লন্ডন ম্যারাথন ২০২৬: রেকর্ড ভাঙা গতিতে ছুটলো মানবিকতার জয়গান

এস ইসলাম
এস ইসলাম এস ইসলাম , লন্ডন থেকে
প্রকাশিত: ০৩:০৭ পিএম, ২৭ এপ্রিল ২০২৬
ছবি-জাগো নিউজ

রোববার সকাল থেকে লন্ডন শহর যেন এক বিশাল উৎসবমঞ্চে পরিণত হয়েছিল। কারণ এদিন অনুষ্ঠিত হয় বহুল প্রতীক্ষিত লন্ডন ম্যারাথন ২০২৬। রাজধানীর ট্রেন, বাস, আন্ডারগ্রাউন্ড, ডিএলআর—সব পরিবহন ব্যবস্থায় ছিল উপচেপড়া ভিড়। মনে হচ্ছিল, শহরের মানুষ যেন একসঙ্গে একটি গন্তব্যের দিকে ছুটছে।

প্রবীণ নারী-পুরুষ, তরুণ-তরুণী, শিশু, পরিবার—সব বয়সের মানুষ হাতে ব্যানার, পতাকা ও ক্যামেরা নিয়ে রওনা হন ম্যারাথনের বিভিন্ন দর্শনীয় পয়েন্টে। সকাল থেকেই লন্ডনের রাস্তায় ছিল উৎসবের আবহ।

সবচেয়ে বেশি ভিড় দেখা যায় গ্রিনিচ এলাকায়, কারণ এখান থেকেই শুরু হয় বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ এই ম্যারাথন। নির্ধারিত স্টার্ট জোনে ভোর থেকেই জড় হতে থাকেন অংশগ্রহণকারীরা। কেউ শরীর গরম করছেন, কেউ স্ট্রেচিং করছেন, কেউ পরিবারের সঙ্গে শেষ মুহূর্তের ছবি তুলছেন।

শুরুর বাঁশি বাজতেই হাজারো দৌড়বিদ ধীরে হাঁটা ও হালকা জগিং দিয়ে যাত্রা শুরু করেন। পরে ধীরে ধীরে গতি বাড়িয়ে ছন্দময় গতিতে এগিয়ে যান ৪২.১৯৫ কিলোমিটারের দীর্ঘ পথ ধরে।

অংশগ্রহণকারীদের পোশাকেও ছিল ভিন্নতা। কারও জার্সিতে নিজের নাম, কারও গায়ে দাতব্য প্রতিষ্ঠানের লোগো, কারও পোশাকে লেখা ছিল প্রিয়জনের স্মৃতি। অনেকে নানা কৌতুকপূর্ণ সাজে অংশ নেন। কেউ ক্যানসার সচেতনতা, কেউ মানসিক স্বাস্থ্য, কেউ শিশু কল্যাণের বার্তা নিয়ে দৌড়ান।

এই আয়োজন কেবল প্রতিযোগিতা নয়, মানবিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতারও প্রতীক। দক্ষিণ-পূর্ব লন্ডনের ঐতিহাসিক কাট্টি সার্ক এলাকায় ছিল বিপুল জনসমাগম। রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে হাজারো দর্শক হাততালি, চিৎকার ও ব্যানার তুলে দৌড়বিদদের উৎসাহ দেন। পরিবারগুলো প্রিয়জনকে খুঁজছিলেন জনসমুদ্রে, শিশুরা ছোট পতাকা নাড়ছিল, বৃদ্ধরা বসে বসে করতালি দিচ্ছিলেন।

টাওয়ার ব্রিজ এলাকাতেও ছিল বিশাল জনসমাগম। লন্ডনের ঐতিহ্যবাহী এই সেতুর ওপর দিয়ে দৌড়বিদদের এগিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দর্শকদের মুগ্ধ করে। পর্যটক, স্থানীয় বাসিন্দা ও সংবাদকর্মীদের ভিড়ে পুরো এলাকা মুখর হয়ে ওঠে।

পরে ক্যানারি ওয়ার্ফ এলাকায় কর্পোরেট লন্ডনের হৃদয়ে দাঁড়িয়ে দর্শকেরা দৌড়বিদদের উৎসাহ দেন। শেষদিকে ভিক্টোরিয়া এমব্যাঙ্কমেন্ট এলাকায় ক্লান্ত শরীর নিয়েও প্রতিযোগীরা লড়াই চালিয়ে যান

ম্যারাথনের সমাপ্তি ঘটে ঐতিহাসিক দ্য মল সড়কে, বাকিংহাম প্যালেসের নিকটে। শেষ লাইনে পৌঁছে কেউ আনন্দে কেঁদেছেন, কেউ মাটিতে বসে পড়েছেন, কেউ দুই হাত তুলে উদযাপন করেছেন। পরিবার ও বন্ধুদের আলিঙ্গনে ভরে ওঠে ফিনিশিং এলাকা।

পুরুষ বিভাগে কেনিয়ার সেবাস্টিয়ান সাওয়ে দুর্দান্ত কৌশলী দৌড়ে শিরোপা জিতেছেন। শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে শেষ পর্যায়ে গতি বাড়িয়ে তিনি বিজয় নিশ্চিত করেন। এই জয়কে তার ম্যারাথন ক্যারিয়ারের বড় মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে।

নারী বিভাগে ইথিওপিয়ার টিগস্ট আসেফা আবারও অসাধারণ নৈপুণ্য দেখিয়েছেন। তিনি ইতিহাসের দ্রুততম সময়গুলোর একটি নিয়ে শীর্ষস্থান দখল করেন। দীর্ঘ দূরত্বের দৌড়ে তার ধারাবাহিক সাফল্য আবারও প্রমাণ করেছে বিশ্ব অ্যাথলেটিকসে তার শক্ত অবস্থান।

jagonews24

আয়োজকরা জানান, অনুকূল আবহাওয়া, শক্তিশালী প্রতিযোগিতা এবং দ্রুতগতির রেস কৌশলের কারণে এটি সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসরগুলোর একটি। অংশগ্রহণকারী সংখ্যাও ছিল উল্লেখযোগ্য। হাজার হাজার অপেশাদার রানার মূল প্রতিযোগিতায় অংশ নেন।

লন্ডন ম্যারাথন শুধু একটি ক্রীড়া আয়োজন নয়—এটি সহনশীলতা, শৃঙ্খলা, সামাজিক সংহতি ও মানবিকতার প্রতীক। এখানে প্রথম হওয়া যেমন গৌরবের, তেমনি শেষ লাইনে পৌঁছানো প্রতিটি মানুষও একেকজন বিজয়ী।

দিন শেষে ক্লান্ত হলেও আনন্দে ভরা ছিল পুরো লন্ডন। লাখো মানুষের করতালি, দৌড়বিদদের ঘাম, সংগ্রাম ও সাফল্যের গল্পে লন্ডন ম্যারাথন ২০২৬ আবারও প্রমাণ করল এটি শুধু দৌড় নয়, এটি এক বৈশ্বিক অনুপ্রেরণার নাম।

এমআরএম

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]