চীন-ভারত যুদ্ধ, সেরকম কোনো শঙ্কায় ভুগতে রাজি নই আমি

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮:০৯ পিএম, ০২ জুলাই ২০২০

আলতাফ পারভেজ। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাস বিষয়ক গবেষক। লিখছেন রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক নানা প্রসঙ্গ নিয়ে। ভারত-চীন সীমান্ত উত্তেজনা নিয়ে মুখোমুখি হন জাগো নিউজ’র। গুরুত্বারোপ করেন দেশ দুটির সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়েও।

‘ভারতের সঙ্গে আমাদের ইস্যু হলো পানি, সীমান্ত হত্যা, বাণিজ্যিক ভারসাম্যহীনতা ইত্যাদি। আর চীনের সঙ্গে হলো প্রধানত বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও সামরিক সহযোগিতা। উভয় দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ঢাকার জন্য খুবই জরুরি। কোনোদিকে হেলে পড়ার সুযোগ নেই। সেটা হবে ঝুঁকিপূর্ণ’— মত দেন এই বিশ্লেষক। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সায়েম সাবু।

জাগো নিউজ : লাদাখে ভারত-চীনের মধ্যকার সংঘর্ষের উত্তাপ বাংলাদেশেও। এমন উত্তেজনার মধ্যেই চীনে বাংলাদেশে পাঁচশর অধিক পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশের অনুমতি পেল, যে সুযোগ ভারতের গণমাধ্যম ‘খয়রাতি’ বলেও উল্লেখ করেছে। এ বিষয়ে আপনার কোনো পর্যবেক্ষণ আছে কি-না?

আলতাফ পারভেজ : ভারত ও চীনের মধ্যকার সীমান্ত বিরোধ, উত্তেজনা এবং সংঘর্ষের উত্তাপ বাংলাদেশেও সরাসরি পড়েছে বা পড়বে বলে আমার মনে হয় না। এখানে বাংলাদেশের সরাসরি কোনো স্বার্থ নেই। আর চীন বাংলাদেশকে কিছু পণ্যে যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিয়েছে বলে ঘোষণা দিয়েছে তার সঙ্গে এই ভারত-চীন সীমান্ত উত্তেজনার কোনো সম্পর্ক আছে বলেও মনে করি না।

এটা এলডিসি ক্যাটাগরিতে (স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা) হয়েছে। বাংলাদেশ ভারত ও চীন উভয় দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক ভারসাম্যহীনতার স্বীকার। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা হচ্ছে। এর মাঝে ১৩ বিলিয়নই তো আমদানি। এমন ভারসাম্যহীনতা কমাতে বাংলাদেশ বহুদিন ধরে চেষ্টা করছে। চীনের পদক্ষেপ সেই চেষ্টারই অংশ মনে করছি। আর ভারতীয় একটা পত্রিকা চীনের এই পদক্ষেপ সম্পর্কে যে মন্তব্য করেছে, সেটা তাদের একান্ত নিজস্ব। তাদের এই মন্তব্যের সঙ্গে আমাদের একমত হওয়ার প্রশ্ন উঠবে কেন?

althaf-parvej-03

পত্রিকাটি কি খুব প্রভাবশালী কিছু? এটাকে এত গুরুত্ব দেয়ার পক্ষে নই আমি।

জাগো নিউজ : বলা হচ্ছে, ভারত ও চীনের সঙ্গে কৌশলী সম্পর্ক রেখে শেখ হাসিনার সরকার বিশেষ মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন, যা পূর্বে দেখা যায়নি। এই ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কে ফাটল ধরার শঙ্কা আছে কি-না?

