সোনার বাংলায় সন্তানই মা-বাবার পেনশন

রহমান মৃধা
রহমান মৃধা রহমান মৃধা
প্রকাশিত: ১২:৪০ এএম, ০৫ আগস্ট ২০২১

আমরা বলছি শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। শিক্ষার ওপর লেখালেখি, গবেষণা হয়েছে অনেক। কিন্তু স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেই কি সঠিক শিক্ষা অর্জন করা সম্ভব? পাঠ্যপুস্তকের শিক্ষা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে একটি কর্মজীবনের পথনির্দেশনার গাইডলাইনমাত্র।

আমাদের দৈনন্দিন জীবনের শিক্ষা বা স্বশিক্ষা বলে যে একটি কথা রয়েছে, তার সঙ্গে যখন পুঁথিগত শিক্ষার সমন্বয় ঘটে ও সেই শিক্ষা মানবকল্যাণের উপযোগী হয় এবং ‘ক্রিয়েট সাম ভ্যালু ফর ম্যানকাইন্ড’, তখনই সেই শিক্ষাকে আমরা বলতে পারি সুশিক্ষা। তাই আমি দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে চাই, শুধু শিক্ষা নয়, সুশিক্ষাই হোক জাতির মেরুদণ্ড। এখন প্রশ্ন, আমরা কি সেই সুশিক্ষা অর্জন করতে পারছি? আছে কি আমাদের মধ্যে এমন কোনো উদাহরণ, যা তুলে ধরার মতো? অবশ্যই আছে।

আজ তুলে ধরব তিনজন ভিন্ন মানুষের জীবনকাহিনি। তারা কেউ কাউকে চেনেন না। তারা জীবন যাপন করছেন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। তাদের তিন জনকেই আমি মোটামুটি চিনি। তাদের ছদ্মনাম পিটার, চিটার ও বেটার। জন্মসূত্রে তিনজনই বাংলাদেশি। পিটার বাস করছেন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সানসেট বুলেভার্ডে।

ব্যক্তিজীবনে তিনি একা, শুধু একা। তার ভাষায় তিনি বলেন, ‘অলওয়েজ অ্যালোন, নেভার অ্যালোন।’ মানে কাজে বা সমাজের সব কর্মে তিনি একা নন। কারণ, তার চারপাশজুড়ে রয়েছে অনেক লোক, তবে বাড়িতে তিনি একা। মনে তার শান্তি নেই। অথচ তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম ধনী। তার বর্ণনায় তিনি সুখী নন, তবে তিনি সুখী হতে চান।

চিটার লন্ডনের অন্যতম এক ধনী। পরিবারে স্ত্রীসহ দুই ছেলে। দুজনই বাড়ি ছেড়ে নিজেদের মতো জীবন যাপন করছে। চিটারের স্ত্রী পেশায় চিকিৎসক। চিটার নিজেও লন্ডনের অর্থোপেডিক এবং এখানকার এক বড় হাসপাতালে কাজ করেন। ১৫ বছর ধরে তাকে আমি চিনি।

হঠাৎ জানালেন, তিনি জীবনে সুখী নন। তাই কিছুদিন আগে নতুন করে অন্য এক সঙ্গিনীকে নিয়ে জীবন যাপন শুরু করেছেন। আজ জানালেন, সঙ্গিনীর অন্যের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে, যা তিনি জানতে পেরেছেন। এখন তিনি নতুন করে সুখের সন্ধানে।

বেটার বাস করছেন বাংলাদেশে। বেটার পরিবারে মা–বাবা, ভাইবোন, তাদের সন্তানাদি, নিজের ছেলে-মেয়েসহ ১০-১২ জন নিয়ে বসবাস করছেন। সংসারে বাচ্চারা পড়াশোনা করে, বাকি সবাই কোনো না কোনো কাজে ব্যস্ত। মা–বাবা বৃদ্ধ। তারপরও পরিবারের সবাই সুখের সঙ্গে একত্রে বসবাস করছেন ভালোবাসার মধ্য দিয়ে।

