দ. আফ্রিকায় বেড়েই চলেছে হত্যা : প্রশ্নবিদ্ধ দূতাবাসের কর্মকাণ্ড

ফারুক আস্তানা
ফারুক আস্তানা ফারুক আস্তানা , দক্ষিণ আফ্রিকা প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ০১:২১ এএম, ২৫ নভেম্বর ২০২০
মাফিয়া চক্রে জড়িত সোলেয়মান, হাসান ও জাকির।

দক্ষিণ আফ্রিকার নর্থ ওয়েস্ট প্রদেশের মাফিকিং শহরের কাছে মারেসানি এলাকায় দুই বাংলাদেশি ইমন ও আব্দুর রহমানকে গুলি করে হত্যার পেছনে সরাসরি জড়িত মাফিয়া চক্রের সদস্য বাংলাদেশি সোলেয়মান, জাকির ও হাসান।

ঘটনার শুরুতে কেউ মুখ না খুললেও এখন সবকিছু পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে বলে জানান একাধিক বাংলাদেশি। প্রবাসীরা বলছেন, ব্যবসা সংক্রান্ত বিরোধের জেরে স্থানীয় কৃষ্ণাঙ্গ সন্ত্রাসীদের ভাড়া করে হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে।

বাংলাদেশিদের অভিযোগ, তারা ওই এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে চাঁদাবাজি, দোকান দখল, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে স্থানীয় সন্ত্রাসীদের লেলিয়ে দিয়ে মারধর, টাকা, মোবাইল, মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করে নিতেন। দোকানের পাসে দোকান দিয়ে ব্যবসায়ী হয়রানি করেও আসছিল তারা।

এসব বিষয়ে অতিষ্ঠ হয়ে বাংলাদেশিরা ঐক্যবদ্ধভাবে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রিটোরিয়াস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসে সহযোগিতার জন্য কাউন্সিলর খালেদা বেগমের কাছে অভিযোগ জানান।

পরে দূতাবাসের এ কর্মকর্তা নিজেই মাফিকিং মারেসানিতে কয়েকবার সোলেয়মান, মো. হাসান ও জাকির হোসেনদের সঙ্গে সমঝোতা করতে গিয়ে হুমকি-ধামকি পেয়ে ব্যর্থ হয়ে ফিরে এসেছেন।

বেশ কয়েকটি সূত্র নিশ্চিত করে বলেন, ‘হাসান, জাকির, সোলেয়মানদের কাছে দূতাবাসের লোকজনও অপমানিত হয়ে পুলিশি পাহারা নিয়ে মারেসানি ছেড়ে আসতে বাধ্য করা হয়েছে। এই তিনজনের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে সম্প্রতি দ্বিতীয় খুনের ঘটনা ঘটে গেল।

মারেসানির প্রবাসী বাংলাদেশিরা বলেন, ‘তারা ব্যবসা সংক্রান্ত বিরোধের জেরে স্থানীয় কৃষ্ণাঙ্গ সন্ত্রাসীদের ভাড়া করে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।’নিহত দুই বাংলাদেশি হলেন- আব্দুর রহমান (৩০) ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার আমজানখোর কাশিবাড়ীর এবং ইমন হোসেন (৩২) নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ উপজেলার কায়েত পাড়ার সাতিয়ান।

এ ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহতাবস্থায় স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন রুবেল হোসেন। ঘটনাটির পর থেকে বাংলাদেশিদের মধ্যে ভীতি ছড়িয়ে পড়েছে। দুই খুনের সঙ্গে সন্দেহভাজন অভিযুক্তদের বিষয়ে অনেকে সরাসরি তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করলেও এখন স্থানীয়রা মুখ খুলছেন।

দ্বিতীয় খুনের ঘটনায় বাংলাদেশিদের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ করা না হলেও স্থানীয় পুলিশ এ ঘটনায় একটি মামলা দায়ের করেছে। সূত্র ধরে একজন বাংলাদেশিকে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করে ছেড়ে দিয়েছে। অন্যদিক প্রধান অভিযুক্তরা গাঁ ঢাকা দিয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন বাংলাদেশি জানান, ঘটনার দিন (১৭ নভেম্বর) রাত ৯টায় হাসানের দোকানের সামনে কয়েকজন সশস্ত্র কৃষ্ণাঙ্গ অবস্থান নিয়ে ফাঁকা গুলি করে। এতে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়।

