গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ গড়ে ওঠেনি সাধারণ মানুষের মধ্যেও

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৯:৪৫ পিএম, ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১

ড. বদিউল আলম মজুমদার। নির্বাচন বিশেষজ্ঞ। সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)। দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রসঙ্গ নিয়ে মুখোমুখি হয়েছেন জাগো নিউজের।

প্রতীকের মধ্য দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হওয়ায় রাজনৈতিক সংকট আরও বাড়ছে বলে অভিমত তার। রাজনৈতিক সঙ্কটের কারণে নাগরিক অধিকার সংকুচিত হচ্ছে, এমনটিও মনে করেন তিনি। দুই পর্বের সাক্ষাৎকারের আজ থাকছে প্রথমটি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সায়েম সাবু।

জাগো নিউজ: দলীয় প্রতীকের মধ্য দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন ব্যবস্থার পাঁচ বছর পেরিয়েছে। প্রতীক নিয়ে শুরুতে নানা আলোচনা-সমালোচনা ছিল। কেমন পর্যবেক্ষণ করছেন এখন?

ড. বদিউল আলম মজুমদার: আগে প্রতীক ছিল না বটে। কিন্তু দলীয় সমর্থনের মধ্য দিয়েই স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো হয়ে আসছিল। কারণ আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো তো আর নীতি-নৈতিকতার তোয়াক্কা করে না।

২০১৫ সালের মন্ত্রিসভায় যখন দলীয় প্রতীকে স্থানীয় নির্বাচনের সিদ্ধান্ত হয়, তখন অনেকেই এর পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান নেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে বহু আগে থেকেই এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে আসছি। আবার অনেকেই এ সিদ্ধান্তের পক্ষে সোচ্চার ভূমিকা রেখেছেন।

জাগো নিউজ: যারা পক্ষে ছিলেন, তাদের যুক্তি কী ছিল?

বদিউল আলম মজুমদার: প্রতীকের মধ্য দিয়ে নির্বাচন হলে দলের মধ্যে শৃঙ্খলা ফিরবে। এতে করে যারা নির্বাচিত হবেন, তারা সদাচরণ করবেন, অন্যায় আচরণ থেকে বিরত থাকবেন। দুর্নীতিও কম করবেন।

জাগো নিউজ: বাস্তবে কী ঘটল?

বদিউল আলম মজুমদার: বাস্তবে পুরো উল্টো দেখলাম। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে শৃঙ্খলা বলতে কিছু নেই। গণতন্ত্র নেই। জবাবদিহি নেই। এ কারণেই স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় শৃঙ্খলা আরোপিত হয়নি। বরং দলের শক্তি নিয়েই নির্বাচনে অপকর্ম করার বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে।

সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হলে প্রার্থীর সংখ্যা কমে যায়। প্রার্থীর সংখ্যা কম হওয়া মানেই অপেক্ষাকৃত কম যোগ্যতাসম্পন্ন প্রার্থী জয়ী হবেন। বিতর্কিত নির্বাচিত হচ্ছে। মানের অবনতি ঘটছে।

সবচেয়ে ক্ষতি হলো, এর মধ্য দিয়ে মনোনয়ন বাণিজ্য ব্যাপকতা লাভ করেছে। আমাদের নির্বাচন ব্যবস্থা তো এখন নিরপেক্ষ নয়। সুষ্ঠু নির্বাচন এখন বহুলাংশেই কল্পনার বাইরে। সরকারি দলের যারা মনোনয়ন পান, তারা নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার সব সুবিধা পেয়ে থাকেন। এ কারণেই যে কোনো উপায়ে মনোনয়ন পেতে মরিয়া হয়ে পড়েন সরকারদলীয় রাজনীতিকরা। মনোনয়ন বাণিজ্যের ব্যাপকতার কারণে পুরো প্রতিষ্ঠানই কলুষিত হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন প্রতিষ্ঠানগুলোকে কলঙ্কিত করে ফেলেছে।

jagonews24

জাগো নিউজ: প্রতীক তো আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। আগে থেকেই তো দলীয় সমর্থনে নির্বাচন হয়ে আসছিল।

বদিউল আলম মজুমদার: দলের সমর্থন আর প্রতীকের মধ্য দিয়ে সমর্থন আলাদা বিষয়। প্রতীকের মধ্য দিয়ে নির্বাচন হওয়া মানেই সরকারি দলের প্রার্থীকে যে কোনো উপায়ে জিতিয়ে দেয়া হবে। কারণ প্রশাসনে চরমমাত্রায় পক্ষপাতদুষ্ট এখন। আগে সমর্থন থাকলেও এমন পক্ষপাতিত্ব দেখাতো না।

দলীয় প্রতীকের মাধ্যমে এ নির্বাচন হলে দলবাজি-মারামারি একেবারে তৃণমূল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। যেটি পাশের দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গে দেখা গেছে।

আমাদের এখানে বিরোধী দল আর শক্ত অবস্থানে নেই। তারা মাঠে নেই। একেবারেই কোণঠাসা। এ কারণেই দলগুলো নিজেদের মধ্যে মারামারিতে লিপ্ত হচ্ছে। এখন দেখবেন আওয়ামী লীগ নিজেদের মধ্যে মারামারি, খুনো-খুনি করছে। এটি হচ্ছে ফায়দাভিত্তিক রাজনীতির কারণেই। কারণ যে কোনো উপায়ে নির্বাচিত বা একটি পদ ধারণ করতে পারলেই ফায়দা হাসিল করা যায়।

জাগো নিউজ: নিশ্চিত করে বলতে গেলে কী বলবেন? প্রতীকে স্থানীয় নির্বাচন আশীর্বাদ নাকি অভিশাপ হলো?

