যেসব নেয়ামতের বর্ণনায় মুমিনের হৃদয়ে আনন্দ বইবে আজ

ধর্ম ডেস্ক
ধর্ম ডেস্ক ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৫:৫৩ পিএম, ১৭ মে ২০২০

বিগত জীবনের গোনাহ মাফের আমল হলো রাতের তারাবিহ নামাজ। ২৪ রোজা প্রস্তুতিতে তারাবিহ পড়বে রোজাদার। আল্লাহ তাআলার অসংখ্য নেয়ামতের বর্ণনায় রোজাদার মুসল্লির হৃদয় বইবে আনন্দের জোয়ার। দুনিয়া ও পরকালের অবিরাম নেয়ামতের বর্ণনা করে আল্লাহ তাআলা বান্দাকে বার বার জিজ্ঞাসা করবে-
'তুমি তোমার প্রভূর কোন কোন নেয়ামতকে অস্বীকার করবে?

সুরা যারিয়াতের ৩১ আয়াত থেকে শুরু হবে ২৪তম তারাবিহ। সুরা তুর, নজম, ক্বামার, আর-রাহমান, ওয়াক্বিয়াহ ও সুরা হাদিদ পড়া হবে আজ। সে সঙ্গে ২৭তম পাড়ার তেলাওয়াত শেষ হবে। আজকের তারাবিহগুলোর আলোচ্য বিষয় সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো-

সুরা যারিয়াত : আয়াত ৬০
মক্কায় অবতীর্ণ সুরাটিতে আল্লাহর একত্ববাদ, নবুয়ত ও হাশরের ঘটনার বিস্তারিত বর্ণিত হয়েছে। সুরাটিতে পয়গাম্বর ইবরাহিম, মুসা, নূহ আলাইহিমুস সালামের সময়ের বিবরণ রয়েছে। এ সুরায় সুবিন্যস্ত আকাশ ও পৃথিবী এবং সৃষ্টি জগতের জোড়া জোড়া প্রাণীর বর্ণনা ওঠে এসেছে। যাতে মানুষ এসব দেখে অন্যায় ছেড়ে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে। আল্লাহ তাআলা বলেন-
'আমি স্বীয় ক্ষমতাবলে আকাশ নির্মাণ করেছি এবং আমি অবশ্যই ব্যাপক ক্ষমতাশালী। আমি ভূমিকে বিছিয়েছি। আমি কত সুন্দরভাবেই না বিছাতে সক্ষম। আমি প্রত্যেক বস্তু জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছি, যাতে তোমরা হৃদয়ঙ্গম কর। অতএব, আল্লাহর দিকে ধাবিত হও। আমি তাঁর তরফ থেকে তোমাদের জন্যে সুস্পষ্ট সতর্ককারী।' (সুরা যারিয়াত : আয়াত ৪৭-৫০)

আল্লাহ তাআলা মানুষের রিজিক দাতা। তিনি মানুষের কাছে কোনো জীবিকা চান না। তিনি চান মানুষ তার ইবাদত-বন্দেগি করুক। আল্লাহ তাআলা কুরআনে এ কথা তুলে ধরেছেন, তিনি কেন মানুষ এবং জ্বিন জাতিকে সৃষ্টি করেছেন? আল্লাহ তাআলা বলেন-
'আমার এবাদত করার জন্যই আমি মানব ও জিন জাতি সৃষ্টি করেছি। আমি তাদের কাছে জীবিকা চাই না এবং এটাও চাই না যে, তারা আমাকে আহার্য যোগাবে। আল্লাহ তাআলাই তো জীবিকাদাতা শক্তির আধার, পরাক্রান্ত।' (সুরা যারিয়াত : আয়াত ৫৬-৫৮)

সুরা তুর : আয়াত ৪৯
সুরা তুর মক্কায় নাজিল হয়। এ সুরায় পরকালীন জীবনের সত্যতা, সত্যত্যাগীদের প্রতি কঠোর হুশিয়ারি এবং পরকালীন জীবনে সত্যের অনুসারীদের পুরস্কারের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। আর তাতে তাওহিদ রেসালাত ও পরকালের বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে ওঠে এসেছে।