এটিই বাংলাদেশের একটি সাধারণ পরিবারের চিত্র। বিশ্বের সর্বত্রই কমবেশি যারা চাকরি করেন, তারা চাকরিজীবন শেষে পেনশন পান, কিন্তু যারা বাংলাদেশে সারা জীবন কৃষিকাজ করেন, তাদেরও তো একটি সময় আসবে জীবনে, যখন তারা বৃদ্ধ হবেন। তাদের কোনো ভাতা বা পেনশনের ব্যবস্থা নেই। তাদের একমাত্র আশা-ভরসা, ছেলেমেয়ে বড় হয়ে যদি ভালো কিছু করতে পারে, তবে তারা দেখাশোনা করবে।

তারা না পান কোনো বয়স্ক ভাতা, না পান পেনশন। তখন তাদের একমাত্র ভরসা সন্তানেরা। সোনার বাংলায় সুসন্তানই সাধারণত মা–বাবার পেনশন। তাই কৃষক মা–বাবা ফসল উৎপাদনের সঙ্গে সঙ্গে উৎপাদন করে চলেছেন যুগে যুগে দৈনন্দিন শিক্ষার সমন্বয়ে সুশিক্ষিত সুসন্তান, যিনি বা যাঁরা হয়ে থাকেন পিতামাতার উপযুক্ত পেনশন–ব্যবস্থা, জীবনের শেষ সময়ে।

আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সন্তানেরা মা–বাবার সঠিক বা আদৌ খোঁজখবর রাখেন না, যা হতে পারে মানবতার অবক্ষয় বা দরিদ্রতার কারণে। সোনার বাংলার আসল পরিচয় কৃষিক্ষেত্র। এখন এই কৃষকদের শেষ জীবন যদি বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এমনটি হয় যে তারা অন্যের ওপর নির্ভরশীল, তাহলে কি মনে হয় যে নতুন প্রজন্ম ধরে রাখবে এই কৃষিকাজ? সময় এসেছে বিষয়টি নিয়ে ভেবে দেখার।

বেটার একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে তার স্ত্রী, সন্তান, মা–বাবা, ভাইবোন ও তাদের পরিবার নিয়ে দিব্যি ম্যানেজ করে চলছেন একটি সচ্ছল ও সুখী পরিবার। অবশ্যই বেটারকে আমরা বলব, তিনি সুশিক্ষায় শিক্ষিত। স্বার্থপরতার এই যুগে বেটারের মতো এমন বড় মনের মানুষ খুঁজে পাওয়া খুব একটা সহজ কাজ নয়।

এলাকার মানুষ শিক্ষিত হোক, তাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ুক সভ্যতার সবটুকু আলো, এটা তার বহুদিনের স্বপ্ন। বসে বসে অন্ন ধ্বংস না করে বরং নিজের রোজগারে নিজের পরিবার নিয়ে সুন্দর ও সাধারণ জীবনযাপন, পেশাগত শিক্ষা এবং কর্মের সমন্বয়ে দৈনিক শিক্ষার ওপর বেস্ট প্র্যাকটিস করে চলেছেন।

যিনি তার পেশাগত কাজের আগের ও পরের সময়টুকু ব্যবহার করে চলছেন শিক্ষাকে আরও তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দিতে। বর্তমান সময়ে যেখানে দেশে কোচিং নামে রমরমা বাণিজ্য চলছে, সেখানে এমন স্বার্থত্যাগী মানুষ পাওয়া একটু কঠিনই বটে!

যেসব ছেলেমেয়ে একটা সময় পড়াশোনার প্রতি ছিল পুরোপুরি উদাসীন, আজ তারা কোন মন্ত্রবলে শিক্ষার প্রতি এমন আগ্রহী হয়ে উঠল! বেটার শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিক্ষার চেতনা জ্বেলে দিয়েছেন। আঁধারের মধ্যে তিনি আলোর মশাল হাতে করে এসেছেন, ফলে অজ্ঞতার যে আঁধার, তা কেটে যেতে শুরু করেছে। হয়তো এই মশাল একদিন পুরো দেশকে আলোকিত করে তুলবে।

