জিলকদ মাসের আমল-ফজিলত ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য

ধর্ম ডেস্ক
ধর্ম ডেস্ক ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৩:৩৭ পিএম, ১৫ জুন ২০২১

দুই ঈদের মধ্যবর্তী মাস জিলকদ। কুরআনের ঘোষিত ৪ হারাম মাসের একটি। আবার হজের ৩ মাসের মধ্যবর্তী মাসও এটি। অবস্থানগত কারণ ছাড়াও এ মাসটি ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

জিলকদ মাসকে আরবিতে ‘জুলকাআদাহ’ বলা হয়। ফারসি ও উর্দুতে এটিকে জিলকাআদা বলা হলেও বাংলায় এটি জিলকদ মাস হিসেবে ব্যাপক পরিচিত ও ব্যবহৃত। এর অর্থ হলো- বসা, স্থিত হওয়া কিংবা বিশ্রাম গ্রহণ করা। কারণ এ মাসের আগের ৪ মাস যেমন ইবাদত-বন্দেগির মাস তেমনি এর পরের মাসে মুসলিম উম্মাহর বিশেষ ইবাদত হজের মাস।

জিলকদ মাস আসার আগে মুমিন মুসলমান রজব মাস থেকে শুরু করে শাওয়াল মাস পর্যন্ত ইবাদত-বন্দেগিতে ব্যস্ত থাকে। আবার তার পরের মাসেই হজ পালনকারীরা যেমন হজ ও ওমরাহ করবে, তেমনি যারা রোজা পালন করবে তারা জিলহজ মাসের প্রথম ৯ দিন রোজা পালন করবে। তাই এ মাসটি মুমিন মুসলমানের জন্য একটু বিশ্রাম নেওয়ার মাস।

রজবকে বলা হয় আল্লাহর মাস। এ মাসে ইবাদতের ভূমি কর্ষণের মাস, বেশি বেশি নফল ইবাদতের মাস। শাবান হলো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাস। এ মাসে ইবাদতের বীজ বপন করা হয়। এ মাসেই রয়েছে মর্যাদার রাত নিসফ শাবান বা শবে বরাত। আর রমজান হলো উম্মতের মাস, ফসল তোলার মাস, ফরজ রোজা, তারাবির নামাজ, কিয়ামুল্লাইলের মাস। এ মাসটি কুরআন নাজিলের মাস এবং ইবাদত–তেলাওয়াতের মাস হিসেবে প্রসিদ্ধ। রমজান পরবর্তী শাওয়াল মাস হলো ঈদুল ফিতর, সদকাতুল ফিতর ও নির্ধারিত সুন্নাতি আমল ৬ রোজার মাস। ঠিক এভাবেই আগের ৪ মাসের মতো জিলকদ মাসের পরের দুই মাসও (জিলহজ মাস ও মহররম মাস) ইবাদতে ব্যস্ততর মাস। সুতরাং এ জিলকদ মাসে মুমিন মুসলমান একু বিশ্রাম গ্রহণ করেন। যে কারণে এ মাসের নাম জুলকাআদাহ বা জিলকদ তথা বিশ্রামের মাস রাখা হয়েছে।

ইসলামের ইতিহাসে বিভিন্ন কারণে এ মাস অনেক গুরুত্বপূর্ণ। প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জীবনে যে কয়টি ওমরা করেছেন তার সব কটি করেছে এ জিলকদ মাসে। এ মাসেই সংঘঠিত হয়েছিল হুদায়বিয়ার সন্ধি ও বাইয়াতে রিদওয়ান।

