নারীর শত্রু নারী নিজেই

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৯:০৯ এএম, ১৩ অক্টোবর ২০১৭ | আপডেট: ১২:৩৮ পিএম, ১৩ অক্টোবর ২০১৭
নারীর শত্রু নারী নিজেই

নারীবাদী কলামিস্ট হিসেবে অনলাইন মিডিয়ায় এই সময়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক জব্বার হোসেন। প্রচলিত পুরুষের ধারণাগত বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এসেছেন সাহসী মানুষ হিসেবে। তার আলোচিত বই ‘নারীর শত্রু?’ দুই বাংলা থেকে প্রকাশিত। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক নারীবাদী সংস্থা ‘দ্য ফেমিনিস্ট ডট কম’র সম্মানিত সদস্য। যৌনতা বিষয়েও রয়েছে তার গবেষণাপত্র। ইউনেস্কো জার্নালিজম অ্যাওয়ার্ড ও কানাডিয়ান জার্নালিজম অ্যাওয়ার্ডের সম্মানিত জুরিবোর্ডের সদস্য ছিলেন একাধিকবার। লেখাপড়া করেছেন দেশে, দেশের বাইরেও।

সম্প্রতি নারীবাদী এ কলামিস্টের সঙ্গে কথা হয় জাগো নিউজ’র। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সায়েম সাবু

জাগো নিউজ : আপনি নারী স্বাধীনতা, নারীর উন্নয়ন নিয়ে লিখছেন। এগিয়ে যাচ্ছে বিশ্ব, এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশও। নারীর এগিয়ে যাওয়া কীভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন?

জব্বার হোসেন : নারীর এগিয়ে যাওয়ার চিত্র আমি ইতিবাচকভাবেই মূল্যায়ন করতে চাই। আজকের এ অবস্থানে আসতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে নারীকে। ঢাকা শহরেই আমার জন্ম। ছোটবেলায় দেখতাম, একজন নারী রিকশায় উঠলে চারপাশে আলাদা কাপড় দিয়ে ঢেকে দেয়া হত। প্রায় অবরুদ্ধ হয়ে একজন নারী রাস্তায় বের হতেন।

জাগো নিউজ : এখন কী বলবেন?

জব্বার হোসেন : নারী এখন ব্যাংকে, বিমান বাহিনীতে, সচিবালয়ে, আদালতে, রাজনীতিতে, কোথায় নেই? বিশেষ করে কর্মজীবী নারীদের এগিয়ে যাওয়ার গল্পে আমি আনন্দ অনুভব করি, আশান্বিত হই। শহরে গলির মধ্যেও আজ একজন নারী ছোট্ট একটি দোকান দিয়ে চা বিক্রি করছেন। গ্রামের হাজারও নারী স্রোতের মতো এসে গার্মেন্ট শিল্পে যোগ দিচ্ছেন। গ্রামের অশিক্ষিত, অল্পশিক্ষিত মেয়েরা শহরে এসে এভাবে কর্মমুখর হয়ে উঠবেন, তা এক সময় কল্পনাও করা যেত না।

গার্মেন্টের মেয়েদের অবজ্ঞা করে, অবহেলা করে ‘গার্মেন্ট পার্টি’ বলা হয়। আমার তাতে ভীষণ আপত্তি। তাদের শ্রমেই দামি গাড়িতে চড়ছি। অর্থনীতির চাকা ঘুরছে। এমনকি গ্রাম থেকে শহরে এসে যে নারীরা ‘কাজের বুয়া’ হিসেবে কাজ করছেন, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন, উপার্জন করছেন, সে অনেক বেশি সংগ্রামী, প্রত্যয়ী। উচ্চবিত্ত দাসীদের চেয়ে গার্মেন্ট শ্রমিকরা বেশি সম্মানিত।

জাগো নিউজ : আপনি ‘উচ্চবিত্ত দাসী’ বলতে কাদের বোঝাতে চাইছেন?

