শিশুশ্রম প্রতিরোধে ইসলামের নির্দেশনা কী?

ধর্ম ডেস্ক
ধর্ম ডেস্ক ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ০২:৪৪ পিএম, ১২ জুন ২০২১ | আপডেট: ০২:৫০ পিএম, ১২ জুন ২০২১

ইসলাম সব সময় শ্রমজীবী জীবন কামনা করে। যারা সবল ও উপার্জনে সক্ষম, তাদের জন্য কারো কাছে হাত পাতা বা ভিক্ষাবৃত্তি বৈধ নয়। ইসলাম কাজে সক্ষম ব্যক্তিকে শ্রমের দিকে আহ্বান করলেও কোনোভাবেই শিশুশ্রমকে সমর্থন করে না। শিশুদের ক্ষেত্রে ইসলামের দিকনির্দেশনা থেকেই তা প্রমাণিত। তাহলে প্রচলিত শিশুশুম প্রতিরোধ কিংবা নিষিদ্ধে ইসলামের দিকনির্দেশনা কী?

আজ বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস। রাষ্ট্রীয়ভাবে বিশ্বের সবদেশেই শিশুশ্রম নিষিদ্ধ। তারপরও বিশ্বব্যাপী নিয়ম-অনিয়মের ফাঁক-ফোকরে কিংবা ছদ্ম নামের শিরোনামে চলে শিশুশ্রম। শোনা যায় শিশু শ্রমিকের নির্যাতনের করুণ আর্তনাদ। গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও প্রকাশ পায় এসব নির্যাতনের চিত্র।

বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও এ দিবসটি যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে পালন করার পাশাপাশি শিশুশ্রম প্রতিরোধে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। শিশুশ্রমমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে সরকার এবছর ‘মুজিববর্ষের আহ্বান, শিশুশ্রমের অবসান’ প্রতিপাদ্য ঘোষণা করেছে।

শহর-নগর, পথ-প্রান্তরে, খবরের কাজগ কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোমলমতি শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে দেখা যায়। আবার জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে অসংখ্য শিশু কিংবা পথশিশু নিয়ম-অনিয়মের বেড়াজালে আবদ্ধ। শিশুদের এসব ঝুঁকিপূর্ণ কাজের ফলে তারা হারাচ্ছে শারীরিক সক্ষমতা ও মানসিকভাবেও হচ্ছে ক্ষতিগ্রস্ত।

ইসলামে শিশুশ্রম নিষিদ্ধ। শিশুরা শারীরিক ও মানসিকভাবে শ্রমের জন্য উপযুক্ত নয়। শিশুশ্রমের ফলে তাদের মননশীলতা ও দৈহিক ক্ষতি হয়। আজ যারা শিশু, ভবিষ্যতে তারাই যুবক। আর তারাই হবে সুশোভিত, সুন্দর ও গৌরবময় আগামীর পথনির্দেশক। মহান আল্লাহ তাআলা বলেন-
الْمَالُ وَالْبَنُونَ زِينَةُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا
‘ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি পার্থিব জীবনের শোভা।’ (সুরা কাহফ : আয়াত ৪৬)

বর্তমান সময়ে সামাজিক শোষণের দীর্ঘস্থায়ী এক হাতিয়ারের নাম ‘শিশুশ্রম’। একশ্রেণির অসাধু ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত করে বেশি মুনাফা ও সুবিধা পাওয়া ব্যস্ত। আবার শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজসহ অসামাজিক কাজে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে পাচার করার ঘৃণ্যকাজেও একটি মহল সক্রিয়। অথচ শিশুরাই হচ্ছে সুন্দর সমাজ বিনির্মাণের ভবিষ্যৎ কর্ণধার।

ইসলাম কখনোই শিশুশ্রমকে সমর্থন করে না। কেননা আল্লাহ তাআলা শ্রমিকের শক্তি-সামথ্য এবং গুণ-বৈশিষ্ট্য ঘোষণা করেই তা সুস্পষ্ট করে দিয়েছেন। শ্রমিক হিসেবে সেসব শক্তি-সামথ্য ও বৈশিষ্ট্য শিশুদের মাঝে নেই। আল্লাহ তাআলা বলেন-
إِنَّ خَيْرَ مَنِ اسْتَأْجَرْتَ الْقَوِيُّ الْأَمِينُ
‘নিশ্চয়ই তোমার মজুর (শ্রমিক) হিসেবে উত্তম হবে সেই ব্যক্তি, যে শক্তিশালী ও বিশ্বস্ত।’ (সুরা আল-কাসাস : আয়াত ২৬)

