ক্রিটিকাল থিংকিং ও ইনফরমাল লজিক: তথ্যের ভিড়ে সত্য খোঁজার শিল্প

ড. হারুন রশীদ
ড. হারুন রশীদ ড. হারুন রশীদ , ডেপুটি এডিটর (জাগো নিউজ)
প্রকাশিত: ১০:১৬ এএম, ১৭ মে ২০২৬

সকালে ঘুম থেকে উঠেই আমরা খবর দেখি, ফেসবুক স্ক্রল করি, ইউটিউবে ভিডিও দেখি, অফিসে গিয়ে সহকর্মীর মতামত শুনি, বাসায় ফিরে টকশো দেখি। দিনের শেষে আমাদের মাথার ভেতর জমা হয় হাজারো তথ্য, মতামত, গুজব, অর্ধসত্য ও আবেগমিশ্রিত বক্তব্য। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এসবের মধ্যে সত্য কোনটি? কোন যুক্তি গ্রহণযোগ্য, আর কোনটি কৌশলী বিভ্রান্তি?

বর্তমান যুগে সবচেয়ে বড় সংকট হয়তো তথ্যের অভাব নয়; বরং তথ্য যাচাইয়ের সক্ষমতার অভাব। এখানেই ‘ক্রিটিকাল থিংকিং’ ও ‘ইনফরমাল লজিক’র গুরুত্ব সামনে আসে।

একসময় মানুষ মনে করত, শিক্ষিত হলেই সে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, উচ্চশিক্ষিত মানুষও ভুয়া খবর বিশ্বাস করছে, আবেগতাড়িত রাজনৈতিক প্রচারণায় বিভ্রান্ত হচ্ছে, কিংবা সামাজিক মাধ্যমে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচারের শিকার হচ্ছে। কারণ, শুধু তথ্য জানাই যথেষ্ট নয়; তথ্যকে বিশ্লেষণ করার ক্ষমতাও প্রয়োজন।

ক্রিটিকাল থিংকিং বা সমালোচনামূলক চিন্তা মূলত এমন এক মানসিক দক্ষতা, যার মাধ্যমে মানুষ কোনো তথ্য, দাবি বা মতামত অন্ধভাবে গ্রহণ না করে যুক্তি, প্রমাণ ও বাস্তবতার আলোকে যাচাই করে। অন্যদিকে ইনফরমাল লজিক হলো দৈনন্দিন জীবনের যুক্তি বিশ্লেষণের একটি পদ্ধতি। এটি বইয়ের কঠিন গাণিতিক যুক্তি নয়; বরং মানুষের কথাবার্তা, রাজনৈতিক বক্তব্য, বিজ্ঞাপন, সংবাদ কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে ব্যবহৃত যুক্তির গঠন ও দুর্বলতা চিহ্নিত করার কৌশল।

আমাদের সমাজে এই চর্চার অভাব ভয়াবহ। আমরা সাধারণত বক্তব্যের ভেতরের যুক্তি নয়, বক্তার পরিচয় দেখি। কেউ জনপ্রিয় হলেই ধরে নিই তিনি সত্য বলছেন। কেউ আমাদের পছন্দের রাজনৈতিক দলের হলে তার ভুলও সমর্থন করি। আবার কেউ অপছন্দের হলে তার সঠিক কথাও অস্বীকার করি। অর্থাৎ আমরা যুক্তির চেয়ে আবেগকে বেশি গুরুত্ব দেই। এক্ষেত্রে  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বিশ্বাস যেখানে অন্ধ, সেখানে যুক্তি অসহায়’  -এই উক্তিটি যথার্থ।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আগে গুজব ছড়াতে সময় লাগত, এখন কয়েক মিনিটেই লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। একটি মনগড়া তথ্য, আবেগময় ছবি বা কাটা-ছেঁড়া ভিডিও মানুষের মনকে দ্রুত প্রভাবিত করে। কারণ, মানুষ সাধারণত সেই তথ্যই বিশ্বাস করতে চায়, যা তার পূর্বধারণাকে সমর্থন করে। মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় ‘কনফার্মেশন বায়াস’।

ধরা যাক, কোনো ব্যক্তি আগে থেকেই মনে করেন দেশের সব সমস্যা একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর কারণে হচ্ছে। এখন সামাজিক মাধ্যমে যদি সেই গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কোনো ভিত্তিহীন পোস্ট আসে, তিনি তা যাচাই না করেই বিশ্বাস করবেন। কারণ, সেটি তার পূর্বধারণার সঙ্গে মিলে যায়। এখানেই ক্রিটিকাল থিংকিংয়ের প্রয়োজন।