জব্বার হোসেন : এরা শুধু উচ্চবিত্ত দাসী নয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমি তাদের যৌনদাসী বলতে চাই। যারা শুধুমাত্র পুরুষকে অবলম্বন করে বাঁচে। বিয়েই এই নারীদের একমাত্র জীবিকা। যাদের সারাদিন কাটে শপিং সেন্টার আর চ্যানেলে চ্যানেলে সিরিয়ালের সাজগোজ, কুচুটেপনা দেখে। এদের উৎপাদনের সঙ্গে কোনো যোগ নেই। নিজের কোনো উপার্জন নেই, অর্জন নেই। পুরুষের যৌনসঙ্গী হওয়াই একমাত্র অবলম্বন। এরা নিজেকে সম্পূর্ণ মানুষও ভাবতে পারে না। ভাবে আমি ‘মেয়ে মানুষ’। এই নারীদের চেয়ে ওই যে বললাম গার্মেন্ট, যে মেয়েরা নিজেকে মানুষ ভাবে, শ্রম করে, উপার্জন করে তারা মানুষ হিসেবে অনেক বেশি সম্মানিত।

জাগো নিউজ : নারীর এগিয়ে যাওয়ার কথা বলছেন। সমাজ এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে তুলনা করলে নারীরা আসলে কোথায় যেতে পারল?

জব্বার হোসেন : নারী-পুরুষ মিলিয়েই সমাজ। নারীর এগিয়ে যাওয়া আমি পুরুষের সঙ্গে তুলনা করতে চাই না। পুরুষের এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণত বাধা থাকে না। পুরুষ এগিয়ে যাবে, পুরুষ অর্জন করবে, তার সব কাঠামো সমাজই তৈরি করে রেখেছে। কিন্তু একজন নারী এগিয়ে যেতে চাইলে, তাকে পেছন থেকে টেনে রাখার সব বন্দোবস্তই করা হয়।

অর্থাৎ একজন নারী পুরুষের সমপথে হাঁটতে চাইলে তাকে দ্বিগুণ শক্তি প্রয়োগ করতে হয়। নারীর এগিয়ে যাওয়া সমাজের এই কাঠামো থেকেই তুলনা করতে হয়।

জাগো নিউজ : এই যে পেছন থেকে টানা অর্থাৎ নারীর শত্রু আসলে কারা?

জব্বার হোসেন : নারীর শত্রু আসলে পুরুষ নয়, মূলত পুরুষতান্ত্রিকতা। পুরুষতান্ত্রিকতাই নারীর প্রধান শত্রু। পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা শুধু যে একজন পুরুষের মধ্যেই থাকে তা নয়। কখনও কখনও নারীর মধ্যেও পুরুষতান্ত্রিকতা প্রকটভাবে থাকতে দেখা যায়।

কখনও কখনও নারী, নারীর শত্রু হয়ে ওঠে। তাকে পেছন থেকে টেনে ধরা হয়। বাধা দেয়া হয়, যাতে অন্য নারী এগিয়ে যেতে না পারে। কখনও কখনও দেখা যায়, পুরুষ সহকর্মীরা সহযোগিতাপ্রবণ। সেই তুলনায় আরেকজন নারী সহকর্মী অন্য নারী সহকর্মীর প্রতি অনেক বেশি মাত্রায় অসহযোগিতাপ্রবণ। পুরুষতান্ত্রিকতার কারণেই নারী অন্য নারীর এগিয়ে যাওয়ার বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা যায়, নারীর মধ্যে পুরুষতান্ত্রিকতার মাত্রা এত বেশি যে, সে ম্যাসোকিস্ট হয়ে ওঠে। ম্যাসোকিজমে ভোগে। পুরুষের অত্যাচার, নির্যাতন সে নির্যাতন মনে করে না। অনেক ক্ষেত্রে নারীরা স্বামীদের শোষণ, শাসন বা সুশাসন ভাবতে ভালোবাসে।

জাগো নিউজ : নারীর এমন মানসিকতা আপনাকে হতাশ করে কি না?

