পচা ডিমে ‘মজার খাবার’!

মুরাদ হুসাইন
মুরাদ হুসাইন , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১১:২৮ পিএম, ১২ অক্টোবর ২০১৭
পচা ডিমে ‘মজার খাবার’!

বাজারে ভালো ডিমের সঙ্গে বিক্রি হচ্ছে পচা ডিম। রাজধানীর বিভিন্ন বেকারি, পেটিস কারখানা, পুটপাতের দোকানগুলোতে দেদারসে বিক্রি হচ্ছে পচা ও ফাটা ডিম।

ভালো-মন্দ সব ধরনের ডিম দিয়েই তৈরি হচ্ছে কেক, পুডিং, বিস্কুটসহ নানারকম সুস্বাদু খাবার। এসব খাবার শহরের ছোট-বড় দোকান, ফুটপাতের ভ্রাম্যমাণ দোকানসহ অলিগলিতে অবস্থিত ফাস্টফুডের দোকানেও সরবরাহ করা হচ্ছে। রাজধানীর বিভিন্ন কারখানা সরেজমিনে ঘুরে পচা ও ফাটা ডিম ব্যবহারের প্রমাণ মিলেছে।

রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বর বাসস্ট্যান্ডের পাশে রয়েছে তিনটি বেকারি। বেশ পুরনো এসব বেকারিতে কেক, বিস্কুট, ডিম রোল, পুডিং, পেটিস, পরোটাসহ ডিম দিয়ে বিভিন্ন খাবার তৈরি করতে দেখা যায়। প্রতিটি বেকারিতে প্রতিদিন ২৫০-৩০০ ডিম চলে।

নান্নু বেকারির কর্মচারী হায়দার আলী বলেন, আমাদের বেকারিতে ডিম দিয়ে প্রায় ২০ ধরনের খাবার তৈরি হয়। প্রতিদিন প্রায় ৩০০ ডিম চলে। তিনি আরও বলেন, প্রতিদিন ৩০০ ডিমের মধ্যে ৫০টা পচা আনা হয়। ভালো ডিমের সঙ্গে পচা ও ফাটা ডিমগুলো মিলিয়ে তারা বিভিন্ন সুস্বাদু খাবার তৈরি করেন। এতে খরচ কম হয়। বেশি লাভের জন্য আলাদাভাবে পচা ডিম কেনা হয়। পচা ডিম পিসপ্রতি এক টাকা দরে কেনা হয় বলেও জানান তিনি।

তবে এ বেকারির ম্যানেজার বাবুল মিয়া পচা ডিম কেনার বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, অনেক সময় ভালো ডিমের সঙ্গে পচা ডিমও চলে আসে। শ্রমিকরা ভুল করে তা খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে ফেলে।

খাবারে পচা ডিম ব্যবহার না করতে কঠোর নির্দেশনা দেয়া আছে বলেও জানান তিনি।

বিভিন্ন বেকারিতে কর্মরত শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে পচা ও ফাটা ডিমের ব্যবহারের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। রাজধানীতে এমন কয়েকশ বেকারি রয়েছে। এসব বেকারির উৎপাদিত খাবার রাজধানীসহ পার্শ্ববর্তী এলাকার ছোট-বড় বাজারগুলোতে সরবরাহ করা হচ্ছে।

বিভিন্ন পোলট্রি খামারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ব্রয়লার মুরগির জন্য যে ডিমে তা দেয়া হয় শতকরা ৩৫ থেকে ৪০ ভাগ পচে যায় অথবা নষ্ট হয়ে যায়। পরে সেগুলো নষ্ট করে ফেলার কথা থাকলেও খামারের অসাধু কর্মচারীরা সেগুলো খুবই কম মূল্যে বিক্রি করেন।

পচা ডিম বিক্রিতে কোনো রসিদ (ক্যাশ মেমো) দেয়া হয় না। অনেক কারখানায় সপ্তাহে এক থেকে দেড় লাখ ডিম লাগে। ওই ডিমের সঙ্গে পচাগুলো মিশিয়ে দেয়া হয়। ফলে বোঝারও কোনো উপায় থাকে না। তবে মালিকপক্ষ এগুলো জানে না। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এমন তথ্য জানা গেছে।

সম্প্রতি চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ উপজেলায় পচা ডিম বহনের অভিযোগে খোরশেদ আলম নামে এক ব্যক্তিকে ২০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।

রাজধানীর কারওয়ানবাজার ও মিরপুরসহ বেশ কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, পচা ডিমের পাশাপাশি ফাটা ডিমেরও বেশ চাহিদা রয়েছে। কারণ ফাটা ডিম দামে সস্তা। একটি ভালো ডিমের দাম যেখানে ছয়-সাত টাকা, সেখানে একটি ফাটা ডিম বিক্রি হচ্ছে দু-তিন টাকায়। এ ডিমের ক্রেতা হচ্ছেন হোটেল, রেস্তোরাঁ, বেকারি ও ফুটপাতের খাবারের দোকান মালিকরা। এসব ফাটা ও পচা ডিম দিয়ে তৈরি হচ্ছে সুস্বাদু কেক ও পুডিংসহ বিভিন্ন খাবার।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কারওয়ানবাজারের কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, মধ্যরাত থেকে ভোর পর্যন্ত এখানকার বিভিন্ন আড়তে ভাঙা ও পচা ডিম কেনার জন্য লোকজনের ভিড় লেগে থাকে। বিশেষ করে বস্তি ও ফুটপাতের টোকাইরা কম দামে এসব ডিম সংগ্রহ করে বিভিন্ন হোটেল, রেস্তোরাঁ ও ফুটপাতের দোকানে সরবরাহ করে। বেশিরভাগ নষ্ট ডিম দিয়েই সুস্বাদু পুডিং ও কেক তৈরি করা হয়।

এছাড়া বিভিন্ন হোটেলে সকালের নাস্তার মেন্যুতে ওমলেট, মামলেট, ডিমপোচ নামে যেসব ডিম ব্যবহার করা হয় সেগুলোর অধিকাংশই ফাটা বলে জানা গেছে।

এমএইচএম/একে/এমএআর/বিএ