সুরাটির শুরুতে বেশ কিছু জিনিসের কসম করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে তুর পাহাড়, আসমানি কিতাব, প্রশস্ত পত্র, বায়তুল মামুর, সমুন্নত ছাদ (আসমান) এবং উত্তাল সমুদ্রের। (সুরা তুর : আয়াত ১-৬)

এ সুরায় অবিশ্বাসীদের কঠিন পরিণতির কথা সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। আবার জান্নাতীদের জন্য তুলে ধরা হয়েছেন অবিরাম নেয়ামতের বর্ণনা। জান্নাতের তাদের পরিবেশ করা হবে অনেক নেয়ামত।

এ সুরার শেষাংশে আল্লাহ তাআলা তার প্রিয় বন্ধু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তার শেষ রাতে তার তাসবিহ পড়ার নির্দেশ দেন। যা মুমিন মুসলমানদের জন্য নসিহত ও শিক্ষা। আল্লাহ তাআলা বলেন-
'আপনি আপনার পালনকর্তার নির্দেশের অপেক্ষায় সবর করুন। আপনি আমার দৃষ্টির সামনে আছেন এবং আপনি আপনার পালনকর্ত�ার সপ্রশংস পবিত্রতা ঘোষণা করুন যখন আপনি গাত্রোত্থান করেন। এবং রাত্রির কিছু অংশে এবং তারকা অস্তমিত হওয়ার সময় তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করুন।' (সুরা তুর : আয়াত ৪৮-৪৯)

সুরা নজম : আয়াত ৬২

মক্কায় অবতীর্ণ সুরা নজমে আল্লাহ তাআলা বিশ্বনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুয়ত ও রেসালাত এবং কুরআনের সত্যতার প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রত্যেকটি কথাকে যে মানবজাতির জন্য অনুসরণীয় তাও ঘোষণা করা হয়েছে। বিশেষ করে বিশ্বনবির পবিত্র জবান থেকে যা বের হয় তা শুধু আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ ওহি।

এ সুরার আলোচ্য বিষয় হলো- রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সত্য নবি হওয়া এবং তাঁর প্রতি অবতীর্ণ ওহিতে সন্দেহ ও সংশয়ের অবকাশ না থাকার কথা বর্ণিত হয়েছে। এরপর মুশরিকদের নিন্দা জ্ঞাপন করা হয়েছে।

সুরা ক্বামার : আয়াত ৫৫
মক্কায় অবতীর্ণ এ সুরাটিতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একটি বিশেষ মুযেজার উল্লেখ রয়েছে। যা বিশ্বনবির নবুয়তের দলিল হিসেবে বর্ণিত হয়েছে। সুরা ক্বামারের আলোচিত বিষয়গুলো হলো- ক্বিয়ামাত নিকটবর্তী হওয়ার ঘোষণা; তাওহিদ এবং রেসালাতের দলিল প্রমাণ উল্লেখ, ঈমান এবং নেক আমলের জন্য পুরস্কারের প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি আল্লাহর নাফরমানির শাস্তি সম্পর্কেও সতর্কবাণী উচ্চারণ করা হয়েছে।

সুরাটিতে কুরআন বুঝার আহ্বান জানানো হয়েছে। আর একাধিকবার এ কথাও বলা হয়েছে যে, কুরআন বুঝা সহজ। আল্লাহ বলেন-
'আমি কুরআনকে বুঝার জন্যে সহজ করে দিয়েছি। অতএব, কোনো চিন্তাশীল আছে কি?' (সুরা ক্বামার : আয়াত ৪০)

বিশেষ করে ইসলাম পূর্ববর্তী যুগে যারা এ পৃথিবীতে আল্লাহর নাফরমানি করেছে- আদ-সামুদ জাতি, হজরত লুত আলাইহিস সালামের সম্প্রদায়, ফেরাউনের দলবলসহ তাদেরকে কিভাবে ধ্বংস করা হয়েছে এ সকল বর্ণনা ওঠে এসেছে এ সুরায়।