জব্বার হোসেন : অবশ্যই। প্রতিটি মানুষের নিজস্ব চেতনা আছে, বোধ আছে। এখানে দু’ধরনের বাধারবলয় কাজ করে। একটি সমাজ নির্মিত, তার চারপাশে হাজারও বাধা যাতে সে এগিয়ে যেতে না পারে। আরেকটি বাধা তার কেন্দ্র থেকে, নিজের মধ্য থেকে এক ধরনের বাধারবলয় তৈরি করে। নিজেকে পিছিয়ে রাখা, নিজের মধ্যে পিছিয়ে পড়ার মানসিকতা উৎপন্ন হয়। কখনও কখনও নারী আত্মঘাতী হয়। তার এই আত্মঘাত আমাকে হতাশ করে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সেমিনারে আমি বলেছিলাম, women is the enemy to herself অর্থাৎ নারীর শত্রু নারী নিজেই। অনেকে ভীষণ সমালোচনা করেছিলেন। কিন্তু ঘটনাটি অনেকাংশেই নারীর জীবনে ভয়ঙ্করভাবে সত্যি।

নারী পরনির্ভরতার জন্য নিশ্চয়তা চায়। দেখবেন, জেলখানার অনেক কয়েদি জেলে থাকতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। তারা জেলের মধ্যেই এক ধরনের সুখ- স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। থাকতে পারছে, খেতে পারছে, এটিই তাদের কাছে এক ধরনের নিরাপত্তা বলে মনে হয়। বন্দিদের মতো, অনেক নারীই এমন নিরাপত্তা বলায়ে থাকতে সুখ অনুভব করেন।

জাগো নিউজ : এমন বলয়ে থাকার জন্য শিক্ষা সচেতনতার অভাবকে দায়ী করা হয়। পশ্চিমা বিশ্বে শিক্ষায় নারীর অগ্রগতি ঘটেছে বহু আগে। কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক বলয় থেকে তো বের হতে পারল না।

জব্বার হোসেন : পুঁজিবাদ ও পুরুষতান্ত্রিকতা হাত ধরাধরি করে হাঁটে। পশ্চিমের পুঁজিবাদি কাঠাম নারীকে পণ্য হিসেবেই দেখে। সেখানেও নারী হয়ে ওঠে ‘সেলিং প্রডাক্ট’। পুঁজিবাদ পুরুষতান্ত্রিক, ফলে সেখানেও নারীর মুক্তি মেলে না। সে পতিতা হয়, পর্ন ভিডিওর মডেল হয়, সুন্দরী প্রতিযোগিতায় পোশাক খুলে দাঁড়ায়, যৌনবাণিজ্যের উপাচার হয়। পুঁজিবাদ নারীর দেহকে পণ্য করে যতটা কেনাবেচা করতে পারে, মুনাফা অর্জন করতে পারে, তার সবটুকুই করা হয়। আর ‘জেন্ডার পলিটিক্স’ দুনিয়ার সব জায়গাতেই রয়েছে। দেশ স্বাধীন হলেই বা সমাজের নিরাপত্তা বাড়লেই নারীর স্বাধীনতা মিলবে, এটি মনে করার কোনো কারণ নেই।

তবে দেশ বা স্থানভেদে আপনি নারীর মুক্তির মাপকাঠি নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন চিত্র পাবেন। স্বাধীনতা বা সচেনতার প্রশ্নে সুইডেনের একজন নারী যেভাবে মূল্যায়িত হবেন, সোমালিয়া বা সৌদি আরবের একজন নারী সেভাবে মূল্যায়িত হবেন না। নারীর প্রতি অবহেলা, অবজ্ঞা গোটা দুনিয়াতেই রয়েছে।

জাগো নিউজ : আপনি মিডিয়াতেও কাজ করছেন দীর্ঘদিন। আমাদের মিডিয়া কতটা নারীবান্ধব হতে পারল বলে মনে করেন?

