মহানবীর (সা.) নবুয়তপূর্ব জীবন
আহমাদ সাব্বির
মহানবী হজরত মুহাম্মাদের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জন্ম মানব ইতিহাসের এক অতুলনীয় অধ্যায়ের সূচনা। ৫৭১ খ্রিস্টাব্দের ২০ এপ্রিল, সোমবার, মতান্তরে রবিউল আউয়াল মাসের ৯ তারিখ আরবের পবিত্র ভূমি মক্কায় তার শুভাগমন ঘটে। তার জন্ম শুধু একটি শিশুর আগমন ছিল না; বরং তা ছিল মানবজাতির জন্য রহমত, হেদায়াত ও নৈতিক বিপ্লবের সূচনা। পিতামহ আবদুল মুত্তালিব তার নাম রাখেন ‘মুহাম্মাদ’, যার অর্থ ‘অত্যধিক প্রশংসিত’। আর তার মা আমেনা বিনতে ওয়াহহাব তাকে ডাকতেন ‘আহমাদ’ নামে। ‘আবুল কাসিম’ ছিল তার কুনিয়াত বা উপনাম।
নবীজির (সা.) বংশ ছিল অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। পিতার দিক থেকে তিনি কুরাইশ গোত্রের বনু হাশিম শাখার সন্তান। তার পিতা আবদুল্লাহ, পিতামহ আবদুল মুত্তালিব, প্রপিতামহ হাশেম—যাঁরা সবাই মক্কার সমাজে সম্মানিত ছিলেন। অন্যদিকে মাতৃকুলেও তিনি সম্ভ্রান্ত ও বিশুদ্ধ বংশের উত্তরাধিকারী। তার মাতামহ ওয়াহহাব ছিলেন বনু জুহরা গোত্রের নেতা। এভাবে কিলাব পর্যন্ত গিয়ে তার পিতৃ ও মাতৃ বংশ একত্রিত হয়েছে, যা আরব সমাজে তার নসবের স্বচ্ছতা ও মর্যাদা প্রমাণ করে।
তবে এই মহিমান্বিত জন্মের আগেই নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পিতৃহারা হন। তার জন্মের প্রায় দুই মাস পূর্বেই পিতা আবদুল্লাহ ইন্তেকাল করেন। ফলে জন্মলগ্ন থেকেই জীবনের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে তার পরিচয় ঘটে। জন্মের পর প্রথমে মা আমেনা তাকে দুধ পান করান। এরপর কিছুদিন আবু লাহাবের দাসী সুওয়াইবা তাকে দুগ্ধদান করেন। এই সূত্রে তিনি হজরত হামজা, হজরত আবু সালামা প্রমুখের দুধভাই হন।
আরব সমাজে তখন একটি প্রচলিত রীতি ছিল—নবজাতকদের গ্রাম্য দুধ-মায়ের কাছে পাঠানো। এর পেছনে দুটি উদ্দেশ্য ছিল: একদিকে বিশুদ্ধ আরবি ভাষা শিক্ষা, অন্যদিকে খোলা পরিবেশে সুস্থ-সবলভাবে বেড়ে ওঠা। এই রীতি অনুযায়ী রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) চলে যান বনু সাদ গোত্রের নারী হজরত হালিমা সাদিয়ার (রা.) কোলে। এই আগমন ছিল হজরত হালিমার জীবনে অভাব থেকে স্বচ্ছলতার দিকে এক বিস্ময়কর পরিবর্তনের সূচনা। নবীজির (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বরকতে তার পরিবারে নেমে আসে প্রাচুর্য, শান্তি ও কল্যাণ। হজরত হালিমা (রা.) দুই বছর দুধ পান করানোর পরও তার প্রতি গভীর মমতার কারণে আরও দুই বছর তাকে নিজের কাছে রেখে দেন। এই সময়েই নবীজির (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শৈশবের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রচিত হয়।
হজরত হালিমার পরিবারে নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শুধু দুধসন্তানই ছিলেন না, বরং সবার ভালোবাসার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন। তার দুধভাই আবদুল্লাহ, হুজাইফা এবং দুধবোন শাইমা ও আনিসা—সবার সঙ্গে তার গভীর আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরবর্তীকালে এই পরিবারের অধিকাংশ সদস্য ইসলাম গ্রহণ করেন, যা নবীজির (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রভাব ও চরিত্রের সাক্ষ্য বহন করে।
শৈশবের এই শান্ত সময়ের পর আসে এক হৃদয়বিদারক অধ্যায়। ছয় বছর বয়সে নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার মায়ের সঙ্গে মদিনায় যান বাবার কবর জিয়ারত ও আত্মীয়দের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য। কিন্তু ফেরার পথে ‘আবওয়া’ নামক স্থানে তার মা আমেনা ইন্তেকাল করেন। এত অল্প বয়সে মা-হারানোর বেদনা নবীজির (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। এই সময় তার সঙ্গে ছিলেন বিশ্বস্ত দাসী উম্মে আয়মান, যিনি পরবর্তীকালে তার জীবনে মাতৃসম স্নেহের প্রতীক হয়ে ওঠেন। নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজেই বলেছেন, ‘তিনি আমার মায়ের পরে মা।’