ইসলামের দিকনির্দেশনা
বাবা-মা কোনো অপ্রাপ্ত বয়স্ক শিশুদের উপার্জনের জন্য বাধ্য করতে পারবেন না। বাবা উপার্জন করতে পারলে করবেন, উপার্জনে অক্ষম হলে ঋণ করে তাদের (শিশুদের) খরচের ব্যবস্থা করবেন; যেন তারা শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হতে না হয়। এমনকি প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরও শিক্ষাগ্রহণকালীন সময়েও বাবা/পরিবার তাদের খরচ চালিয়ে যাবেন।’ (ফাতওয়ায়ে আলমগিরি, রদ্দুল মুহতার)

দুনিয়ার প্রতিটি শিশুই মহান আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে এক বিরাট নেয়ামত। মা-বাবার কাছে এ শিশুরা মহান আল্লাহর পবিত্র আমানত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও শিশুদের সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন। তাই অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, সুশিক্ষা, চিকিৎসা, সুন্দর বিনোদন, কোমল ব্যবহারে বড় করার দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। হাদিসের একাধিক বর্ণনায় তা ওঠে এসেছে-
১. ‘শিশুরা হলো জান্নাতের প্রজাপতি।’ (মিশকাত)

২. ‘তোমরা তোমাদের সন্তানদের মহৎ করে গড়ে তোলো এবং তাদের উত্তম আদব তথা শিষ্টাচার শিক্ষা দাও।’ (মুসলিম)
৩. ‘সন্তানকে আদব তথা শিষ্টাচার শিক্ষা দেওয়া সম্পদ দান করার চেয়েও উত্তম।’ (বায়হাকি)
৪. ‘তোমরা নিজেদের সন্তানদের স্নেহ কর এবং তাদের আদর্শ শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তোল।’
৫. তিনি আরও বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি শিশুদের স্নেহ করে না, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (আবু দাউদ)

হাদিসের এসব দিকনির্দেশনা এটি সুস্পষ্ট যে, শিশুশ্রম কোনোভাবেই বৈধ নয়। তাছাড়া বিশেষ যে কারণে শিশুশ্রমকে ইসলাম নিরুৎসাহিত করে তাহলো- মালিকের অনুপস্থিতিতে শ্রমিকই মালিকের সম্পদের জিম্মাদার। যা রক্ষা করা কোনো শিশু শ্রমিকের দ্বারা সম্ভব নয়। হাদিসে এসেছে-
১. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘কোনো লোকের অধীনস্থ শ্রমিক নিজ মালিকের সম্পদের রক্ষক। আর (এ সম্পদ) সম্পর্কেও সে জিজ্ঞাসিত হবে।’ (বুখারি)
২. তিনি আরও বলেছেন, ‘যে চাকরিজীবী (শ্রমিক) উত্তমরূপে তার রবের ইবাদত করে এবং তার মালিকের পক্ষ থেকে অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে আদায় করে, সে প্রত্যেক কাজে দ্বিগুণ সাওয়াব পাবে।’ (বুখারি)

এ হাদিস দুইটির আলোকে যেমন কোনো শিশুই শ্রমিক হিসেবে উপযুক্ত বলে বিবেচিত হবে না। তেমিন কুরআনুল কারিমে ঘোষণা অনুযায়ী শিশুরা শ্রমিক হিসেবে উপযুক্ত নয়। কেননা শ্রমিক হওয়ার জন্য সম্পদ রক্ষার জিম্মাদার হতে হবে। তাহলে শিশুরা কিভাবে তাদের সাধ্যের বাইরে কষ্টাতীত কাজের জিম্মাদার হবেন? আল্লাহ তাআলা বলেন-
لاَ يُكَلِّفُ اللّهُ نَفْسًا إِلاَّ وُسْعَهَا تُحَمِّلْنَا مَا لاَ طَاقَةَ لَنَا بِهِ وَاعْفُ عَنَّا وَاغْفِرْ لَنَا وَارْحَمْنَا أَنتَ مَوْلاَنَا فَانصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ
‘আল্লাহ কারও ওপর এমন কোনো কষ্টদায়ক দায়িত্ব দেন না, যা তার সাধ্যাতীত।’ (সুরা বাকারা : আয়াত ২৮৬)

অথচ আধুনিক যুগে...
শিশুরা কতই না অবহেলিত! পরিসংখ্যান অনুযায়ী পৃথিবীর প্রায় ১৫২ মিলিয়ন শিশু ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে নিযুক্ত। সরকারি হিসাব মতে, বাংলাদেশের এমন ৩৮টি সেক্টর চিহ্নিত; যেখানে প্রায় ১৭ লাখেরও বেশি শিশু ঝুঁকিপূর্ণশ্রমে নিযুক্ত।