জব্বার হোসেন : সারা দুনিয়াতেই মিডিয়ার প্রভু পুঁজি। মিডিয়া যতটা না নারীবান্ধব তারচেয়ে অনেক বেশি মাত্রায় পুঁজিবান্ধব। পুঁজির বন্ধু পুরুষতান্ত্রিকতা। বাণিজ্যিক স্বার্থে মিডিয়া নারীকে পণ্য করবেই। এখনও ধর্ষণের বর্ণনায় ‘উপর্যুপুরি’, ‘পালাক্রমে’, ‘রাতভর’, ‘ধর্ষিতার চিৎকার’- এই জাতীয় শব্দের ব্যবহারে খবরের কাগজে ধর্ষণকে রোমান্টিসাইজ করা হয়। পত্রিকায় ‘মেয়েদের পাতা’ মানেই রূপচর্চা আর ঘরসজ্জা। চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত কীভাবে সাজাবেন তার বিশদ বর্ণনা। টেলিভিশনে সংবাদপাঠকের চেয়ে সংবাদপাঠিকা বেশি। তথ্য চাহিদার চেয়ে পুরুষদর্শকদের অন্য চাহিদা মেটাতে মিডিয়া অধিকমাত্রায় ব্যস্ত। লিকলিকে, দাঁত উঁচু, স্তনহীন কোনো মেয়ে শত মেধাবী হলেও মিডিয়া তাকে পৃষ্টপোষকতা করে না, করে শরীর সর্বস্ব অমেধাবীদের।

মিডিয়ার ‘সাহসী মেয়ে’ মানেই খোলামেলা মেয়েদের বোঝানো হয়। যে যত কাপড় খুলতে পারে, তাকে তত বেশি সাহসী বলা হয়। সুন্দরী প্রতিযোগিতার নামে নারীদের নিয়ে যে যৌনবাণিজ্য, মিডিয়া তার পার্ট হয় নেহাত বাণিজ্যিক কারণে।

জাগো নিউজ : রাজনীতির প্রসঙ্গে আসি। রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে নারী কতটুকু স্বাধীনতা পেল?

জব্বার হোসেন : রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে নারীর অংশগ্রহণ ঠিক পুরুষের মতোই। প্রধানমন্ত্রী নারী, বিরোধীদলীয় নেত্রী নারী, স্পিকার নারী, সংসদ সদস্যদের অনেকে নারী বলেই যে রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণে গুণগত পরিবর্তন এসেছে, তা মনে করার কারণ নেই। রাজনীতির আসনে নারী, কিন্তু সিদ্ধান্ত পুরুষেরই।

জাগো নিউজ : কেন এমনটি মনে করছেন?

জব্বার হোসেন : পুরুষতান্ত্রিক সমাজে রাজনীতির গাড়ির যে চালকের আসন, তাতে নারী বসলেও পুরুষের মতোই চালাতে হয়। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের চাহিদা মাথায় রাখতে হয়, প্রাধান্য দিতে হয়। যে কারণে উত্তরাধিকার আইনে নারীর সম্পত্তির সমান অধিকারের দাবি উঠলেও তা বাস্তবায়ন হতে দেখা যায় না।

সরকার কিন্তু নারীকে সমানাধিকার দিতে পারেনি। তার মানে রাষ্ট্রও নারীর সমতা দিতে পারছে না।

জাগো নিউজ : তার মানে দৃশ্যমান পরিবর্তন নিয়ে আশাবাদী হলেও চেতনার জায়গায় হতাশা এখনও তীব্র।

জব্বার হোসেন : তা তো বটেই। চিন্তার জায়গায় নারীকে পুরুষের বেষ্টনীতেই থাকতে হয়।

জাগো নিউজ : আর এই বেষ্টনীর কারণেই নারীর প্রতি সহিংসতা?