তখন হাসান দোকানের ভেতর থেকে তার ব্যবসায়িক অংশীদার রুবেল, রহমান ও ইমনকে ফোন করে ডাকাতির কবলে পড়ার কথা জানান এবং তাকে সহযোগিতার জন্য দ্রুত সেখানে আসতে বলেন।

কল পেয়ে রুবেল, রহমান ও ইমন গাড়ি নিয়ে পাঁচ মিনিটের মধ্যে দোকানের সামনে আসেন। তারা গাড়ি থেকে নামতেই তিনজনকে লক্ষ্য ১৫ রাউন্ড গুলি করে কৃষ্ণাঙ্গ যুবকরা। এতে ঘটনাস্থলেই ইমন ও রহমান মারা যান। আহত রুবেলকে হাসপাতালে নিয়ে যান স্থানীয়রা।

তবে হাসানের বিরুদ্ধে ব্যবসায়ী পার্টনারকে ভাড়াটে দিয়ে খুনের ঘটনা সাজিয়ে দোকান এককভাবে দখল নেয়া। দোকানে কৃষাঙ্গ যুবকদের দিয়ে ডাকাতি করানোর অভিযোগে স্থানীয়রা তাকে পিটিয়ে পুলিশ দেওয়া পরবর্তী মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে জেল থেকে ছাড়া পাওয়াসহ বেশ কয়েকটি অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।

জানা গেছে, যেখানে দুই বাংলাদেশি নাগরিক খুন হয়েছেন, সেখানে হাসান গোপনে সোলায়মানের সঙ্গে হাত মিলিয়ে নতুন করে দোকান দেয়ার চেষ্টা করে আসছিলেন। সম্প্রতি এ নিয়ে হাসানের ব্যবসায়িক পার্টনার রুবেলের সঙ্গে সোলায়মানের হাতাহাতিও হয়।

কয়েকজন প্রবাসীর অভিযোগ, মূলত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নিজেদের দখলে নিতে দোকানে পাসে দোকান দেওয়ায় ওই দ্বন্দ্বের নাটক সাজিয়ে সোলায়মান হাসানের গোপন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে জাকিরকে সঙ্গে নিয়ে ইমন, রহিম ও রুবেলকে খুন করতে পেশাদার খুনি ভাড়া করে গুলি করে মেরে ডাকাতির কথা প্রচার করে।

সোলায়মান এবং তার দুই সহযোগীকে আইনের আওতায় নিয়ে এলে অনেক কিছুই স্পষ্ট হবে বলে ধারণা প্রবাসীদের। জানা গেছে, নর্থ ওয়েস্ট প্রদেশের মাফিকিং শহর থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে মারেসানি এলাকায় শক্তিশালী মাফিয়া চক্র গড়ে তুলে বাংলাদেশিদের মধ্যে ত্রাস সৃষ্টি করে আসছিল সোলেমান, জাকির, হাসান চক্র। তারা নিরীহ প্রবাসীদের জিম্মি করে রাখে। যাদের কাছে বাংলাদেশ দূতাবাসও ব্যর্থ হয়েছে।

এসব বিষয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রবাসীদের সংগঠন বাংলাদেশ পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মুমিনুল হক বলেন, বাংলাদেশি কর্তৃক বাংলাদেশিদের খুনাখুনি বন্ধ করা যাচ্ছে না।

দূতাবাস সবাইকে নিয়ে কাজ করলে এ ধরনের ঘটনা বড় কিছু ঘটে যাওয়ার আগে সমাধান করা সম্ভব হবে। আর দূতাবাসের ক্ষমতা ব্যবহার করতে হবে। দেশটিতে বাংলাদেশিদের মধ্যে একটি অংশ লাগামহীন হয়ে গেছে।

এমআরএম

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]