ইতালিতে তাঁবুতে ইফতার ও তারাবি

ইসলাম ডেস্ক
ইসলাম ডেস্ক ইসলাম ডেস্ক
প্রকাশিত: ১২:৫৬ পিএম, ২০ এপ্রিল ২০২২
মুসলিম সিসিলির একটি মসজিদ

মুসলিম বিশ্বের মহিমান্বিত মাস রমজান। এ মাস ঘিরে নানা অনুষ্ঠান আর রীতি-রেওয়াজ আছে। রোজা রাখা, ইফতারের পর তারাবির নামাজ পড়া ইত্যাদি ছাড়াও আনন্দ-উৎসবের মাধ্যমে সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হয় খুশির আমেজ। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের চেয়েও এসব রীতি সাংস্কৃতিক উদযাপন হিসেবে বেশ জনপ্রিয়। দক্ষিণ ইউরোপে অবস্থিত ভূমধ্য সাগরীয় দেশ ইতালি। সেখানকার মুসলিমরা কীভাবে রমজান পালন করেন, তা নিয়ে লিখেছেন মুনশি মুহাম্মদ উবাইদুল্লাহ

রমজানকে ঘটা করে স্বাগত
ইতালির অধিকাংশ অধিবাসী ক্যাথলিক খ্রিস্টান। তা ছাড়া বৌদ্ধ ও ইহুদি আছে। সমগ্র জনসংখ্যার ১ শতাংশ হলো মুসলমান। এই অল্পসংখ্যক মুসলমান রমজানকে ঘটা করে স্বাগত জানায়।

আরব সভ্যতা ও সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত
ইতালিতে ইসলাম নবাগত কোনো ধর্ম নয়। বরং ইতালির ভাগ্যোন্নায়নের অনেক কিছু হয়েছে মুসলিমদের নেতৃত্বে। ইসলামের সোনালি যুগে ইতালির ‘সিসিলি’ দ্বীপপুঞ্জ মুসলিম শাসনাধীন ছিল। এখানেই জন্মগ্রহণ করেন বিখ্যাত মুসলিম কবি ও দার্শনিক ইবনে হামাদিস সিসিলি। ইতালির সমাজ আরব সভ্যতা ও সংস্কৃতি দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবিত। বিশেষত পশ্চিম ইতালির যেসব দ্বীপ আরব রাষ্ট্রগুলোর নিকটবর্তী, সেখানে আরব রীতিনীতি ও জীবনাচরণের ছাপ পাওয়া যায়। বর্তমানে স্থানীয় ও অভিবাসী মিলে ইতালিতে প্রায় ১৫ লাখ মুসলিম বসবাস করে। জনসংখ্যার ৪% ভাগ মুসলিম। ইতালিতে ছোট-বড় ৪৫০টি মসজিদ রয়েছে।

ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ইতালি
ইতালি ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের প্রাণকেন্দ্র ভ্যাটিক্যানের দেশ হলেও সেখানে ইসলামের আগমন হয়েছিল খুব সহজেই। ইতালিতে ইসলামের আগমন ঘটে প্রথমে সামরিক বিজয়ের মাধ্যমে। পরে অবশ্য সেখানে ইসলাম প্রচারকদের একটি বড় দল ওই অঞ্চলের মানুষের মাঝে ইসলামের বাণী প্রচার করতে থাকে। বর্তমানে ইতালিতে ইসলামের প্রচার-প্রসারে ‘ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ইতালি’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ইসলাম প্রচারে তাদের অভাবনীয় সাফল্যের কারণেই তারা কয়েকবার চরমপন্থীদের হামলার শিকার হয়েছে। তারপরও তারা চরম ধৈর্য ও সহনশীলতার সঙ্গে ইসলামের বাণী প্রচার করে যাচ্ছে। যেসব ইতালীয় ইসলামের বিরুদ্ধে অযৌক্তিক অভিযোগ উত্থাপন করে, ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র যুক্তির সঙ্গে তা খণ্ডন করে আসছে। ইসলাম প্রচারকরা পাল্টা আক্রমণের পরিবর্তে চরমপন্থীদের সামনে ইসলামের সৌন্দর্য তুলে ধরে।