বেটার বাঙালির ঐতিহ্য ধরে রাখতে পলো দিয়ে মাছ ধরার আয়োজনের শুরু করে মাদক সেবন থেকে নতুন প্রজন্মকে দূরে রাখার জন্য প্রশিক্ষণ প্রদানে সাহায্য করছেন। সারা দিন পরিশ্রমের পরও একজন মানুষ যখন সমাজের আর দশজনের কথা চিন্তা করেন, এলাকার শিক্ষার উন্নয়ন নিয়ে ভাবেন, তখন তাকে একজন মহান মানুষ হিসেবে অভিহিত করলে হয়তো খুব বেশি বলা হবে না।

যারা সত্যিকারের ভালো মানুষ, তারা হয়তো এমনই হন! দেশের প্রতিটি গ্রামে যদি বেটারের মতো হাজারো মানুষের দৈনিক শিক্ষার প্রতিফলন হয়, তাহলে অজ্ঞতার অভিশাপ থেকে জাতিকে মুক্ত করা, ধর্ম, গণতন্ত্র, সমৃদ্ধি, বিশ্বাস প্রতিষ্ঠিত করা এবং একই সঙ্গে ভণ্ডামি ও অনৈতিকতা থেকে বেরিয়ে এসে দেশ ও জাতির খেদমত করা সম্ভব।

আমাদের প্রতিদিনের সেই কমিটমেন্ট, যা আমাদের জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’, বেটার কি তাহলে তার এই প্রতিশ্রুতির ওপর দৈনিক শিক্ষার বেস্ট প্র্যাকটিস করে চলেছেন?

অন্যদিকে পিটার ও চিটারও সমাজের দায়িত্ববান। তারা সমাজের জন্য যা করার করছেন। তাদের মা–বাবা বড়লোক। তাদের কোনো পিছুটান নেই। তাদের জীবনের শেষে রিটায়ারমেন্টের ব্যবস্থা রয়েছে, কিন্তু এরপরও তাদের যেন অনেক কিছুই নেই। একটি সুন্দর ও সৃজনশীল জীবন পাওয়ার জন্যই এত কষ্ট, এত ত্যাগ স্বীকার। কারণ, সবাই সুখী হতে চায়। কিন্তু এরপরও কেউ সুখী হয়, কেউ হয় না।

অনেকে জীবনের বন্ধনে, সুখের সন্ধানে ছুটে চলেছেন দেশ–বিদেশে এবং পাগলের মতো খাটছেন দিনরাত শুধু একটি সুন্দর, মধুময় জীবন পাওয়ার আশায়। জীবনের হাজারো সমস্যা মানুষকে বাধ্য করেছে মনের দুয়ার বন্ধ রাখতে। যার ফলে সমাজের লাখ লাখ চোখ থাকতেও তা আজ অন্ধ হয়ে আছে।

দেশে শিক্ষিত মানুষের অভাব নেই, অভাব সুশিক্ষিত মানুষের! যা–ই হোক না কেন, সমাজের প্রয়োজনে যারা পুঁথিগত বিদ্যার মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ না রেখে দৈনন্দিন শিক্ষা ও স্বশিক্ষার বেস্ট প্র্যাকটিসের সমন্বয় ঘটিয়ে সুশিক্ষার জন্য কাজ করছেন, অরাজকতা, কুশিক্ষা ও দুর্নীতি ধ্বংস করতে চেষ্টা করছেন, তাদের জয় হোক। জয় হোক মানবতার, জয় হোক সুশিক্ষার।

মানবতা, দায়িত্বশীলতা, পরিশ্রম ও দেশপ্রেম—এই শিক্ষাগুলো শুধু পুঁথিগত বিদ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, তা বাস্তবে রূপান্তরিত করাই হচ্ছে সুশিক্ষা। ভালো কাজের সমন্বয়ে দৈনন্দিন শিক্ষা ও স্বশিক্ষাই প্রকৃত সুশিক্ষা এবং তা শুরু হওয়া দরকার জন্মের শুরুতেই, সুনার দ্য বেটার।

লেখক: রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক (প্রোডাকশন অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট), ফাইজার, সুইডেন

এমআরএম

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]