আবু জাহলের মা ও মেয়ে ছিলেন নবীজির (সা.) সাহাবি
মওলবি আশরাফ
নবীজিকে (সা) যেসব কাফের-মুশরিক সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিয়েছিল, তাদের মধ্যে সবার আগে আবু জাহলের নাম আসে। নবুয়তের একেবারে প্রথম সময় থেকেই সে ইসলামের ঘোর বিরোধিতা ও মুসলমানদের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালিয়ে আসছিল। কোরায়শের সাথে মুসলমানদের প্রথম যুদ্ধ বদরে এই আবু জাহল নেতৃত্ব দিয়েছিল, এবং যুদ্ধে সে নিহত হয়। নবীজির (সা.) অন্য অনেক শত্রুর মত ইসলাম গ্রহণের সৌভাগ্য তার হয়নি। কিন্তু আবু জাহলের মা ও মেয়ে দুজনই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।
আবু জাহলের মায়ের নাম ছিল আসমা বিনতে মুখাররাবাহ। প্রথম জীবনে তার বিয়ে হয়েছিল হিশামের সাথে। স্বামীর মৃত্যুর পর তার ভাই আবু রবিয়ার সাথে দ্বিতীয় বিয়ে হয়। তার ইসলাম গ্রহণের সঠিক সময় জানা যায় না, তবে এইটুকু জানা যায়—মক্কা বিজয়ের আগেই তিনি মুসলমান হয়ে মদিনায় হিজরত করেছিলেন। পরবর্তী জীবনে তিনি আর মক্কায় ফেরেননি, মদিনায় থেকে যান।
তার সম্পর্কে ইতিহাসের বইয়ে বিস্তারিত তথ্য নেই, তবে একটি ঘটনার মধ্য দিয়ে তার সম্পর্কে আমরা জানতে পারি। ঘটনাটা হযরত ওমরের (রা) খেলাফত আমলের। রুবাইয়ি বিনতে মুয়াওয়িজ (রা), যিনি ছিলেন আবু জাহলের হত্যাকারী সাহাবি মুওয়ায়িজের (রা.) মেয়ে, একদিন মদিনার বাজারে আতর কিনতে যান। তিনি সেখানে গিয়ে দেখেন আবু জাহলের মা খুবই উৎকৃষ্ট মানের আতর বিক্রি করছেন। এই আতর তার ছেলে আবদুল্লাহ ইবনে আবু রাবিয়াহ ইয়েমেন থেকে পাঠাতেন, আর তিনি তা মানুষের কাছে বিক্রি করতেন।
রুবাইয়ি বিনতে মুয়াওয়িজ (রা) বলেন, হজরত ওমর (রা) প্রত্যেক নাগরিকের জন্য ভাতা নির্ধারণ করেছিলেন, তাই সাধারণত বাকিতে কেনাবেচা হতো, ভাতা পেলে সবাই পাওনা পরিশোধ করে দিতেন।
নারীরা ভিড় জমিয়ে আবু জাহলের মায়ের কাছ থেকে আতর কিনতে লাগলো। তিনিও আতর মেপে মেপে শিশিতে ভরে দিলেন। এরপর বললেন, তোমরা তোমাদের নাম ও টাকার পরিমাণ লিখিয়ে নাও। প্রত্যেকেই নাম লেখালেন। যখন রুবাইয়ি বিনতে মুয়াওয়িজের (রা) পালা এলো, তিনি তার নাম বলতেই আবু জাহলের মায়ের চেহারা বদলে গেল। সন্তান কাফের হলেও তিনি তো মা, সেই মাতৃত্বসুলভ ভালোবাসা কখনও মোছা যায় না। তিনি বললেন, দূরে গিয়ে মরো, তুমি কি সেই লোকের মেয়ে, যে তার সর্দারকে হত্যা করেছিল?
তার কথা শুনে রুবাইয়ি বিনতে মুয়াওয়িজও (রা) রেগে গেলেন, বললেন, না, আমি সেই লোকের মেয়ে যে আল্লাহর এক গোলামকে হত্যা করেছিল। এ কথা শুনে আবু জাহলের মা রেগে আগুন হয়ে গেলেন। বললেন, আল্লাহর কসম, আমি তোমার কাছে জীবনেও কিছু বিক্রি করব না। রুবাইয়ি বিনতে মুয়াওয়িজও (রা) বললেন, আল্লাহর কসম, আমিও তোমার কাছ থেকে জীবনেও কিছু কিনব না।
অবশ্য রুবাইয়ি বিনতে মুয়াওয়িজ (রা) স্বীকার করেন—অমন চমৎকার সুঘ্রাণের আতর এর আগে কোনোদিনও দেখেননি। কিন্তু সেদিন রাগ করে এ কথা বলেছিলেন। (তাবাকাতে ইবনে সাদ: ১২৪০৮)
আবু জাহলের মেয়ের নাম ছিল জুওয়াইরিয়াহ, আরেক নাম আওরা। তিনিও ইসলাম গ্রহণ করে নবীজির (সা.) কাছে বাইয়াত গ্রহণ করেছিলেন। তিনি হজরত আলীকে (রা) বিয়ে করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ফাতেমা (রা) এ ব্যাপারে আপত্তি করলে ও নবীজিকে (সা.) জানালে নবীজি (সা.) খুব অসন্তুষ্ট হন এবং বলেন, ফাতেমা আমার এক টুকরা অংশ, তার কোনো কষ্ট হোক তা আমি কখনোই পছন্দ করব না। (সহিহ বুখারি: ৩৭২৯)
এরপর তিনি জুওয়াইরিয়া (রা) আত্তাব ইবনে উসাইদকে (রা.) বিয়ে করেন। আত্তাবের (রা.) মৃত্যুর পর আবান ইবনে সাইদের (রা.) সাথে তার বিয়ে হয়। তিনি খুবই খোদাভীরু নারী ছিলেন। তার কাছ থেকে অনেক হাদিসও বর্ণিত হয়েছে।
ওএফএফ