জব্বার হোসেন : সম্প্রতি বগুড়ায় তুফান নামের যুবলীগ নেতা কর্তৃক এক তরুণী ধর্ষিত হয়। ধর্ষণের পর ওই তরুণী এবং তার মাকে অমানবিক নির্যাতনও করা হয়। ওই নির্যাতনে সহযোগিতা করেছেন তুফানের স্ত্রী এবং পরিবারের অন্যান্য নারীরাও। এই নারীরা অন্য নারীর প্রতি সম্মানবোধ ধারণ করে না বলেই এমন নির্যাতনে সহায়তা করেছে।

Jobber

জাগো নিউজ : কিন্তু এমন সভ্য সময়ে নারীর প্রতি পাশবিকতা চিন্তার জগতে আলাদা দাগ কাটে কি না?

জব্বার হোসেন : এটি হচ্ছে মানবিকতার ব্যাপার। নিম্ন পর্যায়ের মানসিকতা থেকেই মানুষ নারীকে দুর্বল জেনে নির্যাতন করে থাকে।

নারীর প্রতি সহিংসতার বেশিরভাগই ঘটে থাকে কোনো না কোনোভাবে যৌনতা কেন্দ্র করে। নারীর প্রতি সকল নির্যাতনই ঘুরেফিরে যৌন নির্যাতনে গিয়ে দাঁড়ায়। শ্লীলতাহানি, যৌন হয়রানি, ধর্ষণ, অঙ্গচ্ছেদ এমনকী মানসিক নির্যাতনও মূলত যৌনতাকে কেন্দ্র করে ঘটে থাকে। দেখবেন, নারীকে নিয়ে যত গালাগাল আছে তা সবই কোনো না কোনোভাবে যৌনতাকেন্দ্রিক।

নারীকে ভাবাই হয় সেক্সুয়াল অবজেক্ট বা যৌনপিণ্ড হিসেবে। এ কারণে নির্যাতনের সময় নারীর যৌনস্পর্শকাতর জায়গাগুলোতে টার্গেট করা হয়।

নারীর প্রতি পুরুষের সম্মান যেমন তার যৌনাঙ্গকে কেন্দ্র করে, তেমনি অসম্মানও।

জাগো নিউজ : তার মানে বিধান বা আইনের চাইতে সম্মানের বোধটাই নারী নির্যাতন বন্ধের সহায়ক?

জব্বার হোসেন : যতদিন পর্যন্ত নারীকে যৌনপিণ্ড হিসেবে দেখা হবে, ততদিন পর্যন্ত নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ হবে না। যতদিন পর্যন্ত নারীর যৌনাঙ্গ বা ভ্যাজাইনা পুরুষের মনোজগতে সম্মান-অসম্মানের মূল মানদণ্ড হিসেবে বাস করবে ততদিন পর্যন্ত নারীর প্রতি যৌন নির্যাতনও বন্ধ হবে না। শত শত আইন আছে নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে। কিন্তু বন্ধ কি হয়েছে? তার মানে নারীকে মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন না করলে, শুধু আইন করে সহিংসতা বন্ধ করা যায় না।

জাগো নিউজ : নারীর অগ্রগতির প্রসঙ্গ এলে ধর্মের প্রসঙ্গ আসে। এ ক্ষেত্রে আপনার মতামত কী?

জব্বার হোসেন : ধর্মই নারীকে পিঁছিয়ে দেয়ার একমাত্র কারণ আমি তা মনে করি না। নারীকে পিঁছিয়ে দেয়ার অনেকগুলো কারণের মধ্যে ধর্মীয় গোড়ামি একটি মাত্র কারণ হতে পারে।

ধর্মের আবির্ভাব হয়েছে বহু আগে। তখনকার প্রেক্ষাপট আর আজকের প্রেক্ষাপট এক কি না, তা আমলে নিতে হবে। আজ থেকে দুই হাজার বছর আগের সময় তো এখনকার সঙ্গে মিলিয়ে মূল্যায়ন করলে হবে না।

নারী সুযোগ পেয়েও অনেক সময় মত প্রকাশ করে না। তখন তো ধর্ম বা অন্য কাউকে দায়ী করা যায় না। সে নিজেই নিজের চিন্তার জায়গাটাকে খাটো করে রাখছে। এই জন্য পরিবর্তন চাইতে হলে সবার আগে নিজের পরিবর্তন ঘটাতে হবে। চাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধতা থাকলে কখনও পরিবর্তন আসে না। সবার আগে পরিবর্তনের উদাহরণ হতে হয় নিজেকে।

