ইউনাইটেড এয়ারের ফ্লাইটে অনিশ্চয়তা : বিপাকে বিনিয়োগকারীরা


প্রকাশিত: ০৪:০০ এএম, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের ফ্লাইট চলাচল বন্ধ আছে দীর্ঘ দিন ধরেই। ফলে কোম্পানিটির শেয়ার দর তলানিতে নেমে এসেছে। ফ্লাইট চলাচল কবে নাগাদ শুরু হবে তা স্পষ্ট করে জানাতে পারেনি কোম্পানিটি। এতে প্রতিষ্ঠানটির শেয়ার নিয়ে বিপাকে পড়েছেন বিনিয়োগকারীরা।

ফ্লাইট কার্যক্রম বন্ধ থাকায় কোম্পানিটির শেয়ার চলতি মাসের ৬ সেপ্টেম্বর ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নামিয়ে আনে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) কর্তৃপক্ষ। এর ফলে শেয়ার লেনদেনের সময় বিনিয়োগকারীরা কোনো মার্জিন ঋণ পাবেন না।

জানা গেছে, ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের সব ফ্লাইট গত ৫ মার্চ থেকে বন্ধ রয়েছে। ফ্লাইট বন্ধ থাকার খবর প্রকাশ পাওয়ার পর থেকে শেয়ার দর পতন হতে থাকে। যা অভিহিত মূল্যের নিচে নেমে গেছে।

গত দুই বছরের লেনদেন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, কোম্পানিটির শেয়ার দর ৪ টাকা ৪০ পয়সা থেকে ১২ টাকায় ৮০ পয়সায় ওঠা নামা করছে। সর্বশেষে রোববার (২৫ সেপ্টম্বর) দর ৪ টাকা ৫০ পয়সায় দাঁড়িয়েছে।

ফ্লাইট চালুর বিষয়ে ইউনাইটেড এয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ক্যাপ্টেন তাসবিরুল আহমেদ চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, অর্থ সংকটের কারণে সব ফ্লাইট ও কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। তবে কবে থেকে ফ্লাইট চালু হবে তা বলা যাবে না। কারণ এটি শেয়ারের প্রাইজ সেনসিটিভ বিষয় (মূল্য সংবেদনশীল তথ্য)। কোম্পানির সার্বিক তথ্য পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসিকে প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
 
এদিকে ফ্লাইট বন্ধ থাকলেও গত ১ জুন কোম্পানিটিকে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি প্লেসমেন্ট ও বন্ড ইস্যু করে ৬২৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা মূলধন সংগ্রহের অনুমোদন দিয়েছে। এর মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের নিকট থেকে প্লেসমেন্ট শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে ৪০০ কোটি ৮০ লাখ টাকা সংগ্রহ করবে কোম্পানিটি। বাকি ২২৪ কোটি টাকা বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে সংগ্রহ করবে।

প্রাইভেট প্লেসমেন্টের মাধ্যমে প্রাপ্য শেয়ার সুইফট এয়ার কার্গো পিটিই লিমিটেডের ক্ষেত্রে তিন বছর লক ইন (বিক্রি বা হস্তান্তর নিষেধাজ্ঞা), ফনিক্স এয়ারক্রাফট লিজিং পিটিই লিমিটেড এবং টিএসি এভিয়েশনের নিকট এক বছর করে লক ইন থাকার কথা উল্লেখ করে দেয় কমিশন।

উত্তোলিত অর্থ দিয়ে বিমান ক্রয় এবং এ সংক্রান্ত বর্তমান দায় পরিশোধ করার কাজে ব্যয় করবে প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু কোম্পানির পক্ষ থেকে ৫ জুন লক-ইন ইস্যুতে বিএসইসির কাছে আবেদন করেছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিনিয়োগ প্রত্যাহারের সুযোগ চায় বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
 
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইউনাইটেড এয়ার পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর থেকে বিভিন্ন ধরনের তালবাহানা শুরু করেছে। তারা বিনিয়োগকারীদের অর্থ হাতিয়ে নিলেও নানা কৌশলে শেয়ারের দর প্রভাবিত করে উচ্চ দরে কোম্পানিটির উদ্যোক্তারা তাদের শেয়ার বিক্রি করে দিয়েছে। এভাবে তারা উচ্চ মুনাফাসহ তাদের বিনিয়োগ তুলে নেয়। তাই লক-ইনের মেয়াদ কমলে স্বল্পতম সময়ে নতুন ইস্যু করা শেয়ারও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে কৌশলে উচ্চ দরে বিক্রি করে বাজার থেকে বের হয়ে যেতে পারবে বিদেশি কোম্পানিটি। এ কারণে লক ইন সময় কমানোর আবেদনকে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের টাকা হাতিয়ে নেয়ার ছক বলে মনে করছেন তারা।
 