বদিউল আলম মজুমদার: প্রতীকের মাধ্যমে স্থানীয় নির্বাচন আশীর্বাদ হয়েছে, এটি অন্তত আমি মনে করি না। প্রতীক দিয়ে স্থানীয় নির্বাচনে ভয়াবহ সঙ্কট তৈরি করা হয়েছে। এটি আমাদের জন্য কাল হয়েও দাঁড়াতে পারে।

জাগো নিউজ: ‘কাল’ হয়ে দাঁড়াতে পারে...

বদিউল আলম মজুমদার: কোনো দিন যদি বিরোধী দল শক্তিশালী হয়, তাহলে ভাবুন পরিস্থিতি কী হতে পারে। এক সংসদ সদস্যকে (এমপি) তো দেখলাম তিনি লাঠি ব্যবহার করার কথা বলেছেন। যদি বিরোধী দল একই হুমকি দেয়ার ক্ষমতা অর্জন করে।

জাগো নিউজ: আজকের এই পরিস্থিতি সাময়িকও হতে পারে। রাজনৈতিক সহাবস্থানের পরিবেশ তৈরি হলে সংকট কেটে যাবে...

বদিউল আলম মজুমদার: উল্টোও হতে পারে। সহাবস্থানের কোনো লক্ষণ নেই। বরং বিরোধী দল শক্তিশালী হলে সংকট আরও তীব্র হবে।

jagonews24

জাগো নিউজ: সঙ্কটের এই ‘কালো মেঘ’ কাটবে না?

বদিউল আলম মজুমদার: কালো মেঘ কেটে যাওয়ার সম্ভাবনা খুব ক্ষীণ। নিয়মতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতার রদবদল আপনি কল্পনা করতে পারেন? সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশ অদূর ভবিষ্যতে আশা করা যায় না। নির্বাচনী ব্যবস্থা ভেঙে গেছে এবং এটি আর জোড়া লাগানোর লক্ষণ দেখছি না। এ নির্বাচন কমিশন থেকে আপনি নিরপেক্ষ কোনো আচরণ প্রত্যাশা করতে পারেন না।

সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সাধারণ মানুষের মধ্যেও গড়ে ওঠেনি।

জাগো নিউজ: এর জন্য তো নাগরিক প্রতিনিধিদেরও দায় আছে?

বদিউল আলম মজুমদার: অবশ্যই। প্রশ্ন হচ্ছে, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা কি কাজ করার পরিবেশ পাচ্ছেন? এক সময় নাগরিক সমাজ বাংলাদেশে খুব শক্তিশালী ছিল। বিপর্যয় ঘটল ১৯৯১ সালের পর থেকেই ফায়দাতন্ত্রের কেন্দ্রে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরাও অবস্থান করতে থাকলেন। রাজনৈতিক আবরণেই নাগরিক সমাজ, সাংবাদিকদের ক্রমাগতভাবে বিভাজিত করে ফেলেছি। শিক্ষক, আইনজীবী, চিকিৎসক, এমনকি আমলাদেরও রাজনৈতিকভাবে আমরা বিভাজিত করে ফেলেছি। এ বিভাজনের কারণেই নাগরিক সমাজ দুর্বল থেকে দুর্বল হয়ে পড়ছে। বিভিন্ন আইন এবং বিধিনিষেধের কারণে কথা বলার স্বাধীনতা সংকুচিত হয়ে পড়ছে।

জাগো নিউজ: আপনারাও যারা কথা বলছেন, তারাও কোনো না কোনো পক্ষের, এ অভিযোগও আছে!

বদিউল আলম মজুমদার: অভিযোগ আছে। কিন্তু ঢালাও অভিযোগ সত্য নয়। আমরা জনগণের জন্য কথা বলি। দেশের জন্য কথা বলি। দিন দিন এমন কথা বলার মানুষের সংখ্যা কমে যাচ্ছে।

নির্দলীয় নাগরিক সমাজের কাজই হচ্ছে ক্ষমতাসীন দলের ভুলগুলোর সমালোচনা করা। প্রশংসা করা নয়। প্রশংসা করার জন্য সরকারের জনসংযোগ বিভাগ আছে। বিএনপি-জামায়াত যখন ক্ষমতায় ছিল, তখন আমরা তাদের ভুল কাজের কঠোর সমালোচনা করেছি। ভোটার তালিকা এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে বিএনপির কারসাজির তীব্র বিরোধিতা করেছি। বিএনপির দুর্নীতি নিয়ে আমরা সবচেয়ে সোচ্চার অবস্থান নিয়ে কথা বলেছি। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের অন্যায়েরও সমালোচনা করছি।

এএসএস/এইচএ/জেআইএম

সরকারি দলের যারা মনোনয়ন পান, তারা নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার সব সুবিধা পেয়ে থাকেন। এ কারণেই যে কোনো উপায়ে মনোনয়ন পেতে মরিয়া হয়ে পড়েন সরকারদলীয় রাজনীতিকরা

এই নির্বাচন কমিশন থেকে আপনি নিরপেক্ষ কোনো আচরণ প্রত্যাশা করতে পারেন না

বিভাজনের কারণেই নাগরিক সমাজ দুর্বল থেকে দুর্বল হয়ে পড়ছে। বিভিন্ন আইন এবং বিধিনিষেধের কারণে কথা বলার স্বাধীনতা সংকুচিত হয়ে পড়ছে

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]