আমি যদি পরিবর্তন চাই, আমার নিজেকে আগে নিজের চিন্তার পরিবর্তন করতে হবে। জীবন যাপনের পরিবর্তন করতে হবে। আমি পরিবর্তিত হলে, পরিবর্তিত হবে চারপাশ, তার আগে নয়।

জাগো নিউজ : একই প্রসঙ্গে পর্দাকে বাধা মনে করেন কি না?

জব্বার হোসেন : প্রশ্ন হচ্ছে পর্দার ব্যাখ্যা নিয়ে। পর্দা বলতে কী বোঝাতে চান? কালো হাত মোজা, পা মোজা, চোখ-মুখ কালো কাপড়ে সম্পূর্ণ ঢেকে রাখা কখনও পর্দা হতে পারে না। সম্ভবত ধর্মও এমন পর্দার কথা বলেনি। এমন পর্দায় একজন নারীর চলাফেরায় ঝুঁকি বাড়ায়। মনের শালীনতাই হচ্ছে একজন মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় পর্দা। আমরা কেবল নারীর পর্দার প্রসঙ্গে কথা বলি। ধর্মে পুরুষেরও পর্দার বিধান রয়েছে। কিন্তু কোথাও পুরুষের পর্দা প্রসঙ্গ উচ্চারিত হতে শুনি না।

সময় বদলাচ্ছে। চিন্তার জগতও বদলাচ্ছে। নারীর পর্দা নিয়েও পরিবর্তনের ধারা আসছে।

জাগো নিউজ : অনেক নারীই পর্দা থেকে বেরিয়ে আসছেন। কিন্তু বেরিয়ে আসলেই কি স্বাধীন হতে পারছেন?

জব্বার হোসেন : এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ। অনেকেই মনে করেন, খোলামেলা পোশাক পরলেই সে আধুনিক। এটি অসম্ভব ভুল ধারণা।

স্বাধীনতা মানুষের পোশাকে নয়, স্বাধীনতা মেলে চিন্তায়। নারী বা পুরুষ নয়, চিন্তার দৈনতা থাকলে হাজারও হাল ফ্যাশনের পোশাক পরিধান করে লাভ নেই। ট্রেন্ডি পোশাক পরা মানেই সে আধুনিক, অমনটা ভাবা বোকামি। যে মানুষের মধ্যে মুক্তচিন্তা নেই, যুক্তি নেই, মানবিকতা নেই, বিজ্ঞানমনস্কতা নেই সে পিছিয়ে পড়া মানুষ। পোশাক মানুষকে আধুনিক করতে পারে না, যদি না সে চিন্তাচেতনায় আধুনিক হয়। পোশাকে খোলামেলা হলেই একজন নারীর মনের জানালা খুলে যাবে তা মনে করার কারণ নেই। আত্মবিশ্বাসের জায়গা, চিন্তার জগত প্রসারিত না হলে টিশার্ট বা জিন্স পরলেই একজন নারী স্বাধীন বা আধুনিক হতে পারেন না।

অনেক স্লিভলেস, সল্পবসনা মেয়েদের দেখেছি পার্টিতে যেতে, তারা ডিসকোতে যাচ্ছে, এর ওর বাহুলগ্ন হয়ে বেড়াচ্ছে কিন্তু ভেতরে ভেতরে ভীষণ পুরুষতান্ত্রিক, অনাধুনিক।

জাগো নিউজ : ‘নারীবাদী’ শব্দটি জনপ্রিয়তা পাচ্ছে দিন দিন। আপনি নিজেও নারীবাদী বলে প্রচার রয়েছে। তবে শব্দটি নিয়ে বিতর্কও আছে। আপনার ব্যাখ্যা কী?