শাসকদের স্বচ্ছ ধারণার অভাব
ইসলামি শিক্ষা বিস্তারে ইতালিতে বেশ কয়েকটি ইসলামিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ইতালিতে মুসলিম সোসাইটির সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, ইসলাম সম্পর্কে ইতালির শাসকদের স্বচ্ছ ধারণার অভাব। ফলে তারা ইসলাম বিষয়ে বেসরকারি টিভি চ্যানেল করার অনুমতি এখনও পায়নি। তাই ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র একটি অনলাইন টিভি চ্যানেলের অনুমতি লাভের চেষ্টা করছে। এমনকি ইতালিতে মুসলিমদেরকে ইসলামি রীতি অনুসারে দাফন করারও অনুমতি দেওয়া হয় না। তবে রমজানে কোথাও কোথাও প্রশাসন কিছুটা নমনীয়তা দেখায়। ফলে মুসলিমরা ইফতার পার্টি করার অনুমতি পায়। ইতালিতে মুসলমানরা নির্দিষ্ট একটি জায়গায় তাঁবু করে তারাবির নামাজ আদায় করে ও ইফতার করে। রমজানে ইতালির সরকার এসব খুব একটা বাঁধা দেয় না।

মুসলিম রেস্তোঁরায় ইফতার-সেহরি
রমজান মাসকে ইতালির মুসলিমরা ধর্মচর্চা ও ইবাদতের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে। এ সময় তারা মুসলিম দেশে তৈরি পণ্য ও খাবার গ্রহণ করে। শহরের মুসলিম হোটেল ও রেস্তোঁরায় ইফতার ও সেহরি করে। ইফতারিতে তারা বার্গার জাতীয় খাদ্য, নানাবিধ ফল (যেমন মাল্টা, আপেল, আঙ্গুর, বিভিন্ন ফলের রস) খায়। সেহরিতে বার্গার ও বার্গার জাতীয় খাদ্য বেশি পছন্দ করে থাকে। রমজান মাসে ইতালির মুসলিমরা আরবীয় খাবার সংগ্রহের চেষ্টা করে; যা মুসলমানদের কাছে বিশেষভাবে জনপ্রিয়। রমজান মাসে আরব দেশ থেকে আমদানি করা প্রচুর খাবার ইতালিতে পাওয়া যায়। যার উল্লেখযোগ্য অংশ যায় উপহার হিসেবে। ইতালির মুসলিম কমিউনিটিগুলো রমজানে ইসলামি বিষয়ে পাঠদানের ব্যবস্থা করে। সেখানে সাধারণত আরব আলেমদেরকেই আমন্ত্রণ জানানো হয়।

অভিবাসীর সপরিবারে মসজিদে ইফতার
রমজান মাসে ইতালির মুসলিম অধিবাসী এবং বিভিন্ন দেশের মুসলিম অভিবাসীরা পরস্পরের কাছে আসার সুযোগ লাভ করে। সাধারণত তারা সবাই সপরিবারে মসজিদে ইফতারি করে। ইফতার অনুষ্ঠানে অভিবাসীরা নিজ নিজ দেশের ঐতিহ্যবাহী খাবার তৈরি করে নিয়ে আসে। মসজিদে তারাবির নামাজ আদায় করে ঘরে ফেরে। রমজান মাসে ইতালীয় মুসলিমরা দু’হাত খুলে দান করেন। তারা অনুন্নত ও দুর্দশাগ্রস্থ মুসলিম অঞ্চলের জন্য দান করতে বেশি পছন্দ করেন। যেমন, ফিলিস্তিন ও আফ্রিকার দরিদ্র্য অঞ্চলের জন্য মোটা অঙ্কের অর্থ দান করেন।

ভেনিসে বাংলাদেশিদের ইফতার বাজার
পবিত্র রমজান মাস উপলক্ষে ইতালির ভেনিসের কয়েকটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ইফতারি পণ্যের জমজমাট বাজার গড়ে উঠেছে। ইতালির এই বন্দরনগরীতে প্রবাসী বাংলাদেশির সংখ্যা প্রায় ২০ হাজার। বিশেষ করে, ভেনিসের মেসত্রে ও মারঘেরাতে বেশি সংখ্যক বাংলাদেশির বসবাস। এখানেই গড়ে উঠেছে বহু বাংলাদেশি মালিকানাধীন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। এর কয়েকটি দোকান ইফতারের জন্য জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এসব দোকানে ছোলা বুট, পিয়াজু, বেগুনি, বুন্দিয়া, আলুর ডিমচপ, হালিম, শরবত, লাচ্ছি, জিলাপিসহ নানা রকম খাবার তৈরি হচ্ছে। প্রবাসীরা এসব দোকান থেকে পণ্য কেনার পাশাপাশি পরিবার নিয়েও ইফতার করতে আসেন। মেসত্রের আল মদিনা বাংলা মিষ্টিঘর ও দেশ ফাস্টফুড এবং মারঘেরার বাংলা মিষ্টিঘরসহ বেশ কয়েকটি রেস্তোরাঁয় বসে ইফতার সেরে নেয়।

মুনশি/এসইউ/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]