখনো কাজ পাইনি। দেশের ঋণের টাকার দুশ্চিন্তায় একদিনও ঘুমাতে পারিনি।
একরাম নামে আরেক শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, সাইপ্রাস আসছি এক বছর হয়। তার ভেতর দুইমাস গাছ কাটার কাজ করছি, একমাস বাগান পরিষ্কারের কাজ করছি, আর দুইমাস বিভিন্ন কাজ করে এক বছরে ৩০০০ ইউরো ইনকাম করেছি।
নাহিদ নামে আরেক শিক্ষার্থী জানান, তাকে দালাল ১২০০ ইউরো বেতনের চাকরি দেওয়ার কথা বলে সাইপ্রাস আনার পর এক বছর হয়ে গেলেও দালালদের দেখাও পায়নি, কাজের দেখাও পায়নি।
সাইপ্রাসের প্রধান সমস্যা হলো কাজের সংকট। এদেশ কৃষিনির্ভর বা শিল্প নির্ভরশীল দেশ না হওয়ায় এখানে কাজের উৎস তৈরি হয় না। সাইপ্রাস মূলত টুরিস্ট নির্ভর দেশ হওয়ায় এখানে সারা বছর কাজ থাকে না। তবে যারা হোটেলের শেপের কাজ পারে বা বিভিন্ন মেকানিক্যাল কাজ পারে তাদের মোটামুটি কাজ পাওয়া অনেক সহজ, কিন্তু সমস্যা হলো বাংলাদেশ থেকে যারা আসে তারা কোনো কাজ না জানার ফলে কাজ খুঁজতে খুঁজতে মাসের পর মাস চলে গেলেও কাজ মেলে না। সাইপ্রাসে কাজ না জানা লোককে কেউ কাজে নেয় না।
কাজ খুঁজতে খুঁজতে ৬ মাস এক বছর চলে গেলে এরপর আবার নতুন ভিসা রিনিউ করার সময় চলে আসে। এবার ভিসা রিনিউ করতে লাগে ২৫০০-৩০০০ ইউরো। কেউ কেউ দেশ থেকে টাকা আনতে পারলেও অধিকাংশ শিক্ষার্থী এক দুইবছর পরে অবৈধ হয়ে যায়। কাজ না পাওয়ার আরও একটা মূল কারণ হলো কলেজ। কলেজ বা ইউনিভার্সিটিগুলোতে সপ্তাহে ২ থেকে ৩ দিন ক্লাস করা বাধ্যতামূলক। ক্লাস না করলে ইমিগ্রেশনে রিপোর্ট করে দেয়। আবার ঠিকমতো ক্লাস করতে গেলে কাজে যাওয়া সম্ভব না। তাই কাজ ধরে রাখতে গেলে কলেজ বাদ করে দিতে হয়। তার মধ্যে আবার কাজে পুলিশের কাছে ধরা খাওয়ার ঝুঁকি আছেই।
এ ব্যাপারে সাইপ্রাসের সিনিয়র বাংলাদেশি সিটিজেন মোজাম্মেল হোসেন তারেক বলেন, বাংলাদেশ থেকে সাইপ্রাসে শিক্ষার্থী আসার আগে যেন অনলাইন বা বিভিন্ন মাধ্যমে আগে খোঁজ নিয়ে তারপর আসে।
সাইপ্রাসে এসে যেখানে ছেলেরা জীবন সংগ্রামে হিমশিম খাচ্ছেন। সেখানে মেয়েরাও পিছিয়ে নেই। তারাও সমানতালে সাইপ্রাস আসছে। উন্নত ও স্বাধীন জীবনের আশায় সাইপ্রাস পাড়ি দেওয়ার পর বুঝতে পারে দেশেই ভালো ছিল তারা। এসব মেয়েরা কোনো কাজ না জানায় তাদের কাজ পাওয়াটা খুবই কঠিন। কারণ এখানে রেস্টুরেন্ট, হোটেল, সুপারশপের কাজগুলোতে এদেশের স্থানীয় মেয়েরা কাজ করে।
ফলে বাংলাদেশ, ইন্ডিয়া, শ্রীলঙ্কা ও নেপাল থেকে আসা মেয়েদের এখানে কাজে নেয় না। তাই তাদের বাধ্য হয়ে কেউ কেউ বাসার কাজ করে, কেউ কেউ সুপারমার্কেটে ক্লিনিং এর কাজ করে, আবার কেউ কেউ অনলাইনে খাবারের ব্যবসা করে। দেশে কখনো ভাত রান্না না করা মেয়েটি উন্নত জীবনের আশায় সাইপ্রাস এসে বুঝতে পারে ইউরোপের উন্নত জীবন মানে মানুষের বাসায় কাজ করা আর অনলাইনে খাবার বানিয়ে বিক্রি করা।
সাইপ্রাসের সিনিয়র বাংলাদেশি সিটিজেন নাহিদা আক্তার পরামর্শ দিয়েছেন, বাংলাদেশ থেকে যেসব মেয়েরা আসবে যেন হাতের কোনো সেলাই কাজ বা রেস্টুরেন্টের শেপের কাজ শিখে আসে তাহলে কাজ পাওয়া সহজ হবে।
এমআরএম