আমরা সাধারণত বক্তব্যের ভেতরের যুক্তি নয়, বক্তার পরিচয় দেখি। কেউ জনপ্রিয় হলেই ধরে নেই তিনি সত্য বলছেন। কেউ আমাদের পছন্দের রাজনৈতিক দলের হলে তার ভুলও সমর্থন করি। আবার কেউ অপছন্দের হলে তার সঠিক কথাও অস্বীকার করি। অর্থাৎ আমরা যুক্তির চেয়ে আবেগকে বেশি গুরুত্ব দেই।

সমস্যা হলো, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় মুখস্থবিদ্যার ওপর জোর বেশি, চিন্তার স্বাধীনতার ওপর কম। একজন শিক্ষার্থীকে শেখানো হয় পরীক্ষায় কী লিখতে হবে, কিন্তু খুব কম শেখানো হয় কেন লিখতে হবে। ফলে তারা তথ্য পুনরাবৃত্তি করতে শেখে, বিশ্লেষণ করতে শেখে না।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে এখন স্কুল পর্যায় থেকেই ‘মিডিয়া লিটারেসি’, ‘লজিক’ ও ‘ক্রিটিকাল রিজনিং’ শেখানো হচ্ছে। কারণ, তারা বুঝেছে ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ হবে তথ্যের যুদ্ধ। সেখানে অস্ত্র নয়, মানুষের চিন্তাশক্তিই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা।

বাংলাদেশেও এই প্রয়োজন বাড়ছে। রাজনৈতিক বক্তব্য থেকে শুরু করে অর্থনীতি, ধর্ম, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক—সব ক্ষেত্রেই আবেগনির্ভর বিভাজন বাড়ছে। কেউ কোনো তথ্য দিলেই আমরা হয় অন্ধ সমর্থন করি, নয়তো তীব্র আক্রমণে যাই। মাঝখানে যুক্তিনির্ভর আলোচনা ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে।

টেলিভিশনের টকশোগুলো দেখলেও বিষয়টি স্পষ্ট হয়। অনেক সময় সেখানে তথ্যের চেয়ে চিৎকার বেশি থাকে। যুক্তির বদলে ব্যক্তিগত আক্রমণ চলে। এক পক্ষ অন্য পক্ষকে কথা বলতে দেয় না। দর্শকও ধীরে ধীরে এমন সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। ফলে সভ্য বিতর্কের জায়গা সংকুচিত হচ্ছে।

ইনফরমাল লজিক আমাদের শেখায়, সব যুক্তি সমান শক্তিশালী নয়। কিছু সাধারণ ভুল যুক্তি বা ‘ফ্যালাসি’ প্রায়ই আমরা দেখি।

যেমন ‘অ্যাড হোমিনেম’। অর্থাৎ যুক্তির জবাব না দিয়ে ব্যক্তিকে আক্রমণ করা। কেউ অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে কথা বললে তার বক্তব্য বিশ্লেষণ না করে বলা হলো, ‘তিনি তো অমুক দলের লোক।’ এতে যুক্তির উত্তর দেওয়া হয় না।

আবার ‘স্ট্র ম্যান ফ্যালাসি’ নামের একটি প্রবণতা আছে। এখানে প্রতিপক্ষের বক্তব্য বিকৃত করে সহজ সংস্করণ বানিয়ে সেটি আক্রমণ করা হয়। বাস্তব বিতর্কেও এটি খুব সাধারণ ঘটনা।

আরেকটি হলো ‘ফলস ডিলেমা’—যেখানে বলা হয়, হয় তুমি আমার পক্ষে, নয়তো দেশের বিরুদ্ধে। অথচ বাস্তবে মাঝামাঝি অসংখ্য অবস্থান থাকতে পারে।

রাজনীতি, বিজ্ঞাপন ও সামাজিক প্রচারণায় এসব কৌশল নিয়মিত ব্যবহার হয়। একজন সচেতন নাগরিকের কাজ হলো এসব চিনতে শেখা।

ক্রিটিকাল থিংকিং মানে কিন্তু সবকিছুতে সন্দেহ করা নয়। এটি নেতিবাচক মানসিকতা নয়। বরং এটি এমন এক বুদ্ধিবৃত্তিক সততা, যেখানে মানুষ নিজের বিশ্বাসকেও প্রশ্ন করতে শেখে। ‘আমি ভুল হতে পারি’—এই উপলব্ধি থেকেই প্রকৃত জ্ঞানচর্চা শুরু হয়।