মক্কায় ফিরে এলে পিতামহ আবদুল মুত্তালিব তাকে স্নেহভরে লালন-পালন করেন। কাবাঘরের তত্ত্বাবধায়ক ও কুরাইশের নেতা হিসেবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত প্রভাবশালী। তবু তিনি নাতির প্রতি ছিলেন অসাধারণ মমতাশীল। কিন্তু এই আশ্রয়ও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। আট বছর বয়সে নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আবারও অভিভাবকহারা হন পিতামহের ইন্তেকালের মাধ্যমে।
এরপর নবীজির (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দায়িত্বভার অর্পিত হয় তার চাচা আবু তালিবের ওপর। আবু তালিব দরিদ্র হলেও ছিলেন উদার হৃদয়ের অধিকারী। তিনি ও তার স্ত্রী ফাতেমা বিনতে আসাদ নবীজিকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজেদের সন্তানের মতো ভালোবাসতেন। আবু তালিব আজীবন নবীজির (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সহায় ও আশ্রয় ছিলেন—যদিও তিনি ইসলাম গ্রহণ করেননি।
কৈশোরে নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) চাচা আবু তালিবের সঙ্গে ব্যবসায়িক সফরে বের হন। বারো বছর বয়সে শামের পথে ‘তিমা’ নামক স্থানে এক খ্রিস্টান পাদ্রী বাহিরা তার মাঝে ভবিষ্যৎ নবুয়তের আলামত দেখতে পান। তিনি সতর্ক করে দেন—ইহুদিরা যদি তাকে চিনে ফেলে, তবে তার জীবন বিপন্ন হতে পারে। এই আশঙ্কায় আবু তালিব তাকে শামে না নিয়ে মক্কায় ফিরিয়ে আনেন।
পরবর্তীতে নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আবার শামে যান, তবে এবার একজন পূর্ণবয়স্ক ও বিশ্বস্ত ব্যবসায়ী হিসেবে। হজরত খাদিজার (রা.) পণ্য নিয়ে তিনি এই সফরে যান এবং অসাধারণ সততা ও দক্ষতার পরিচয় দেন। তার বিশ্বস্ততা, ন্যায়পরায়ণতা ও চরিত্রের মহত্ত্ব খাদিজার (রা.) হৃদয়ে গভীর প্রভাব ফেলে। তার দাস মাইসারার বর্ণনায় নবীজির (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) চরিত্র তার কাছে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এই প্রভাব থেকেই হজরত খাদিজা (রা.) নবীজির (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কাছে বিবাহের প্রস্তাব পাঠান। তখন নবীজির (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বয়স পঁচিশ বছর। খাদিজার (রা.) বয়স নিয়ে মতভেদ থাকলেও সর্বাধিক প্রচলিত মত অনুযায়ী তিনি ছিলেন চল্লিশ বছরের। এই বিবাহ ছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও আস্থার এক অনন্য বন্ধন। এই দাম্পত্য জীবন নবীজির (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জীবনে স্থিতি, মানসিক প্রশান্তি ও সামাজিক শক্তির ভিত্তি রচনা করে।
বিবাহের পর নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খাদিজার (রা.) গৃহে বসবাস শুরু করেন। এখানেই তার জীবনে আসেন জায়েদ ইবনে হারেসা (রা.)—এক অপহৃত কিশোর ক্রীতদাস, যিনি নবীজির (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) স্নেহ ও মানবিক আচরণে এতটাই মুগ্ধ হন যে, তার বাবা তাকে খুঁজে বের করে বাড়িতে ফিরিয়ে নিতে এলেও তিনি নবীজির (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সঙ্গ ছাড়তে রাজি হননি। এই ঘটনা নবীজির (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) চরিত্রের মানবিকতা, দয়া ও নেতৃত্বগুণের এক উজ্জ্বল প্রমাণ।
নবীজির (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জন্ম থেকে বিবাহ পর্যন্ত এই সময়কাল আমাদের সামনে এক অনন্য ব্যক্তিত্বের ধীরে ধীরে গড়ে ওঠার চিত্র তুলে ধরে। পিতৃহারা, মাতৃহারা, আশ্রয়হীনতার মধ্যেও তিনি যে ধৈর্য, সততা, দয়া ও মানবিকতার আদর্শ স্থাপন করেছেন তা পরবর্তীকালে তার নবুয়তের মহান দায়িত্ব পালনের জন্য এক সুদৃঢ় ভিত্তি রচনা করে।
ওএফএফ