আলতাফ পারভেজ : বাংলাদেশের বর্তমান সরকার এখন পর্যন্ত বেইজিং ও নয়াদিল্লী— কাউকে আহত বা দুঃখিত করার মতো গুরুতর কিছু করেছে বলে তো শোনা যায়নি। উভয় দেশ থেকেই বাংলাদেশের অনেক কিছু পাওয়ার রয়েছে। সেগুলো বাংলাদেশ ন্যায়ত পেতে চাইছে। যেমন- বিশেষভাবে ভারতের কাছ থেকে পানি এবং চীনের তরফ থেকে রোহিঙ্গা বিষয়ে কূটনীতিক সহায়তা। এই উভয় ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রত্যাশা হয়তো মেটেনি। কিন্তু তারপরও বাংলাদেশ প্রত্যাশা রেখে যাচ্ছে।

কিন্তু বাংলাদেশ কোনো দেশের সঙ্গেই সম্পর্ক খারাপ করার মতো গুরুতর কিছু করেনি। কোনো দেশের সঙ্গেই সম্পর্কে ফাটল ধরার মতো কিছু ঘটেনি। এখন পর্যন্ত অন্তত।

জাগো নিউজ : বাংলাদেশ সরকার ক্রমে চীনের দিকে ঝুঁকে পড়ছে বলে বিশ্লেষকদের অভিমত। এর কোনো ব্যাখ্যা আছে কি-না আপনার কাছে?

আলতাফ পারভেজ : বিশ্লেষকরা ঠিক কী দেখে এই অভিমত দিচ্ছেন বুঝতে পারছি না। আপনার উপরের প্রশ্নেই রয়েছে বাংলাদেশ চীন-ভারত উভয়ের সঙ্গে বেশ ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক রাখতে পেরেছে, এখন পর্যন্ত। এই দুই বৃহৎ প্রতিবেশীর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কটা ঐতিহাসিকভাবেই কিছুটা দুই রকম। ভারতের সঙ্গে ইস্যুগুলো এবং চীনের সঙ্গে ইস্যুগুলো মোটাদাগে একরকম নয়।

althaf-parvej-03

ভারতের সঙ্গে আমাদের ইস্যু হলো পানি, সীমান্ত হত্যা, বাণিজ্যিক ভারসাম্যহীনতা ইত্যাদি। আর চীনের সঙ্গে হলো প্রধানত বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও সামরিক সহযোগিতা। উভয় দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ঢাকার জন্য খুবই জরুরি। ফলে কোনোদিকে হেলে পড়ার সুযোগ নেই। সেটা ঝুঁকিপূর্ণ হবে।

তবে উভয় দেশই বাংলাদেশকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে প্রত্যাশিত সহযোগিতা করেনি বলে ধারণা তৈরি হয়েছে আন্তর্জাতিকভাবে।

জাগো নিউজ : উন্নয়ন, অর্থনীতির প্রশ্নে যদি চীনকেই গুরুত্ব দেয়া হয়, তাহলে ভারত কীভাবে দেখবে?

আলতাফ পারভেজ : আমার মনে হয়, বাংলাদেশের যে ভৌগলিক অবস্থান এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষুধা, তাতে কোনো বিশেষ দেশকে গুরুত্ব দেয়া দুরূহ। যেমন ধরুন, আমাদের রফতানি সম্পর্কের জন্য ইউরোপ-আমেরিকা গুরুত্বপূর্ণ। আবার আন্তঃনদীর পানির হিস্যার জন্য ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে, বিদেশি বিনিয়োগ ও সামরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে রয়েছে ঐতিহাসিক সুসম্পর্ক। এই ত্রিমুখী সম্পর্কের আরও উন্নয়ন দরকার। বাংলাদেশের সামনে চ্যালেঞ্জ হলো- ভারসাম্য রক্ষা করে ত্রিমুখী সম্পর্কই এগিয়ে নেয়া। তবে, অবশ্যই সেটা দুরূহ হয়ে উঠবে। কারণ আমেরিকা-চীন দ্বন্দ্ব এবং ভারত-চীন দ্বন্দ্ব বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য সকলের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক রাখা অপেক্ষাকৃত কঠিন করে তুলতে পারে। এটা একটা পরীক্ষা।

althaf-parvej-03

ক্ষুদ্র দেশ হিসেবে বাংলাদেশ কোনো বিশেষ দিকে হেলে পড়লে অন্যরা সেটা ভালোভাবে যে নেবে না, তা বলাই বাহুল্য।

জাগো নিউজ : সম্প্রীতি ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রাখতে বাংলাদেশে মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়। এর কোনো ব্যাখ্যা থাকতে পারে?