দুঃখজনকভাবে আমাদের সমাজে মতবিরোধকে প্রায়ই শত্রুতা হিসেবে দেখা হয়। কেউ ভিন্ন মত দিলেই তাকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করা হয়। অথচ সভ্য সমাজে ভিন্নমতই জ্ঞানের বিকাশ ঘটায়। ইতিহাসে বড় বড় আবিষ্কার ও সামাজিক পরিবর্তন এসেছে প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করার মাধ্যমে।

বিজ্ঞানও মূলত ক্রিটিকাল থিংকিংয়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। বিজ্ঞান কোনো কিছু অন্ধভাবে বিশ্বাস করে না; প্রমাণ খোঁজে, পরীক্ষা করে, ভুল প্রমাণিত হলে মত পরিবর্তন করে। অথচ সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে আমরা প্রায় উল্টো আচরণ করি। একবার কোনো মত গ্রহণ করলে সেটিকেই চূড়ান্ত সত্য ধরে নেই।

এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে এই দক্ষতা আরও জরুরি হয়ে উঠেছে। প্রযুক্তি এখন মানুষের মতো ভাষায় লেখা তৈরি করতে পারে, কণ্ঠস্বর নকল করতে পারে, এমনকি ভুয়া ভিডিওও বানাতে পারে। ফলে সামনে এমন এক সময় আসছে, যখন চোখে দেখা জিনিসও সহজে বিশ্বাস করা যাবে না। তখন মানুষকে তথ্যের উৎস, প্রমাণ ও যুক্তি যাচাইয়ের অভ্যাস গড়ে তুলতেই হবে।

এক্ষেত্রে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের শুধু ‘কী ভাবতে হবে’ তা নয়, ‘কীভাবে ভাবতে হবে’ সেটিও শেখাতে হবে। শিক্ষক যদি প্রশ্নকে নিরুৎসাহিত করেন, তবে শিক্ষার্থী কখনো স্বাধীন চিন্তক হতে পারবে না।

গণমাধ্যমেরও দায়িত্ব আছে। উত্তেজনাকর শিরোনাম বা আবেগনির্ভর প্রচারণার বদলে তথ্যভিত্তিক সাংবাদিকতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদেরও সচেতন হতে হবে। কোনো খবর শেয়ার করার আগে অন্তত উৎস যাচাই করা প্রয়োজন।

আমাদের ব্যক্তিগত জীবনেও ক্রিটিকাল থিংকিং গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবসা, চাকরি, সম্পর্ক কিংবা অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত—সব ক্ষেত্রেই আবেগের পাশাপাশি যুক্তি প্রয়োজন। প্রতারণা, গুজব বা বিভ্রান্তি থেকে বাঁচতে যুক্তিবোধই সবচেয়ে বড় সুরক্ষা।

প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিস বলেছিলেন, ‘অপরীক্ষিত জীবন বেঁচে থাকার যোগ্য নয়।’ কথাটি আজ আরও বেশি সত্য। কারণ, আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে মানুষের মন জয় করার জন্য প্রতিনিয়ত তথ্যের যুদ্ধ চলছে। সেখানে যে সমাজ বেশি চিন্তা করতে পারবে, প্রশ্ন করতে পারবে এবং যুক্তি বিশ্লেষণ করতে পারবে, ভবিষ্যৎ নেতৃত্বও তারাই দেবে।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্যও এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যদি শুধু আবেগ দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করি, তবে দীর্ঘমেয়াদে ভুল সিদ্ধান্তের খেসারত দিতে হবে। অর্থনীতি, শিক্ষা, পরিবেশ কিংবা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক—সব জায়গায় তথ্যনির্ভর ও যুক্তিনির্ভর চিন্তা প্রয়োজন।

অতএব, ক্রিটিকাল থিংকিং ও ইনফরমাল লজিক কোনো বিলাসী বুদ্ধিবৃত্তিক বিষয় নয়; এটি এখন নাগরিক জীবনের অপরিহার্য দক্ষতা। সত্য ও মিথ্যার মাঝখানে দাঁড়িয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য এটি এক ধরনের মানসিক কম্পাস।

তথ্যের এই বিস্ফোরণের যুগে হয়তো সবচেয়ে বড় প্রশ্ন আর ‘কত জানি’ নয়; বরং ‘কীভাবে জানি’। আর সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই আমাদের ফিরে যেতে হবে যুক্তি, বিশ্লেষণ ও সমালোচনামূলক চিন্তার চর্চায়।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ।
[email protected]

এইচআর/এমএফএ/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।