বিনিয়োগকারী আলি হোসেন বলেন, আসলে কোম্পানিটি আইপিও’র মাধ্যমে সংগ্রহ করা টাকা ব্যবহার করে লন্ডন, জেদ্দা, সিঙ্গাপুর, কুয়ালালামপুর, কাঠমান্ডু, গ্যাটউয়িক, ম্যানচেস্টার, বার্মিংহামে ফ্লাইট চালুর কথা ছিল। এর মধ্যে লন্ডন ফ্লাইট চালু হলেও আবার বন্ধ হয়ে যায়। কাঠমান্ডু ও কুয়ালালামপুর ছাড়া আর কোনো ফ্লাইটই চালু করতে পারেনি এয়ারওয়েজটি। পরে রাইট শেয়ার ইস্যু করে কিছু দেশে ফ্লাইট চালু করেছিল প্রতিষ্ঠানটি।

কিন্তু বাজার থেকে অর্থ নিয়ে কোম্পানিটি ঋণ পরিশোধ ও ব্যবসা সম্প্রসারণ করলেও বিনিয়োগকারীদের ভালো কোনো ধরনের মুনাফা বা লভ্যাংশ দিতে পারেনি। তালিকাভুক্তির পর বিভিন্ন ইস্যুতে একাধিকবার ফ্লাইট বন্ধ ছিল ইউনাইটেড এয়ারের। এতে শেয়ার দরে প্রভাব পড়েছে। যার কারণে বর্তমানে কোম্পানির শেয়ার দর ফেস ভ্যালুর নিচে নেমে গেছে। ভবিষ্যতে এ শেয়ার থেকে বিনিয়োগকারীরা ক্ষতির আশঙ্কাই করছে বলে জানান তিনি।

বিনিয়োগকারীর তোহিদুজ্জামান বলেন, আসলে ইউনাইটেডের ফ্লাইট কবে চালু হবে তার কোনো খবর কেউ দিতে পারছে না। এ কোম্পানির শেয়ার কিনে আমরা বিপদে আছি। তবে লাভের মধ্যে আছে কোম্পানির পরিচালকরা। তাদের হাতে খুব কম শেয়ার আছে বলে জানান তিনি।
 
সর্বশেষ গত ৩১ আগস্ট ডিএসইর ওয়েবসাইটে দেয়া তথ্য মতে, কোম্পানির মোট শেয়ারের মধ্যে পরিচালকরা ধারণ করছেন ৫ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা ১৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিযোগকারীরা ধারণ করছেন ৭৭ দশমিক ৫৫ শতাংশ শেয়ার।
 
ডিএসইকে দেয়া তথ্য থেকে জানা গেছে, কোম্পানিটির মোট লোন ২৯৪ কোটি ৭২ লাখ টাকা। এর মধ্যে শর্ট টার্ম লোন আছে ১১৮ কোটি ৩৫ লাখ টাকা এবং লং টার্ম লোন আছে ১৭৬ কোটি ৩৭ লাখ টাকা।

জানা গেছে, ২০১০ সালে পুঁজিবাজারে এক কোটি শেয়ার ছেড়ে ১০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করে ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ। তালিকাভুক্তির পরের বছর ২০১১ সালে কোম্পানিটি রাইট শেয়ার ইস্যু করে পুনরায় বাজার থেকে অর্থ উত্তোলন করে। ওই বছর প্রতিষ্ঠানটির প্রতিটি সাধারণ শেয়ারের বিপরীতে বিনিয়োগকারীদের একটা রাইট শেয়ার ইস্যু করা হয়। ১০ টাকা ফেসভ্যালুর সঙ্গে ৫ টাকা প্রিমিয়ামসহ প্রতিটি শেয়ারের মূল্য ধরা হয় ১৫ টাকা। তখন কোম্পানিটি ২১ কোটি রাইট শেয়ার ইস্যু করে ৩১৫ কোটি টাকা পুঁজিবাজার থেকে সংগ্রহ করে। অথচ তালিকাভুক্তির পর থেকে বিনিয়োগকারীদের কোনো ধরনের ক্যাশ লভ্যাংশ প্রদান করেনি প্রতিষ্ঠানটি। সব সময়ই ইউনাইটেড এয়ার বোনাস শেয়ার লভ্যাংশ দিয়ে আসছে।

এসআই/এআরএস/পিআর