আলতাফ পারভেজ : দেখুন, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে মানববন্ধন করে কোনো দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়ন হয় না। ব্যাপারটা ঘটে আলোচনার টেবিলে। দেয়া-নেয়ার মনোভাবের মাধ্যমে। সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য ইতিবাচক একটা পরিস্থিতি দরকার হয়।

ভারতের সঙ্গে আলোচনার টেবিলে বাংলাদেশের যেসব চাওয়া রয়েছে সেগুলোর ন্যায়সঙ্গত সমাধান হলে, একইভাবে ভারতের যেসব চাওয়া আছে সেসব পূরণ হলে উভয় দেশের সম্পর্ক এমনিতেই অটুট থাকবে, বিকশিত হবে। অতি-উৎসাহী আচরণের কিছু নেই এখানে। বাংলাদেশকে কেবল কোনো বিশেষ একটি দেশ নয়, অঞ্চলগতভাবে এবং আন্তর্জাতিকভাবে সকলের সঙ্গেই সম্পর্ক অটুট রাখতে হবে। অটুট রাখলেই হবে না, সেটাকে বিকশিতও করতে হবে।

কোনো এক দেশের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক আর অন্যদের উপেক্ষা করা তো বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হবে। বিশ্বে যখনি কোনো ক্ষুদ্র দেশ আন্তর্জাতিক সম্পর্কে একমুখী হয়েছে, দীর্ঘমেয়াদে তারা অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়েছে। বাংলাদেশের বিপুল স্বার্থ রয়েছে ইউরোপ-আমেরিকায়, মধ্যপ্রাচ্যে, চীনে এবং অবশ্যই দক্ষিণ এশিয়াতেও। আমাদের নির্মোহভাবে খোলা চোখে দৃশ্যটি দেখতে হবে।

althaf-parvej-03

জাগো নিউজ : নেপাল চীনের করিডোরে গেল। ভুটান ভারতে চাষের পানি বন্ধ করে দিল। আসলে ভারতকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ এশিয়ায় কী ঘটতে যাচ্ছে?

আলতাফ পারভেজ : নেপাল ‘চীনের করিডোরে গেল’ বলে আমার মনে হচ্ছে না। জাতীয় স্বার্থে কোনো দেশ কোনো অবস্থান নিলেই সেটা অন্য দেশের করিডোরে যাওয়া হতে পারে না। আমার মনে হয়, সীমান্ত সমস্যা নিয়ে ভারতের বিপরীতে নেপালের অবস্থান নিয়ে ব্যাপক আলোচনার দরকার এবং সেটা হতেই হবে। আমাদের একটা বিষয় মনে রাখতে হবে, প্রতিবেশী পাল্টানো যায় না।

