আমাদের রমজান পর্যন্ত পৌঁছে দিন, হে আল্লাহ!

ইসলাম ডেস্ক
ইসলাম ডেস্ক ইসলাম ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৫:১৪ পিএম, ১০ জানুয়ারি ২০২৬
ছবি: ফ্রিপিক

মাহসীনা মমতাজ মারিয়া

কয়দিন ধরেই সবেমাত্র শেষ হওয়া বছরের রিভিউ আর নতুন নতুন শুরু হওয়া বছরের জন্য নানারকম রেজুলেশন আর প্রমিজের চিন্তায় ভেসে বেড়াচ্ছি আমরা সবাই। কেউ তার ২০২৫-এর সাফল্য নিয়ে লিখছেন তো কেউ আবার ২০২৬-এর নতুন প্ল্যানগুলো কিভাবে বাস্তবায়ন করবেন সেগুলোতে আমাদের মনোযোগ আকৃষ্ট করার চেষ্টা  করছেন। আবার আগেরবছর যার মন খারাপে আর হতাশায় কেটেছে তিনিও হয়তো ভাবছেন কিভাবে এ বছর আরও ভালো কিছু করার চেষ্টা করা যায় যাতে পুরোনো কষ্টগুলো থেকে বেরিয়ে আসা যায়।

এই ইংরেজি নতুন বছরের আগমনের এতসব ওয়াদা, এত নতুন প্রচেষ্টার উদ্দীপনা আর কোলাহলের মাঝেই নীরবে আরও গুরুত্বপূর্ণ সময়ে উপনীত হয়েছি আমরা; গত ২০ দিন আগে আকাশে আবার জন্ম নিয়েছে একটি নতুন চাঁদ। আর সেটি কোনো সাধারণ চাঁদ নয়—এটি রজব মাসের চাঁদ, আল্লাহ তাআলার কাছে সম্মানিত চার মাসের অন্যতম।

আল্লাহ তাআলা কোরআনে বলেছেন, নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে মাসের সংখ্যা বারোটি—আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকেই আল্লাহর বিধানে। এর মধ্যে চারটি সম্মানিত মাস। এটাই সঠিক দ্বীন। সুতরাং তোমরা এ মাসগুলোতে নিজেদের প্রতি জুলুম করো না। (সুরা তওবা: ৩৬)

রাসুলুল্লাহ (সা.) এই চারটি পবিত্র মাস সম্পর্কে বলেছেন, এক বছর বারো মাসের; এর মধ্যে চারটি সম্মানিত—তিনটি পরপর: জিলকদ, জিলহজ ও মহররম; আর একটি হলো রজব, যা আসে জমাদিউস সানি ও শাবানের মাঝে। (সহিহ বুখারি)

এই মাস শুরু হলে যে অসাধারন দোয়াটি নবীজি (সা.) পাঠ করতেন সেটি হলো:

اَللَّهُمَّ بَارِكْ لَنَا فِىْ رَجَبَ وَ شَعْبَانَ وَ بَلِّغْنَا رَمَضَانَ

উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফি রাজাবা ওয়া শাবানা ওয়া বাল্লিগনা রামাদান।

অর্থ: হে আল্লাহ, আমাদের জন্য রজব ও শাবান মাসে বরকত দান করুন এবং আমাদের রমজান পর্যন্ত পৌঁছে দিন। (আদ-দাওয়াতুল কাবীর লিলবায়হাকী)

এই দোয়াটি অত্যন্ত গভীর অর্থবহ। এই দোয়াটি থেকে বোঝা যায়, রমজানকে যথার্থভাবে গ্রহণ করতে হলে অন্তত দুই মাসের প্রস্তুতি প্রয়োজন। শারীরিক, মানসিক, পারিবারিক ও সামাজিকভাবে পূর্ণ প্রস্তুতির সাথে রমজানকে গ্রহন করার জন্য রজব ও শাবানকে পুরোপুরি কাজে লাগানোর শিক্ষা দেয় নবীজির (সা.) এ দোয়া।

তাই রজব ও এরপর শাবানও গুরুত্বপূর্ণ মাস। প্রশ্ন হলো—আমরা কীভাবে এই মাসদুটিকে অর্থবহ করে তুলব? কিভাবে রমজান আসার আগেই আমরা আমাদের মালিককে দেখাতে পারবো যে রমজানের জন্য কতটা আকুতি নিয়ে, কতটা কোমর বাঁধা প্রস্তুতি সহকারে অপেক্ষায় আছি?