জব্বার হোসেন : ‘নারীবাদী’ হিসেবে একজনের পরিচয় তুলে ধরা আসলে জরুরি কোনো বিষয় নয়। আমি মনে করি, মানুষ মানবতাবাদী হবেন।

আমি নারীর পক্ষে কথা বলি বা লিখি মানবিক জায়গা থেকে। নারীকে সবার আগে মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করে পক্ষ নেই। যেকোনো মানুষই নির্যাতনের শিকার হলে, তার পক্ষ অবলম্বন করাই হচ্ছে মানবিকতা।

সমস্যা হচ্ছে, আমরা তো নারীকে মানুষই মনে করি না। নারী ও নারীবাদকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করাই হচ্ছে সমাজের বিশেষ রীতি। এই কারণে কেউ আমাকে নারীবাদী উপাধি দিলে সাধুবাদ জানাই। তার মানে নির্যাতিত মানুষের পক্ষে আছি।

জাগো নিউজ : আপনি সাধুবাদ জানাচ্ছেন। কিন্তু নারীবাদ নিয়ে তো বিতর্কও আছে?

জব্বার হোসেন : বিতর্ক সব জায়গাতেই আছে। অসভ্যতা ও নিম্ন শ্রেণির মানসিকতার জন্যই বিতর্ক তৈরি হয়।

অনেকেই মনে করেন, পুরুষ সিগারেট খায়, মদ খায় তাহলে আমি নারীবাদী আমিও মদ খেতে পারি। পুরুষ অনেক রাত পর্যন্ত বাইরে ঘুরে বেড়ায়। তাই নারীকেও ঘুরে বেড়াতে হবে। মদ খাওয়া, সিগারেট খাওয়া নারী-পুরুষ যে কারও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, এর সঙ্গে নারীবাদের কী সম্পর্ক থাকতে পারে?

তুমি যা ইচ্ছা করতে পার তোমার নৈতিকতা, বিবেক, বোধ দ্বারা প্রাণিত হয়ে। কিন্তু পুরুষকে তুলনা করে কেন? পুরুষের খারাপ অভ্যাসকে আমলে নিয়ে প্রতিযোগিতা করে আসলে নারীবাদী হওয়ায় কোনো মুক্তি মেলে না। আমাদের তথাকথিত নারীবাদিদের মানসিক উচ্চতা শেষ পর্যন্ত ‘পুরুষ পর্যন্তই’, যা খুব দুঃখজনক।

বাহুল্য কাজগুলোর সঙ্গে তুলনা হয় বলেই ‘নারীবাদ’ নিয়ে নানা বিতর্ক সমাজে। আমি মনে করি, এই তুচ্ছ বিষয়গুলোর প্রতিযোগিতার মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসা সময়ের দাবি।

পুরুষের সমকক্ষ হওয়ার মধ্য দিয়ে নারীবাদী হওয়া যায় না। মানুষ হিসেবে নিজেকে মেলা ধরাই হচ্ছে সার্থকতা।

জাগো নিউজ : নারীর আত্মহত্যার পরিসংখ্যান বেড়ে গেছে। উচ্চশিক্ষিত বা অভিজাত ঘরের নারীরাও আত্মহত্যা করছেন। হতাশা বাড়ছে বলেই কি আত্মহত্যা বাড়ছে?

জব্বার হোসেন : ভেতরের মানুষ আর বাইরের মানুষ এক নয়। প্রচুর শপিং করছে, প্রচুর মেকাপ নিচ্ছে, ফেসবুকে সেলফি দিচ্ছে, মনে হয় খুব সুখি মানুষ, আসলে তা নয়। অন্তর্গত বেদনা ঢাকতেই তার অতিরিক্ত শপিং, মেকাপ, সঙ্গীকে নিয়ে সেলফি।