তবে এ মাসে নির্দিষ্ট কোনো ফরজ ওয়াজিব ও সুন্নাত ইবাদত ও আমল নেই। মুসলিম উম্মাহ যেন ইবাদতের মাসগুলো অতিবাহিত করে সামনে হজ ও রোজার প্রস্তুতি নেওয়ার পথে কোনো যুদ্ধ-বিগ্রহ তথা বাদানুবাদ যেন বিশ্রামের ঘাটতি না হয়; সে কারণেই এ মাসে সব ধরনের আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণ নিষিদ্ধ করে হারাম মাস হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, আরবের লোকেরা তৎকালীন সময়ে জিলকদ মাসে বাণিজ্য থেকে ফিরে আসত, যুদ্ধ থেকে ফিরে আসত এবং বিশ্রাম গ্রহণ করতো। তাছাড়া ঋতুর পরিবর্তনে এই সময়টায় স্থানীয় আরবের লোকজনের হাতে তেমন কোনো কাজও থাকত না। আরব সংস্কৃতি অনুযায়ী তারা এই মাসে যুদ্ধবিগ্রহ থেকে বিরত থাকত এবং অন্যায়–অপরাধ (মদ পান) থেকেও বিরত থাকত। এসব কারণেও এই মাসকে জিলকদ বলা হয়। (লিসানুল আরব, ইবনে মানজুর)।

ইবাদতের জন্য প্রস্তুতি ও আমল
রজব-শাবান মাসে নফল রোজা, রমজানজুড়ে ফরজ রোজা, সন্ধ্যা ও ভোর রাতে তারাবিহ-তাহাজ্জুদ ও সাহরি গ্রহণ এবং শাওয়ালে ৬ রোজা রাখার পর জিলহজ মাসে বিশ্রাম নিয়ে পরবর্তী মাসের রোজা ও হজ-কুরবানির প্রস্তুতি গ্রহণের মাস এটি।

জিলকদ মাসের আমল
এ মাসজুড়ে বিশ্রামের পাশাপাশি এ মাসেও অন্যান্য আরবি মাসগুলোর মতো নিয়মিত আমলগুলো করা যেতে পারে। তাহলো-
১. এ মাসের ১, ১০, ২০, ২৯ ও ৩০ তারিখ রোজা পালন করা।
২. জিলকদ মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ (২৫-২৭ জুন) আইয়ামের বিজের রোজা পালন কা।
৩. সোম ও বৃহস্পতিবারের সাপ্তাহিক সুন্নাত রোজা পালন করা। (তাহলো- ১৭, ২১,২৪ ও ২৮ জুন এবং ০১, ০৫, ০৮, ১২, ১৫ ও ১৯ জুলাই)।
৪. কুরআন তেলাওয়াত করা ও সালাতুত তাসবিহ নামাজ আদায় করা।
৫. সম্ভব হলে ওমরাহ পালন করা।
৬. হজের পরিপূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করা।
৭. কুরবানির প্রস্তুতি গ্রহণ করা।

জিলকদ মাসের স্মরণীয় যত ঘটনা
১. জিলকদ মাসে যে কোনো যুদ্ধ-বিগ্রহকেই নিষিদ্ধ করেছে ইসলাম।
২. এ মাসেই বাইয়াতে রেদওয়ান অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
৩. ১ জিলকদ : হুদায়বিয়ার সন্ধি, হজরত আলি ও ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু আনহুমার বিবাহ সংঘটিত হয়।
৪. ৮ জিলকদ : মুসলমানদের জন্য জীবনে একবার হজ পালন ফরজ, ইমাম দারাকিুতনি রাহমাতুল্লাহি আলাইহির ইন্তেকাল।
৫. ১৭ জিলকদ : খন্দকের যুদ্ধ অনুষ্ঠিত হয়।
৬. ২৫ জিলকদ : হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম ও হজরত ঈসা আলাইহিস সালামের জন্ম। পবিত্র কাবা শরিফ পৃথিবীতে প্রথম ভিত্তি স্থাপিত হয় বলে জানা যায়। এ ছাড়া রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ২৫ জিলকদ বিদায় হজের জন্য মদিনায় থেকে মক্কা অভিমুখে রওয়ানা।
৭. ২৭ জিলকদ হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু আহত হন। এই ২৭ জিলকদ উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ দুই মুহাদ্দিস মুহাদ্দিস সৈয়দ আহমদ শহিদ ও ইসমাঈল শহিদ বালাকোটের যুদ্ধের ময়দানে শাহাদাতবরণ করেন। কেউ কেউ ২৪ জিলকদও বলে থাকেন।
৮. ৭ম হিজরির জিলকদ মাসে প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রথম ওমরা পালন করেছিলেন।
৯. এ মাসেই প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর জীবনের সব ওমরাহ পালন করেন।

এমএমএস/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]