শেয়ারবাজারে নানা গুঞ্জন


প্রকাশিত: ০৮:৫৩ এএম, ২৯ জানুয়ারি ২০১৭

নানা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে দেশের শেয়ারবাজারে। এর মধ্যে সব থেকে বেশি গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে, ২০১৯ সালের মধ্যে প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৮ হাজার পয়েন্ট অতিক্রম করবে। তাই আগামী দুই বছর যেকোনো শেয়ারে বিনিয়োগ করলেই নিশ্চিত মুনাফা পাওয়া যাবে। আবার কোন নির্দিষ্ট কোম্পানির দাম বাড়বে এমন গুঞ্জনও শোনা যাচ্ছে। ক্ষেত্র বিশেষে কিছু কোম্পানির দাম বাড়ার গুঞ্জন সত্যও হচ্ছে।
 
তবে বাজার সংশ্লিষ্ট ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শেয়ারবাজারে গুজব ও গুঞ্জন থাকবেই। সম্প্রতি বাজার বেশ ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে, এতে গুঞ্জন ও গুজব ছড়াতে সুবিধা হচ্ছে। তবে বিনিয়োগকারীদের উচিত এমন গুঞ্জন এড়িয়ে চলা। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অবশ্যই কোম্পানির ফান্ডামেন্টাল অবস্থা বিশ্লেষণ করে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তা না হলে বিনিয়োগ ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যেতে পারে।
 
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে অর্থবাজারের যে অবস্থা তাতে পুঁজিবাজারে স্বাভাবিকভাবেই টাকা আসার কথা। আমানত ও সঞ্চয়পত্রের সুদ হার অনেক কম। যে কারণে অনেকে ব্যাংকে টাকা না রেখে শেয়ারবাজারে নিয়ে আসছেন। এর সঙ্গে অর্থমন্ত্রী এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) দায়িত্বশীলদের মন্তব্য এক শ্রেণির বিনিয়োগকারীদের শেয়ারবাজারমুখী করেছে। সেই সঙ্গে বাজারে নানা গুঞ্জন ছড়াতেও ভূমিকা রেখেছে তাদের মন্তব্য।
 
তারা বলছেন, বাজারকে নিজস্ব গতিতে চলতে দিতে হবে। যদি স্বাভাবিকভাবেই বাজারে টাকা আসে এবং সূচক বাড়ে তাতে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। কিন্তু বাজারকে যদি কৃত্রিমভাবে ওঠার চেষ্টা করা হয়, তবে তা বাজারের জন্য বিশাল ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। বিনিয়োগকারীদের এবং বাজার সংশ্লিষ্টদের অতীত থেকে শিক্ষা নিতে হবে। সেই সঙ্গে বাজারকে কৃত্রিমভাবে ফুলিয়ে তোলার চেষ্টা না করে ভালো ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্তির চেষ্টা করতে হবে।
 
বিভিন্ন ব্রোকারেজ হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকে লেনদেন চলাকালীন সময়ে অবস্থান করে এবং বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত নভেম্বর থেকেই বাজারে নতুন নতুন গুঞ্জন ছড়াচ্ছে। বিভিন্ন মাধ্যমে বাজারে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে ২০১৯ সালের নির্বাচনকে সামনে রেখে বাজার ঊর্ধ্বমুখী করার চেষ্টা চলছে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ডিএসইর প্রধান সূচক ৮ হাজার পয়েন্টে উন্নীত করা হবে।
 
এ লক্ষ্যে বড় বড় বিনিয়োগকারীদের সরকারের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নিয়ে বাজারে সক্রিয় করা হচ্ছে। তাই ২০১৯ সালের আগে যাতে বাজারে বড় ধরনের পতন বা অস্বস্থিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয় সে ধরনের অঙ্গিকারও নেয়া হচ্ছে এসব বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে। ‘বিদেশে থাকা শেয়ারবাজারের বড় বিনিয়োগকারী হিসেবে পরিচিত বিতর্কিত এক ব্যবসায়ীকে বাজারে ফিরিয়ে আনতে সম্প্রতি ভারতে একটি বৈঠক হয়েছে। সরকারের ওপর মহলের আগ্রহে এবং ভরতের প্রধানমন্ত্রীর কাছের একজনের সহায়তায় ওই বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয় এমন গুঞ্জনও বাজারে ছড়িয়ে পড়েছে।
 
এছাড়া কোম্পানি নিয়েও গুঞ্জন ছড়ানো হচ্ছে। যেমন ‘ক’ নামের একটি কোম্পানির দাম বর্তমানে ১২ টাকা। দুই সপ্তাহের মধ্যে ওই কোম্পানির দাম ২০ টাকা হয়ে যাবে। এ ধরনের গুঞ্জন ক্ষেত্রে বিশেষে সত্যও হচ্ছে। ফলে বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ তথ্য যাচাই-বাছাই না করেই গুঞ্জনের ভিত্তিতে বিনিয়োগ করছেন।
 
এদিকে সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে ২০২০ সালের মধ্যে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে বলে মন্তব্য করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।

অর্থমন্ত্রী বলেন, আমি বিশ্বাস করি, ২০২০ সালের মধ্যে আমাদের এখানে একটা শক্তিশালী পুঁজিবাজার সৃষ্টি হবে, যেখান থেকে আমরা বিভিন্ন বিনিয়োগে আগ্রহ নিতে পারব। মাত্র তিন বছর বাকি। এই তিন বছরের মধ্যেই হবে বলে আমার বিশ্বাস।
 