নেপাল ও ভারতের মাঝে কেবল সীমান্ত নয়, বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক বিপুল সম্পর্ক রয়েছে। এটা একদিনে উল্টে দেয়া যাবে না। আবার চীনও নেপালের প্রতিবেশী। তবে চীন-ভারত উত্তেজনার একটা ছাপ নেপালের রাজনীতিতে পড়ছে বলে মনে হয়। এটার একটা ঐতিহাসিক কারণও আছে। নেপাল একটা স্থল-বেষ্টিত দেশ হিসেবে অতীতে ভারতের অবরোধের শিকার হয়ে বিস্তর কষ্ট ভোগ করেছিল। সেই স্মৃতি নেপালীদের হয়তো ক্ষুব্ধ করে রেখেছে। তবে এও মনে রাখতে হবে, ভুটানের সঙ্গে এবং নেপালের সঙ্গে ভারতের যে ‘ঐতিহাসিক সম্পর্ক’, সেটা সহজে ভারসাম্যপূর্ণ হয়ে যাবে বলে মনে হয় না। তবে তার একটা স্থানীয় তাগিদও হয়তো গড়ে উঠতে পারে। এর ফলে যেটা বলা যায়, দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে আগামী এক দশক হয়তো আমরা কিছু বেদনাময় ও কৌতূহল উদ্দীপক ঘটনাবলীর মধ্য দিয়ে যাব। সকলেরই তাই সতর্ক পর্যবেক্ষণ থাকতে হবে পরিস্থিতির ওপর।

জাগো নিউজ : ভারত-চীনের মধ্যকার যুদ্ধের আশঙ্কা আদৌ গুরুত্ব পায় কি-না?

আলতাফ পারভেজ : আমি সেরকম কোনো শঙ্কায় ভুগতে রাজি নই। এটা এত ধ্বংসাত্মক কিছু যা স্বাভাবিক বুদ্ধি-বিবেচনাসম্পন্ন কোনো নেতৃত্ব অনুমোদন করবে বলে মনে হয় না। তবে উভয় দেশে জাতীয়তাবাদের একটা ঢেউ বইয়ে দেয়ার চেষ্টা আছে। আন্তর্জাতিক ইন্ধনও আছে এক্ষেত্রে। এর ফল হতে পারে আত্মঘাতী। এটা উভয় দেশের নেতৃত্বের ওপর কালে কালে চাপ তৈরি করবে সংঘাতে জড়াতে। আসলে যুদ্ধ হয় তখন-ই যখন রাজনীতি আর পথ দেখাতে পারে না। ভারত ও চীনে এবং দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে যদি রাজনীতির বর্তমান ধারা বাড়তি গতি পায় তাহলে সেটা ক্ষতিকর হবে।

জাতীয়তাবাদ দেশগুলোকে সহযোগিতার আবহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে। আপাতত কিছু কিছু রাজনীতিবিদ এ থেকে ফায়দা নিচ্ছেন। কিন্তু এটা বুমেরাং হয়ে যাবে। জনগণের মনে জাতিবাদী উগ্রতা তৈরি করে তার খোরাক যোগাতে গেলেই সমূহ সর্বনাশ ঢেকে আনা হবে। এরকম কিছু এমন অকল্পনীয় ক্ষতির ইঙ্গিত দেয় যা ভাবতে প্রস্তুত নই আমি।

এএসএস/এমএআর/জেআইএম

কিন্তু বাংলাদেশ কোনো দেশের সঙ্গেই সম্পর্ক খারাপ করার মতো গুরুতর কিছু করেনি। কোনো দেশের সঙ্গেই সম্পর্কে ফাটল ধরার মতো কিছু ঘটেনি। এখন পর্যন্ত অন্তত

আমেরিকা-চীন দ্বন্দ্ব এবং ভারত-চীন দ্বন্দ্ব বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য সকলের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক রাখা অপেক্ষাকৃত কঠিন করে তুলতে পারে

বাংলাদেশকে কেবল কোনো বিশেষ একটি দেশ নয়, অঞ্চলগতভাবে এবং আন্তর্জাতিকভাবে সকলের সঙ্গেই সম্পর্ক অটুট রাখতে হবে

বাংলাদেশের বিপুল স্বার্থ রয়েছে ইউরোপ-আমেরিকায়, মধ্যপ্রাচ্যে, চীনে এবং অবশ্যই দক্ষিণ এশিয়াতেও। আমাদের নির্মোহভাবে খোলা চোখে দৃশ্যটি দেখতে হবে

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]