সুতরাং সমাজজীবনে বাস্তবতার নিরিখে শিশুশ্রম পুরোপুরি বন্ধ করা না গেলেও প্রয়োজনে কম ঝুঁকিপূর্ণ ও নিরাপদ পেশায় তাদের নিয়োগ করা যেতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে থাকতে হবে পাড়াশোনার সুযোগ-সুবিধা। কেননা দারিদ্র্যের কারণে কাজ করতে যাওয়া এসব শিশুদের জানাতে এবং বোঝাতে হবে যে, তাদের দারিদ্র্য দূর করার মোক্ষম হাতিয়ার হলো ‘শিক্ষা’।

শিশুর প্রতি করণীয়
সুতরাং ইসলামের সাধারণ নির্দেশনা হলো, বাবা-মা ও দায়িত্বশীল অভিভাবকরা কোমলমিতি শিশুর প্রতি স্নেহশীল আচরণ করবে। তাদের জন্য কষ্টকর কিছু চাপিয়ে দেবে না। শিশুশ্রম নয় বরং শিশুর প্রতি স্নেহ-মমতা ও ভালোবাসাই ইসলামের মৌলিক শিক্ষা। যেমনটি বলেছেন বিশ্বনবি-
‘যে ছোটকে স্নেহ করে না সে আমার অন্তর্ভুক্ত নয়।’ আর সে কারণেই- ‘শিশুর সঙ্গে স্নেহশীল আচরণ না করায় তিনি (প্রিয় নবি) এক পিতাকে ভর্ৎসনা করেছেন।’

তাছাড়া শিশুদের সুন্দর ও আনন্দঘন জীবন উপহার দেওয়ার দায়িত্ব শুধু পরিবারেরই নয়, শিশুর অধিকার ও নিরাপত্তা দেওয়ার প্রধান দায়িত্ব সরকারের। পাশাপাশি সমাজের বিত্তবানরাও শিশুদের শিশুশ্রমের দায়িত্বহীনতার দায় এড়াতে পারবে না। এ শিক্ষা রয়েছে বিশ্বনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনে।
তিনি সমাজের অসহায় ও নিরাশ্রয় শিশুদের শিক্ষা ও আবাসনের ব্যবস্থা করতেন। ইয়াতিম বালক আমর ইবনে আবি সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহুও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরিবারে সন্তানের মতো লালিত-পালিত হয়েছিলেন। শিশুদের জন্য তাঁর দিকনির্দেশনাও ছিল এমন-
> রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘তোমরা শিশুদের স্নেহ কর, তাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার কর এবং তাদেরকে সদাচরণ ও শিষ্টাচার শিক্ষা দাও।’ (তিরমিজি)
> রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেছেন, ‘তোমাদের সন্তানদের উত্তমরূপে জ্ঞান দান কর, কেননা তারা তোমাদের পরবর্তী যুগের জন্য সৃষ্ট।’ (মুসলিম)

কুরআন-সুন্নাহর দিকনির্দেশনায় এটি সুস্পষ্ট যে, প্রতিটি শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য ইসলামে শিশুশ্রম নিষিদ্ধ। শিশুশ্রমের ফলে শিশুদের মানসিকতা ও শারীরিক ক্ষতি হয়। তাই শিশুশ্রম বন্ধে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের একান্ত কর্তব্য। শিশুশ্রমের কারণগুলো চিহ্নিত ও উদঘাটন করে তা রোধ করা সবার ঈমানি দায়িত্ব। একান্তই শিশুশ্রম বন্ধ করতে না পারলে যতটা সম্ভব শিশুর কর্মস্থল ঝুঁকিমুক্ত ও নিরাপদ করা প্রয়োজন।

শিশুশ্রম মুক্ত দেশ গড়তে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সরকারি-বেসরকারি সংস্থা, গণমাধ্যম, সুশীল সমাজসহ সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা খুবই প্রয়োজন। তাই তাদের পড়াশোনা ও সুশিক্ষার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা যেমন জরুরি তেমনি শিশুদের অধিকার রক্ষায় কার্যকরী পদক্ষেপ ও তাদের সম্পর্কে মানুষের মাঝে নৈতিক মূল্যবোধ জাগ্রত করে কুরআন সুন্নাহর নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে পারলেই শিশুশ্রম থেকে মুক্তি পাবে কোমলমতি শিশুরা।

এমএমএস/এএসএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]