অর্থমন্ত্রীর ওই বক্তব্যের পর বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান এম খায়রুল হোসেন এক অনুষ্ঠানে বলেন, ২০১০ সালের ধ্বসের পর পুঁজিবাজারে ব্যাপক সংস্কার হয়েছে। বাজার এখন স্থিতিশীলতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। অর্থমন্ত্রী সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেছেন আগামী ২০২০ সালে বাজার একটি শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছাবে। তার মতোই আমরাও এটি বিশ্বাস করি। একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহি ও টেকসই পুঁজিবাজার গঠনই আমাদের কাম্য। এর জন্য সবাইকে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে আমরা যেন দায়িত্ব পালন থেকে দূরে সরে না যাই।
 
এর আগে এক অনুষ্ঠানে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) কে এ এম মাজেদুর রহমান বলেন, বর্তমানে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) পুঁজিবাজারের অবদান ২০ শতাংশ। আগামী তিন বছরে এটি বেড়ে ৫০ শতাংশ হবে।
 
শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অর্থমন্ত্রী এবং শেয়ারবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থার দায়িত্বশীলদের এমন মন্তব্য বাজারে গুঞ্জন ছড়াতে সহায়তা করছে। আর বাজারে গুঞ্জন ছড়িয়ে এক শ্রেণি বাজার থেকে অনৈতিক ফায়দা লুটার চেষ্টা করছে। যার ফলশ্রুতিতে সম্প্রতি বেশকিছু পঁচা কোম্পানির (জেড গ্রুপের) শেয়ারের দাম অস্বাভাবিক বাড়তেও দেখা গেছে। দায়িত্বশীলদের উচিত বাজার নিয়ে অতিকথন বন্ধ করা। বাজারকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দিতে হবে। আর বিনিয়োগকারীদের উচিত গুঞ্জন এড়িয়ে মেধা খাটিয়ে বিনিয়োগ করা।
 
সাবেক তত্ত্ববধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এবং বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম জাগো নিউজকে বেলন, পুঁজিবাজারে গুজব থাকবেই। তবে বিনিয়োগকারীরা সেই গুজবে কেন কান দেবে? বিনিয়োগকারীদের গুজবের ভিত্তিতে কিছুতেই বিনিয়োগ করা উচিত নয়। বিনিয়োগের আগে অবশ্যই কোম্পানির আর্থিক অবস্থা পর্যালোচনা করতে হবে। যাদের এতোটুকু করার ক্ষমতা নেই তাদের জন্য শেয়ারবাজার নয়।
 
কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. বখতিয়ার হাসান জাগো নিউজকে বলেন, বিনিয়োগকারীদের উচিত অতিত থেকে শিক্ষা নেওয়া। ২০১০ সালের অস্বাভাবিক উত্থানের আগেও বাজারে বিভিন্ন গুঞ্জন ছড়ানো হয়েছিল। গুঞ্জন ছড়িয়ে এক শ্রেণির মানুষ বাজার থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিলেও সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। মনে রাখতে হবে শেয়ারবাজারে গুঞ্জন থাকবেই, তবে বিনিয়োগকারীদের অর্থের নিরাপত্তার ব্যবস্থা তাদের নিজেদেরই করতে হবে।
 
ডিএসইর বর্তমান পরিচালক ও সাবেক সভাপতি রকিবুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, বাজারে গুজব রটিয়ে ফায়দা লুটার প্রবণতা থাকবেই। তবে সেই প্রবণতা কতো শতাংশ, সেটা গুরুত্বপূর্ণ। যদি ২০ শতাংশের মতো গুজব এবং বাকি ৮০ শতাংশ স্বাভাবিক নিয়মে চলে তাতে ক্ষতির কিছু নেই। কিন্তু বিনিয়োগের ক্ষেত্রে গুজবের মাত্রা যদি ৫০ শতাংশের ওপরে হয় তা বাজারের জন্য খুবই ক্ষতিকর।
 
তিনি বলেন, বাজারকে তার গতিতে চলতে দিতে হবে। কৃত্রিমভাবে বাজার তোলার চেষ্টা করলে তা ধরে রাখা যাবে না। আর ধার বা ঋণ করে অথবা গহনা ও জমি বিক্রি করে কোন অবস্থায় শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করা উচিত হবে না। এমনকি বিদেশ থেকে আসা রেমিটেন্সের টাকাও শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করা উচিত না। শেয়ারবাজারে তাদেরই আসা উচিত যাদের উদ্বৃত্ত সঞ্চয় আছে।
 
বাজারে গুঞ্জন রয়েছে ২০১৯ সালের মধ্যে সূচক ৮ হাজার হবে এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে ডিএসইর সাবেক এই সভাপতি বলেন, অর্থমন্ত্রী বলেছেন তিন বছরের মধ্যে বাজার শক্তিশালী হবে। তবে বাজারকে শক্তিশালী করতে হলে তালিকাভুক্ত ৩০০ কোম্পানি দিয়ে হবে না, কমপক্ষে এক হাজার কোম্পানি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করতে হবে এবং নতুন যেসব কোম্পানি আসবে সেগুলোকে অবশ্যই ফান্ডামেন্টাল হতে হবে।
 
ডিএসইর আর এক পরিচালক এবং সাবেক সভাপতি শাকিল রিজভী জাগো নিউজকে বলেন, বাজার যখন ভালো থাকে তখন গুজব ছড়াতে সুবিধা হয় এবং স্বাভাবিক নিয়মেই বিভিন্ন গুজব ছড়াই। তবে বিনিয়োগকারীদের ভেবে চিন্তে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কোম্পানির তথ্য ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করে বিনিয়োগ করতে হবে। অতি মুনাফার লোভে বিনিয়োগ করা ঠিক না।
 
এমএএস/এআরএস/আরআইপি

আপনার মতামত লিখুন :