তাকবিরে তাশরিক পড়ার বিধান আসলো যেভাবে

ধর্ম ডেস্ক
ধর্ম ডেস্ক ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৩:০০ পিএম, ১০ আগস্ট ২০১৯

তাকবিরে তাশরিক ও ঈদ-উল-আজহা এক সুতোয় গাঁথা। তাকবিরে তাশরিকের ইতিহাস কুরবানির ঈদের সঙ্গে বিশেষভাবে জড়িত। মহান আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা ও প্রশংসায় ভরপুর তাকবিরে তাশরিক। কুরবানি বা আত্মত্যাগ হলো মহান আল্লাহর একন্ত আপন হওয়ার অন্যতম মাধ্যম। আল্লাহর একান্ত প্রিয় হওয়ার ইবাদত পালনকালীন সময়েই তাকবিরে তাশরিকের প্রচলন শুরু হয়।

তাকবিরে তাশরিক প্রত্যেত হিজরি সালের জিলহজ মাসের ৯ তারিখ ফজরের নামাজ থেকে শুরু করে ১৩ জিলহজ আসর নামাজ পর্যনর্ত মোট ২৩ ওয়াক্ত পড়া ওয়াজিব। আর এ সময়ের মধ্যেই অনুষ্ঠিত হয় আত্মত্যাগের অন্যতম ইবাদত কুরবানি।

তাকবিরে তাশরিকের ৫ দিনের মধ্যে ৩ দিন কুরবানি করা যায়। তাকবিরে তাশরিকের আবশ্যকভাবে পড়া শুরু হওয়ার পেছনে রয়েছে আল্লাহর দুই প্রিয় পয়গাম্বরের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দিক জড়িত। তাকবিরে তাশরিক যেভাবে শুরু হলো তা জানতে হলে হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম ও হজরত ইসমাইল আলাইহিস সালামের জীবনের সেই গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি বিজড়িত ঘটনা উল্লেখ করা প্রয়োজন। আর তাহলো-

কুরবানির বিধান জারি করে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন-
‘অতঃপর সে (ইসমাইল) যখন পিতার সঙ্গে চলাফেরা করার বয়সে উপনীত হল, তখন ইবরাহিম তাকে বলল, হে ছেলে! আমি স্বপ্নে দেখি যে, তোমাকে জবাই করছি; এখন তোমার অভিমত কি? সে বলল, হে পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, তাই করুন। আল্লাহর ইচ্ছায় আপনি আমাকে ধৈর্যধারণকারীর দলভূক্ত পাবেন।’ (সুরা সাফফাত : আয়াত ১০২)

হজরত ইবরাহিম আলাইহি সালাম স্বপ্নে প্রাণপ্রিয় সন্তান হজরত ইসমাইলকে আল্লাহর জন্য কুরবানি করার নির্দেশ পান। আল্লাহর পয়গাম্বর পুত্রকে তার স্বপ্নে বর্ণনা দিলে সন্তান একবাক্যে স্বপ্নে কার্যাদেশ বাস্তবায়নের অভিমত প্রকাশ করেন এবং নিজেকে ধৈর্যধারণকারীদের অন্তর্ভূক্ত পাওয়া যাবে বলেও আশ্বাস দেন।

হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম যখন হজরত ইসমাইল আলাইহিস সালামকে কুরবানি করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তখনই সূচনা হয় এ তাকবিরে তাশরিকের। যা কেয়ামত পর্যন্ত ইসলামে এ তাকবির প্রত্যেক বছর ৫ দিন পড়া ওয়াজিব সাব্যস্ত হয়।

তাকবিরে তাশরিকের সূচনা
হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম যখন শিশুপুত্র ইসমাইলকে কুরবানির নির্দেশ পালনে জরার করার জন্য মাটিতে শোয়ালেন, তখন আল্লাহ তাআলা হজরত জিবরিল আলাইহিস সালামকে বেহেশত থেকে দুম্বা নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন।

হজরত ইসমাইলকে জবাই করার আগে হজরত জিবরিল আলাইহিস সালাম যাতে দুম্বা নিয়ে হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামের ছুরির নিচে দুম্বা পৌঁছাতে পারেন এবং তাকবিরের আওয়াজ যেন হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামের কানে আসে, সে জন্য আকাশে থাকতেই আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করতে থাকেন-
اَللهُ اَكْبَر – اَللهُ اَكْبَر (আল্লাহু আকবার; আল্লাহু আকবার। অর্থ : আল্লাহ মহান, আল্লাহ মহান)

অতঃপর হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম এ তাকবিরের আওয়াজ শুনে কাপড় দ্বারা আবৃত চোখ খুলে দেখলেন হজরত জিবরিল আলাইহি সালাম আনিত দুম্বা হজরত ইসমাইল আলাইহিস সালামের পরিবর্তে কুরবানি হয়ে যায়। তখন তিনি তাওহিদের কালেমা ও তার শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করে বলেন-
لَا اِلَهَ اِلَّا اللهُ اَللهُ اَكْبَر (লা- ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবার। অর্থ : আপনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই; আপনিই শ্রেষ্ঠ)

হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামকে তাওহিদের কালেমা ও আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করতে দেখে হজরত ইসমাইল আলাইহিস সালাম আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ও প্রশংসা করে বলেন-
اَللهُ اَكْبَر وَ لِلهِ الْحَمْد (আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ। অর্থ : আল্লাহ মহান, সব প্রশংসা শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য)

হজরত জিবরিল আলাইহিস সালাম, হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম ও হজরত ইসমাইল আলাইহিস সালামের তাকবির, তাওহিদের কালেমার প্রশংসা আল্লাহর কাছে এতই পছন্দনীয় হয়ে যায় যে, হজ পালনকারী, কুরবানি দাতাসহ মুসলিম উম্মাহর জন্য জিলহজ মাসের ৯-১৩ পর্যন্ত এ ৫ দিন তাকবিরে তাশরিক পড়া আবশ্যক হয়ে যায়।

সুতরাং এ তাকবিরে তাশরিক আল্লাহর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার অন্যতম টনিকও বটে। এ তাকবিরে তাশরিকের ভাব-মর্মার্থ ও শিক্ষা নিজেদের মধ্যে লালন করতে পারলেই কুরবানি তথা আত্মত্যাগ সফল হবে।

তাই মুসলিম উম্মাহর সব প্রাপ্ত বয়স্ক নারী-পুরুষ, মুকিম-মুসাফির, গ্রামবাসী-শহরবাসী এবং জামায়াতে কিংবা একাকি নামাজ আদায়কারী ব্যক্তির উচিত প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর একবার করে তাকবিরে তাশরিক পাঠ করা। আত্মত্যাগের শিক্ষা ও তাৎপর্য গ্রহণ করা।

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে তাকবিরে তাশরিকের ইতিহাস জানার পর উল্লেখিত দিনগুলোতে শুকরিয়া হিসেবে এ ওয়াজিব কাজ যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে আদায় করে তার একান্ত নৈকট্য অর্জনের তাওফিক দান করুন। আমিন।

এমএমএস/এমএস

আপনার মতামত লিখুন :