সুরা রাহমান : আয়াত ৭৮
মাদিনায় অবতীর্ণ শ্রুতিমধূর ও ব্যাপক পরিচিত ও তিলাওয়াতকৃত সুরা আর রহমানে দুনিয়া ও আখিরাতের আল্লাহর অনন্ত অসীম নিয়ামাতের বর্ণনা করা হয়েছে। এ সুরার মূল বক্তব্য হলো-
>> বিশ্বলোকের গোটা ব্যবস্থাপনা এক আল্লাহর ছাড়া আর কারো কতৃত্ব নেই;
>> গোটা বিশ্বলোকের ব্যবস্থাপনা পূর্ণ ভারসাম্যের সঙ্গে ইনসাফের ওপর প্রতিষ্ঠিত। কোনোভাবে এ ভারসাম্য বিনষ্ট হবে না;
>> আল্লাহ তাআলার কুদরত ও বিস্ময়কর কার্যকলাপের কথা বলার সঙ্গে মানব-দানবরা আল্লাহর যে নিয়ামাত ভোগ করছে, তার দিকেও ইঙ্গিত করা হয়েছে;
>> মানুষ ও জিন জাতিকে তার কর্মের হিসাবের ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে। এ সুরায় পৃথিবীর নাফরমান মানুষ ও জিনের মর্মান্তিক পরিণতির কথা বলা উল্লেখ করা হয়েছে।
>> মানব ও দানবদের মধ্যে যারা সৎকর্ম করেছে, পরকালকে ভয় করেছে, তাদেরকে প্রদেয় নিয়ামাতের বিস্তারিত বিবরণ পেশ করা হয়েছে এ সুরায়।

সুরা ওয়াক্বিয়া : আয়াত ৯৬
সুরাটি মক্কায় অবতীর্ণ। আল্লাহ তাআলার অনন্ত অসীম শক্তি ও অপূর্ব মহিমার বিস্তারিত বিবরণ স্থান পেয়েছে সুরা ওয়াক্বিয়ায়। বিশেষ করে পরকালে মানুষের সমগ্র জীবনের কর্মকাণ্ডের পরিণতি অবশ্যই ভোগ করতে হবে।

জন্মের ন্যায় মৃত্যু যেমন সত্য, ঠিক মৃত্যুর ন্যায় পরকাল, হাশরের ময়দানে পুনরুত্থানও সত্য। যার বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশিত হয়েছে এ সুরায়। সর্বোপরি এ সুরার শেষে আখিরাতের আলোচনা বর্ণনা করা হয়েছে।

সুরা হাদিদ : আয়াত ২৯
মদিনায় অবতীর্ণ সুরা হাদিদে ইসলামি শরিয়তের বুনিয়াদি বিধি-নিষেধ এবং মৌলিক আক্বিদা তথা তাওহিদ সম্পর্কে হিদায়াত রয়েছে এবং উত্তম চরিত্র অর্জনে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। এ সুরার মূল বক্তব্য হলো-

- বিশ্বজগৎ এক আল্লাহর সৃষ্টি, তিনি ভূ-মণ্ডল ও নভোমণ্ডল সব কিছুর একচ্ছত্র অধিপতি। সবকিছুই তার কর্তৃত্বাধীন। তাঁর কর্তৃত্বের কোনো কিছুতেই শরিক নেই।

- সত্যকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য; আল্লাহর দ্বীনকে কায়েম করার জন্য মানুষের কর্তব্য হলো- আত্মত্যাগের পরিচয় দেয়া।

- দুনিয়ার ধন-সম্পদ, সৌন্দর্য ও ঐশ্বর্য নিতান্ত ক্ষণস্থায়ী বিষয়। দুনিয়ার এ ক্ষণস্থায়ী জীবনকে পরকালীন চিরস্থায়ী জীবনের সম্বল সংগ্রহে ব্যয় করাই কল্যাণকামী মানুষের কর্তব্য।

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে কুরআনের এ গুরুত্বপূর্ণ সুরাগুলো বুঝে পড়ার এবং তাঁর ওপর আমল করার পাশাপাশি নিজেদের আকিদা-বিশ্বাসকে শিরকমুক্ত রাখার তাওফিক দান করুন। আমিন।

এমএমএস/এমকেএইচ

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]