আত্মশুদ্ধির পথে অনন্য এক যাত্রা

প্রবাস ডেস্ক
প্রবাস ডেস্ক প্রবাস ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৯:০০ এএম, ১৭ মে ২০২৬
ছবি-জাগো নিউজ

কাজী মনজুর করিম মিতুল, প্রকৌশলী ও প্রাবন্ধিক

পাইলট যখন বললেন, ‌‘মাগরিবের সময় হয়েছে, হাজীগণ চাইলে এখন নামাজ আদায় করতে পারেন’, আমার ঘড়ি তখন বলছে, ঢাকায় রাত ৮টা। বিমানের জানালা দিয়ে বাইরে দেখছিলাম, আকাশের নীল বুকে লালিমার পোজ, যেন এক নিপুণ শিল্পী তুলি নিয়ে আকাশের বুকে মেঘ দিয়ে আঁকছেন বিমূর্ত চিত্র, অপরূপ তার সৌন্দর্য, অপার্থিব তার অনুভব।

jagonews24

আমাদের বিমান তখন ঢাকা থেকে পশ্চিমে মদিনার দিকে উড়ে চলেছে ভারতের ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে। আমরা যেহেতু পৃথিবীর আহ্নিক গতির বিপরীতে উড়ে চলেছি, সময় তাই পিছিয়ে যাচ্ছে। তাই ঢাকায় সূর্যাস্তের ঘণ্টাদেড়েক পর আমাদের মাগরিবের সময় হলো।

পবিত্র জিলহজ্জ মাস আসন্ন। আমরা, মানে যারা পবিত্র হজ্জ পালনের উদ্দেশ্যে ঢাকা থেকে মদীনার পথে রওনা হয়েছি, আমাদের তায়াম্মুম করে নামাজ আদায় করতে হবে। বিমানে ওযুর ব্যবস্থা নেই। কেন নেই? কাকে জিজ্ঞেস করব? টয়লেটে গিয়ে দেখলাম, অনেকেই বোতলে করে পানি নিয়ে পা ধুয়ে ফ্লোরে থৈ থৈ করে রেখেছেন। এর সমাধান হতে পারতো তায়াম্মুমের মাটি সাথে রাখা। (মনে পড়ল, বল সাবানের আকারের এক টুকরো মাটি কিনতে আমাকে বায়তুল মোকাররম মসজিদের মার্কেটে যেতে হয়েছিল।)

থাক সে কথা। মদীনার বিমানবন্দরে আমাদের অভিজ্ঞতা বেশ ভালো, যদিও অনেক ভয় দেওয়া হয়েছিল। ভাষাগত সমস্যা ছাড়া আর কোনো কিছুই প্রতিকূল ছিল না। মোটামুটি সবার প্রায় সব লাগেজ পেয়ে গেলাম আমরা, মানে আমাদের কাফেলার ২৪ জন। বাসে উঠে হোটেলের পথে যখন রওনা হলাম, মদিনায় তখন রাত প্রায় এগারোটা।

ফ্লাইওভার, আন্ডারপাস আর ঝকঝকে সব অট্টালিকা দেখে মনে হচ্ছিল পশ্চিমের কোনো উন্নত দেশে এসেছি, প্রাচ্য নয়। অবশ্য রোড ডিভাইডারে খেজুর গাছগুলো আমাদের আরব্য স্বাগতম জানাচ্ছিল। হোটেলে পৌঁছে নুসুক কার্ড (এ বছর এই কার্ড ছাড়া হজ্জ পালন নিষিদ্ধ করেছে সৌদি সরকার) ও সরকারি হাদিয়া (রাতের খাবার) পেয়ে গেলাম।

আমাদের হোটেলটা মাসজিদ-ই-নববীর কাছেই; তাই হেঁটেই যাওয়া-আসা করছিলাম। গরম এখানে ঢাকার তুলনায় অনেক বেশি, তাপমাত্রা ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ওঠে দুপুর বেলা। মসজিদ প্রাঙ্গণে তখন সুবিশাল ছাতা মেলে মুসল্লিদের ছায়ার ব্যবস্থা করা হয়, চালানো হয় মিস্ট ফ্যান (যা থেকে বাতাসের সাথে জলীয় বাষ্প নির্গত হয়)।

jagonews24

বৃহস্পতিবার জোহরের নামাজ জামাতে আদায় করে আমরা ‘রিয়াজুল জান্নাত’ অর্থাৎ মহানবী (সা:) এর মিম্বার ও পাক রওজা মোবারকের মধ্যবর্তী স্থান (যাকে বেহেশতের বাগান বা অংশ বলা হয়) এর ভেতর যাবার সুযোগ পেলাম। এখানে ঢোকার অনুমতি এখন সোনার হরিণ। নুসুকের মাধ্যমে আলাদাভাবে কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হয় এবং সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য ভেতরে অবস্থান করা যায়।

