নবীজির (সা.) হজ
ইলিয়াস মশহুদ
নবীজি (সা.) জীবনে একবারই হজ করেছিলেন যা বিদায় হজ নামে পরিচিত। বিদায় হজে নবীজির (সা.) দীর্ঘ তেইশ বছরের নবুয়্যতি মিশনের পূর্ণতা ঘোষণা করা হয়েছিল। নবীজির (সা.) ভাষণ ও কথাবার্তায় ফুটে উঠেছিল বিদায়ের সুর। এই হজ থেকে মদিনায় ফেরার কিছুদিন পর নবীজি (সা.) ইন্তেকাল করেন।
হিজরতের নবম বা দশম বছরে হজ ফরজ হওয়ার নির্দেশ আসে। আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন, আল্লাহর জন্য হজ ও ওমরাহ জন্য পূর্ণ করো। (সুরা বাকারা: ১৯৬)
এই আয়াত নাজিল হওয়ার পর নবীজি (সা.) ঘোষণা দেন, এ বছর তিনি হজ পালন করবেন। এই ঘোষণা শোনার পর মদিনা ও এর আশপাশের জনপদে এক অভূতপূর্ব সাড়া পড়ে যায়। হাজার হাজার সাহাবি নবীজির সফরসঙ্গী হওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে মদিনায় জড়ো হতে থাকেন। (সহিহ মুসলিম: ১২১৮)
দশম হিজরির জিলকদ মাসের ২৫ তারিখ, শনিবার নবীজি (সা.) মদিনা থেকে মক্কার পথে রওয়ানা হন। মদিনার মসজিদে নববিতে জোহরের চার রাকাত নামাজ আদায় করে তিনি রওয়ানা হন। মদিনা থেকে কয়েক মাইল দূরে অবস্থিত জুলহুলায়ফা নামক মিকাতে পৌঁছে তিনি আসরের নামাজ কসর করে আদায় করেন। সেখানে তিনি রাত্রিযাপন করেন। তাঁর সব স্ত্রী এই পবিত্র সফরে তাঁর সাথে ছিলেন। (সহিহ বুখারি: ৩/৩২৪)
ইহরাম বাঁধার আগে নবীজি (সা.) চুলে তেল মেখে মাথা আঁচড়ে পরিপাটি হন। উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা.) নিজ হাতে নবীজির শরীর ও মাথায় সুগন্ধি লাগিয়ে দেন। এরপর নবীজি (সা.) সেলাইবিহীন চাদর ও লুঙ্গি পরিধান করে ইহরামের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করেন। (সহিহ বুখারি: ১০/৩০৫, ৩১৩; সহিহ মুসলিম: ১১৮৯)
নবীজি (সা.) যখন তাঁর উটের পিঠে সাওয়ার হয়ে ইহরামের নিয়ত করেন, তখন তিনি ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইক লা শারিকা লাকা লাব্বাইক... তালবিয়াটি পাঠ করেন। এ সময় নবীজির (সা.) সামনে, পেছনে, ডানে ও বামে মানুষের সমুদ্র। যতদূর চোখ যায়, কেবল শুভ্র পোশাকধারী আল্লাহর মেহমানদের দেখা যাচ্ছিল। (সহিহ বুখারি: ৩/৩২৩)
নবীজি (সা.) এই সফরে হজ ও উমরাহর নিয়ত একত্রে করেছিলেন এবং তাঁর সাথে কোরবানির পশু ছিল। নিয়ম অনুযায়ী, যার সাথে কোরবানির পশু থাকে, সে পশু জবাই করার আগে হালাল বা ইহরামমুক্ত হতে পারে না। তাই নবীজি (সা.) মক্কায় পৌঁছে ওমরাহ করার পরও হালাল হননি, হজের কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত পুরো সময় তিনি ইহরাম অবস্থায় ছিলেন। (সহিহ মুসলিম: ১২৪৩)
মক্কায় প্রবেশ ও হজের কার্যাবলি
জিলহজ মাসের ৪ তারিখ সকালে নবীজি (সা.) মক্কায় প্রবেশ করেন। প্রথমে তিনি অজু করে বায়তুল্লাহর তওয়াফ করেন। এরপর সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে সাঈ সম্পন্ন করেন। হজের মূল কার্যক্রম শুরু হলে তিনি ৮ জিলহজ মিনা এবং ৯ জিলহজ আরাফার ময়দানে অবস্থান করেন। (সহিহ বুখারি: ৩/৩৮২)
আরাফার ময়দানেই তিনি তাঁর ঐতিহাসিক ‘বিদায় হজের ভাষণ’ প্রদান করেন, যা মানবজাতির জন্য এক চিরন্তন পথনির্দেশিকা। সেখানে তিনি ঘোষণা করেন, ‘মুমিনরা একে অপরের ভাই, তোমরা পরস্পরের ওপর জুলুম করো না।’ তিনি মানুষের জীবন, সম্পদ ও ইজ্জতের পবিত্রতা নিশ্চিত করার ঘোষণা দেন। (সুনানে তিরমিজি: ২৩৯৮)
নবীজির (সা.) ওমরাহ ও কোরবানি
নবীজি (সা.) তাঁর জীবনে মোট চারটি ওমরাহ করেছেন এবং এর প্রতিটিই ছিল জিলকদ মাসে। (সুনানে আবু দাউদ: ১৯৯১)
বিদায় হজের সময় তিনি কুরবানির পশু সঙ্গে এনেছিলেন। ১০ জিলহজ তিনি নিজের হাতে কোরবানি করেন এবং মাথার চুল মুণ্ডন করে ইহরামের সমাপ্তি ঘটান। (সহিহ মুসলিম: ১৩০৫)
দ্বীন পূর্ণ হওয়ার ঘোষণা
এই হজের সময়ই সুরা মায়েদার সেই বিখ্যাত আয়াতটি নাজিল হয়, ‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণ করে দিলাম।’ (সুরা মায়েদা: ৩)
এই আয়াতের মাধ্যমে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল যে, নবীজির (সা.) পার্থিব মিশনের কাজ শেষ। সাহাবিরা বুঝতে পেরেছিলেন, নবীজি (সা.) হয়ত আর বেশিদিন তাদের মাঝে থাকবেন না। বিদায়ের সময় ঘনিয়ে এসেছে।
বিদায় হজের মাধ্যমে নবীজি (সা.) তাঁর উম্মতের জন্য হজের যে রূপরেখা দিয়ে গেছেন। আল্লাহ তাআলা আমাদের নবীজির (সা.) সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন অতিবাহিত করার এবং জীবনে অন্তত একবার সেই পবিত্র ভূমি জিয়ারত করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
ওএফএফ