এখানে আমি রমজানের প্রস্তুতির জন্য রজব ও শাবান মাসের কিছু বাস্তবধর্মী করণীয় তুলে ধরছি: 

১. রজব মাসে আমরা কয়েক দিন নফল রোজা রাখার অভ্যাস করতে পারি—হতে পারে সপ্তাহে একদিন, দুদিন কিংবা তারও বেশি। কিংবা আমার আগের কোনো কাজা রোজা থাকলে সেগুলোও রেখে ফেলতে পারি। এতে আমার শরীর, মন ও আত্মা রমজানের রোজার জন্য প্রস্তুত হবে।

২. কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন করে গড়ে তুলতে পারি এই মাস থেকে। রমজান কোরআন নাজিলের মাস, কোরআনের এই মাসকে উদযাপনের নিয়তে, রমজানের শেষে গিয়ে যাতে তিলাওয়াত কিংবা অর্থসহ তিলাওয়াতের মাধ্যমে সম্পুর্ন কুরআন শেষ করতে পারি সে নিয়তে এই রজব মাস থেকেই আমার কোরআন তিলাওয়াত শুরু করে দিতে পারি।। দীর্ঘদিন কোরআন না পড়ে থাকলে প্রতিদিন কয়েক পৃষ্ঠা দিয়ে শুরু করি, অল্প অল্প করে তিলাওয়াত বাড়িয়ে ধীরে ধীরে এক পারা তিলাওয়াতের অভ্যাস তৈরি করতে পারি। আর এই কোরআনের সাথে লেগে থাকার এই অভ্যাস যেন আল্লাহ আমার আজীবনের স্বভাবে পরিনত করেন, আমার যেনো দরদের সম্পর্ক করে দেন কোরআনের সাথে সেভাবে আমার রবের কাছে বেশি বেশি করে দোয়া করতে পারি!

৩. রমজানে আমার প্রাত্যহিক রুটিন কেমন বানাতে চাই আমি? কয় ঘন্টা ইবাদত করতে চাই? কতটুকু সময় ঘরের কাজ, বাহিরের কাজ কিংবা কতক্ষন ঘুমাতে চাই—সেই বিষয়গুলো নির্ধারণ করা যেতে পারে রজব মাসে এবং সে অনুযায়ী পরিকল্পনা শুরু করতে পারি আমরা। যেমন: আমি বা আমার পরিবারের কেউ যদি ইতেকাফ করতে চান, তাহলে আমাদের এখনই ছুটির বিষয়টি পরিকল্পনায় আনতে হবে; অথবা আমরা পারিবারিকভাবে যদি কিছু বড় সদকা করতে চাই তাহলে আমরা এখন থেকেই প্রতিমাসে কিছু কিছু করে হাতখরচের পয়সা বাঁচিয়ে সেটা জমিয়ে রাখতে পারি।

৪. জেনে, না জেনে যেসব গুনাহ করে ফেলেছি, যেসব ইবাদতগুলো থেকে দূরে সরে গেছি সেগুলোর ব্যাপারে একটু একটু করে নিজেকে সতর্ক করতে পারি, সত্যিকার তওবা করা শুরু করতে পারি যাতে রমজান আসার আগেই আমি দয়াবান আল্লাহর ক্ষমার যোগ্য হয়ে উঠতে পারি।

৫. রমজান আমাদের সংযম শেখায়, আত্মসংবরণ শেখায়। এই অভ্যাসকে নিজের স্থায়ী স্বভাব বানাতে চাইলে আমরা রজব থেকেই তার প্র্যাকটিস শুরু করতে পারি। আমাদের রান্না-বান্নায়, বাজার সদাইয়ে বাহুল্য বর্জন করা, অর্থ অপচয় কমানো, সময় অপচয়ের দিকে খেয়াল রেখে কিছু কিছু করে ইবাদতের জন্য সময় বাড়ানোর চর্চা আমরা অনায়াসে শুরু করতে পারি।

৬. নিজের পছন্দের কিছু কোরআনিক দোয়া, জিকির এক জায়গায় সংগ্রহ করে এই মাস থেকেই সেগুলো মুখস্থ করার উদ্যোগ নিতে পারি, পরিবারের সবাইকে নিয়ে এসব কোরআনের আয়াত ও দোয়া শেখার ও প্র্যাকটিস করার প্রতিযোগিতা করতে পারি। কোরআনের আয়াতে আর সার্বক্ষনিক দোয়ায় যে অন্তর আর যে ঘর ডুবে থাকে তাকে কি কোনভাবে দুর্বল করা যাবে?

এখন থেকে যতবার ২০২৬-এর জীবনযুদ্ধের জন্য নতুন করে প্রস্তুতি নেবো ততবারই রাব্বুল আলামিনের অনুগ্রহের জন্য নিজেকে তাঁর সামনে আত্মসমর্পন করার প্রস্তুতিও নেবো যার অনুগ্রহ ছাড়া আমার কোন জীবনেই সাফল্য সম্ভব নয়। জানুয়ারির কিংবা ফেব্রুয়ারির ডায়রির পাতাগুলোয় আমার যে টার্গেটগুলো অর্জন করা দরকার সেগুলোর সফলতা যে দরবারে কবুল হবে, তিনিই আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছেন—১৪৪৭ হিজরি এখনো শেষ হয়নি; বরং এর সবচেয়ে বরকতময় মাসগুলোর একটির পর আরেকটি আমাদের জন্য হাজির হচ্ছে।

লেখক: ভাইস প্রিন্সিপাল, এভারোজ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, ঢাকা

ওএফএফ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।