১৬ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণে ওসমানী ছিলেন না, এ নিয়ে কেন হয়নি সিনেমা
বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির বয়ান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন চলচ্চিত্রকার মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ কিছু ঘটনা কেন সিনেমা বা উপন্যাসে উঠে আসেনি, এর ব্যাখ্যাও দিয়েছেন তিনি।
আজ (১৩ মে) বুধবার সন্ধ্যায় ফেসবুকে ‘কালচার নিয়া ছোট্ট আলাপ’ শিরোনামে একটি পোস্টে ফারুকী তুলেছেন গুরুতর সব প্রশ্ন। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘ষোলো ডিসেম্বর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে জেনারেল ওসমানী কেন ছিলেন না এই সহজ এবং গভীর প্রশ্নটা নিয়ে কোনো সিনেমা বা উপন্যাস হইছে বলে শুনছেন? ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরী এই বিষয়ে খোলামেলা স্মৃতিচারণ করার পরও আমরা কেউ এটা নিয়ে কাজ করছি? ভাসানীর ভুমিকা আর্ট-কালচারের পার্ট হইছে? বা রক্ষীবাহিনীর অত্যাচার নিয়ে কী কী কাজ হইছে?’
তিনি আরও লিখেছেন, ‘আপনারা মেজর জলিলকে নিয়ে কোনো ছবির কথা শুনেছেন? বাহাত্তর পরবর্তী নৈরাজ্য আমাদের আলোচিত কয়জন লেখকের উপন্যাসের বিষয় হওয়ার ভাগ্য অর্জন করেছে? যে শেরে বাংলা আমার এবং আপনার পূর্বপুরুষদের জমিদারী শোষণের হাত থেকে বাঁচিয়েছে, তাকে আমাদের শিল্প-সাহিত্যের কোনো গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে দেখেছেন? অথবা জমিদারী আমলের অত্যাচার আমাদের শিল্প-সংস্কৃতির কতটা জায়গা জুড়ে আছে? ইলিয়াস আলীর গুম নিয়ে কোনো ফিকশন ফিল্ম হইছে বলে শুনছেন? বা সুমন? বা আরমান?’
কেন সেসব হয়নি? সে প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন, ‘লাতিন আমেরিকার ফিল্মমেকাররা সিনেমায় তাদের কালো অধ্যায় তুলে আনে, আমাদের এখানে সেটা হইছে? বা হবার সম্ভাবনা দেখেন? আপনি একালের আবরার ফাহাদকে নিয়ে একটা কাহিনিচিত্র হবার সম্ভাবনা দেখেন? বর্তমান ইকোসিস্টেমে হয়তো সেই সম্ভাবনা দেখেন না। আমিও দেখি না। এর দুইটা কারণ। এক, আমরা বড় হই এমন একটা কালচারাল ন্যারেটিভের মধ্যে, যেখানে এই বিষয়গুলা কালচারালি কুল না, “প্রগতিশীল” না। ফলে আমাদের ভাবনা কখনো ওই লাইনেই যায় না। দুই, কোনো শিল্পী যদি এই বিষয়গুলা ডিল করতে চায়, সে সাথে সাথেই রাজাকার হয়ে যাবে। যেমন এর আগে আমি বহুবার রাজাকার উপাধি পেয়েছি। তারচেয়ে বড় কথা হলো, এই ধরনের গল্পের ছবিকে প্রডিউস করা বা ফাইন্যান্স করার লোক আপনি পাবেন না। প্রযোজনা সংস্থার গেটকিপিংয়েই হারায়ে যাবে এইসব গল্প।’
দেশে প্রচলিত ‘প্রগতিশীলতা’ ও ‘প্রতিক্রিয়াশীলতা’ প্রসঙ্গে সাবেক এই উপদেষ্টা লিখেছেন, ‘কোনটা “প্রগতিশীল” আর কোনটা “প্রতিক্রিয়াশীল” এটার রাজনীতি বাংলাদেশে খুবই ইন্টারেস্টিং। বাংলাদেশের কালচারাল ল্যান্ডস্কেপে সবচেয়ে বড় ঘটনাগুলার একটা, অর্থাৎ “নতুন কুঁড়ি”র জন্ম দিয়েও জিয়াউর রহমান এবং বিএনপি কালচারালি কুল ওরফে “প্রগতিশীল” না। ওদিকে ৭২ থেকে ৭৫, হাজার হাজার মানুষ মেরে, একদলীয় শাসন কায়েম করে, ২০০৮ পরবর্তী সময়ে শত শত মানুষকে গুম করে, মেরে লাশ নদীতে ডুবিয়ে দিয়ে, চব্বিশে খুনের মচ্ছবে মেতেও আওয়ামী লীগ কি সুন্দর আমাদের সো কলড কালচারাল পারসেপশনে “কুল” ওরফে “প্রগতিশীল”। এটাই হলো দ্য পলিটিকস অব কালচারাল এক্সক্লুশন অ্যান্ড সিলেকটিভ ইনক্লুশনের ফল। এর মধ্যদিয়ে একদল কেন্দ্রিক যে পারসেপশন তৈরি হইছে, এটা আওয়ামী লীগের হয়ে ৫৪ বছর ধরে উৎপাদন করেছে আওয়ামী মিডিয়া, কালচারাল সেন্টারস এবং একপেশে ইতিহাস উৎপাদনকারী বুদ্ধিজীবীরা।’
সাংস্কৃতিক উপলব্ধি বা পারসেপশনের গুরুত্ব প্রসঙ্গে ফারুকী লিখেছেন, ‘এই কালচারাল পারসেপশন দিয়াই ফ্যাসিবাদ ১৬ বছর টিকছে, ইলিয়াস আলীকে গুম করছে, বেগম জিয়াকে জেলে বন্দী করে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিছে, ব্যাংক লুট করছে ইত্যাদি। কেমনে? কালচারাল পারসেপশন, কালচারাল ফ্রেমিং, কালচারাল ন্যারেটিভই আমাদের মনের গহীন কোণে হাই-কালচার আর লো-কালচারের ধারণা তৈরি করেছে। আওয়ামী লীগ হাই-কালচার, বিএনপি লো-কালচার। ফলে বিএনপির কারো উপর অত্যাচার হইলে আমাদের মধ্যবিত্ত কালচার্ড মনকে কাঁদতে শেখানো হয় নাই। জামায়াতের কেউ নির্যাতিত হইলেও একই অবস্থা। ঠিক এই জিনিসের বরকতেই আওয়ামী লীগ ১৬ বছর ফ্যাসিবাদ চালায়া যাইতে পারছে।’
এই একপেশে সাংস্কৃতি উপলব্ধি কি টিকে যাবে? নিজের প্রশ্নে তিনি নিজেই লিখেছেন, ‘চব্বিশকে অনেকে শুধু পলিটিক্যাল ইভেন্ট হিসাবে দেখলেও আমার বিবেচনায় এটা মেইনলি কালচারাল একটা ঘটনা। চব্বিশের পর বোতলের বন্দীদশা থেকে একবার যে জাতি মুক্তি পেয়ে গেছে তারে আবার ঐ বোতলে ঢোকানো সম্ভব হবে না। ফলে যে পরিবর্তনগুলা নিকট ভবিষ্যতে আমরা দেখতেছি না, সেটা একটু দেরিতে হলেও ঘটবে। তবে তার জন্য কালচারাল ইন্ডাস্ট্রির ইকোসিস্টেমে কিছু পরিবর্তন আনতে হবে; সরকারি ও বেসরকারি দুই উদ্যোগেই।’