লক্ষ্য করলে দেখবেন, অনেক মডেল মেয়ে আত্মহত্যা করেছেন। এখন মনে হতেই পারে একজন মডেল অনেক বেশি খোলামেলা, র্যাম্পে হাঁটছেন অর্ধনগ্ন হয়ে, সে কেন আত্মহত্যা করছেন? সে হয়ত খোলামেলা হয়ে হাঁটছেন, কিন্তু ভেতরের দ্বান্দ্বিক পরিস্থিতি তীব্র। তার নিজের প্রতি নিজের আত্মবিশ্বাস নেই। তার বাইরের জীবন, ভেতরের জীবনের হিসাব মেলাতে পারেন না। বাইরে পোশাকি জীবন থাকলেও ভেতরে ভেতরে সে দুর্বল মানুষ। মেয়েদের বেশিরভাগ আত্মহত্যাই পুরুষকে জড়িয়ে। পুরুষ তাকে ভালোবাসল কি বাসল না, বিশ্বাস করল কি করল না, অন্য নারীর সঙ্গে জড়াল কি জড়াল না, এই বৃত্তেই তার চিন্তার জগত। এ জগত বড় দৈন। জীবনে বাঁচতে হলে আগে নিজেকে ভালোবাসতে হয়। নিজেকে নিজে না ভালোবাসলে, না সম্মান করলে, কেউ করবে না জগতে।

পুরুষ আমার জগত নয়, জীবন নয়, নিজের জীবন-জগত হতে হয় নিজেকে।

জাগো নিউজ : দুঃসহ অভিজ্ঞতা নিয়ে বেঁচে থাকার গল্পও তো আছে। মডেলরা আত্মহত্যা করেন। আবার জীবনের কলঙ্কময় অভিজ্ঞতা নিয়ে কোনো কোনো মডেল বেঁচেও থাকেন।

জব্বার হোসেন : হ্যাঁ, সমাজে এমন বেঁচে থাকার গল্পও অনেক আছে। অনেক পুরুষ তাদের একান্ত মুহূর্তগুলো ভিডিও করে রাখতে চায়। এটি এক প্রকার জিম্মি করে রাখা। এক ধরনের প্রমাণ রাখা। পুরুষরা এটি করে দুটো কারণে, একটি হচ্ছে মেয়েটি যেন চাইলেও তাকে ছেড়ে যেতে না পারে। অন্যটি হল, সে যেন মেয়েটিকে যেকোনো সময় ছেড়ে যেতে বাধ্য করতে পারে। পুরুষ সব সময় প্রেমিক নয়, প্রতারকও হয়। তার এই প্রতারকের ভূমিকাও পুরুষতান্ত্রিকতার কারণে।

জাগো নিউজ : নারীর অগ্রগতি নিয়ে আপনি নিশ্চয় আশাবাদী?

জব্বার হোসেন : সেই সমাজেই আমার জন্ম, যেখানে অহরহ ফিমেল ফিটিসাইড ঘটছে। ভ্রূণ হত্যা হচ্ছে। মাতৃগর্ভে মেয়ে ভ্রূণ, তাকে হত্যা কর। সন্তান জন্মের আগেই বাবা-মা ক্লিনিকে গিয়ে পরীক্ষা করছে। ছেলে ভ্রূণ না মেয়ে ভ্রূণ। পুরুষ হলে ভ্রূণ বাঁচিয়ে রাখার শত চেষ্টা করা হয়। নারীকে মেনে না নেয়ার এই যে প্রবণতা, তা কেবল সমাজকে পিছিয়েই রাখে। নারী আর পুরুষ হচ্ছে প্রকৃতির বৈচিত্র্যতা। নারী না বাঁচলে পুরুষের জন্মও বন্ধ হয়ে যাবে। নারী ভালো থেকে সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাবে, এগিয়ে নিয়ে যাবে পুরুষকেও। এ কারণে নারীর অগ্রগতি নিয়ে আশাবাদী হতেই হয় আমাকে।

এএসএস/এমএআর/এমএস

উচ্চবিত্ত দাসীদের চেয়ে গার্মেন্ট শ্রমিকরা বেশি সম্মানিত

মিডিয়ার ‘সাহসী মেয়ে’ মানেই খোলামেলা মেয়েদের বোঝানো হয়

চিন্তার জায়গায় নারীকে পুরুষের বেষ্টনীতেই থাকতে হয়