এখানে শুধু রাসূল (সা:)-এর একার নয়, তাঁর প্রিয় সাথী দুই খলিফার কবরও এই এক দেয়ালের ভেতর। তাই এখানে এসে সবাই আল্লাহর কাছে বাড়তি প্রার্থনা করেন, আশা করেন আল্লাহর সবচেয়ে প্রিয় বান্দার সুপারিশ মিলবে, আখেরাতে মুক্তি মিলবে, জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচার পথ মিলবে। তবে এখানে পুলিশের তাড়া খেতে খেতে নামাজ পড়ার ব্যাপারটা আমার জন্য কঠিন ছিল।

অবশ্য ভালোবাসা আর পূণ্য অর্জনের পথ কখনো সুগম হয় না। হাজিরা কষ্ট আর প্রতিকূলতা সহ্য করার মানসিকতা নিয়েই হজ্জে আসেন। তবে এখানে আফ্রিকার মুসলিম দেশগুলো থেকে আসা কাফেলাগুলো হজ্জে যোগ করেছে বাড়তি মাত্রা।

তাদের উজ্জ্বল ও রঙ-বেরঙের ছিট কাপড়ে তৈরি পোশাক পরে দল বেঁধে ঘোরা আর জামাত শুরুর আগে এসে ঘাড়ের ওপর এসে জায়গা দখলের প্রবণতা হজ্জের মহিমার সাথে সাংঘর্ষিক। জানি না, তাদের আচার এমন কেন। এখানে বাংলাদেশের কর্মীর দেখা মেলে মসজিদ, হোটেল, দোকান - প্রায় সবখানে। তবে পাকিস্তানিদের দৌরাত্ম অনেক বেশি।

আসা যাক আসল কথায়। সকল মসজিদ আল্লাহর ঘর, কিন্তু এই মাসজিদ-এ- নববীতে নামাজের ফজিলত অনেক বেশি। সবাই তাই এখানে দীর্ঘ সময় ও আকুতি নিয়ে ইবাদত করেন। জুমার নামাজ ভেতরে পড়ার জন্য ৩-৪ ঘণ্টা আগে এসে জায়গা দখল করতে হয়। ভেতরের পরিবেশ অত্যন্ত শান্তিদায়ক। আভিজাত্য আর পবিত্রতার এক অনন্য সমন্বয় এখানে। বড় বড় কলাম, সুবর্ণখচিত তার মাথা! চোখ ধাঁধানো তার আলোকসজ্জা। সুবিশাল ঝাড়বাতি আর আরব স্থাপত্যের শৈল্পিক কারুকাজ চারদিকে। মেঝেতে মোটা সবুজ গালিচা, যেন জান্নাতের ছোঁয়া।

কেউ এখানে জিকির করছেন, কেউ আল-কুরআন পড়ছেন নিচু স্বরে, কেউ নামাজে রত। কেউ বা চোখের জলে পরম করুণাময়ের করুণা ভিক্ষা করছে। সবচেয়ে ভালো লাগছিল যখন অনেক তরুণ হাজীদের দেখছিলাম। আর বৃদ্ধ মানুষদের কষ্ট দেখে বুক ফেটে যাচ্ছিল। আমাদের দেশের অধিকাংশ হাজীদের বয়স পঞ্চাশের ওপর। অন্যান্য দেশের হাজীরা অপেক্ষাকৃত কম বয়সী।

স্বভাবসুলভ ভাবেই আমি চ্যাটজিপিটি-কে প্রশ্ন করলাম ‘আমি মাসজিদ-ই-নবাবীর ভেতরে আছি। আমাকে তুমি কী ইবাদত পড়ার পরামর্শ দেবে?’

সে সাথে সাথে জবাব দিলো, ‘আল মাসজিদ আন নাওয়াবি-এর ভেতরে অবস্থান করা একজন মুসলিমের জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৌভাগ্য। এখানে আপনার সময়কে ইবাদত, আত্মচিন্তা, দ্বীনি জ্ঞান অর্জন এবং প্রশান্ত হৃদয়ে নীরবে বসে থাকার মধ্যে সুন্দরভাবে ভাগ করে নিন।’ তার এই জবাবে আমি অবাক হলাম। ১০টি পয়েন্ট দিয়ে সে আমাকে চমৎকার কিছু পরামর্শ দিলো। সেগুলো প্রতিপালন করলাম যথাসাধ্য।

চলবে...

এমআরএম

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]