৪ বছরে অস্থির ব্যাংকিং খাত

মো. শফিকুল ইসলাম
মো. শফিকুল ইসলাম , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১১:৪৪ পিএম, ১১ জানুয়ারি ২০১৮ | আপডেট: ১০:১৭ এএম, ১২ জানুয়ারি ২০১৮

আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের চার বছরে (২০১৪-১৮) অস্থির ব্যাংকিং খাত। একের পর এক কেলেঙ্কারির, দুর্নীতি, মালিকানা ও ব্যবস্থাপনায় বদলের মধ্যমে দখল বেসরকারি ব্যাংক। রিজার্ভ চুরি, গভর্নরের পদত্যাগ, রেমিট্যান্স প্রবাহে নেতিবাচক ধারা-গত চার বছরে ব্যাংকিংখাতে ছিল আলোচনার শীর্ষে।

এছাড়া রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমোদন পাওয়া ব্যাংকগুলোর নাজুক অবস্থা, ব্যর্থতার অভিযোগে ফারমার্স ও এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের চেয়ারম্যানের পদত্যাগ, একাধিক ব্যাংকের এমডিকে অপসারণ এবং রাষ্ট্রায়ত্ব বেসিক, সোনালী, জনতা সব ব্যাংকেরই নড়বড়ে অবস্থাও রয়েছে আলোচনায়।

এদিকে অনিয়ম ঠেকাতে ১৪টি ব্যাংকে পর্যবেক্ষক বসিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এছাড়া বিনিয়োগ মন্দায় তলানিতে আমানতের সুদ হার। লাগামহীনভাবে বেড়েছে খেলাপি ঋণ। আর এসব কারণে ঝুঁকিতে পড়েছে আর্থিক খাত। ফলে শঙ্কায় আমানতকারীরা।

সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রধান বিরোধীদলের অংশগ্রহণ ছাড়াই অনুষ্ঠিত হয় ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচন। ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চিয়তা ও আস্থার সঙ্কট সৃষ্টি হয়। এর পরের বছর ২০১৫ সালে দেশজুড়ে টানা হরতাল আর অবোরধে অস্থির হয়ে উঠে রাজনৈতিক অঙ্গন। ফলে ব্যবসা বাণিজ্য মন্দায় বিনিয়োগ চাহিদা কমে যাওয়ায় প্রতিটি ব্যাংকের বাড়ে অলস অর্থ। সংকটে পড়ে ব্যাংক খাত। পরিচালন ব্যয় কমাতে আমানত সংগ্রহে নিরুৎসাহিত হয়ে পড়ে। কমাতে থাকে আমানতের সুদহার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান মতে, ২০১৩ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ ছিল ৪০ হাজার ৫৮৩ কোটি টাকা। চার বছরের তা দ্বিগুণ হয়ে ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর শেষে দাঁড়িয়েছে ৮০ হাজার ৩০৭ কোটি টাকায়।

তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে যখন আমানতের সুদহার ৮ শতাংশের বেশি ছিল, তখন আমানতের প্রবৃদ্ধি ছিল এখনকার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। ২০১৪ সালে আমানতের প্রবৃদ্ধি ছিল দাঁড়ায় ১৩ দশমিক ৪৫ শতাংশে। ২০১৫ সালে ব্যাংক আমানতে ১৩ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলেও ২০১৬ সালে তা দাঁড়ায় ১২ দশমিক ৭৮ শতাংশে। আর ২০১৭ সালের জুনে এ প্রবৃদ্ধির হার ছিল ১০ দশমিক ৬১ শতাংশ।

বেসিক ব্যাংকের দুর্নীতি আগে হলেও পত্রপত্রিকা প্রকাশ হয় ২০১২ সালে। এরপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে পদক্ষেপ নেয়া হয় বেসিক ব্যাংকের বিরুদ্ধে। প্রথমে ২০১৪ সালের মার্চে বেসিক ব্যাংকের এমডি কাজী ফখরুল ইসলামকে শোকজ করে। বড় ধরনের ঘটনা ফাঁস হওয়ার আগেই তৎকালীন পর্ষদ তড়িঘড়ি করে ওই বছরের ১৭ এপ্রিল ডিএমডিসহ ছয় কর্মকর্তাকে বহিষ্কার করে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের অনড় অবস্থানের কারণে ২৯ এপ্রিল প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার ঋণ কেলেঙ্কারির দায়ে বেসিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদকে ভেঙে দেয়ার জন্য অর্থমন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয়। একই সঙ্গে ২৫ মে এমডি কাজী ফখরুল ইসলামকে অপসারণ করা হয়। পরে বিতর্কিত চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চু স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন। এরপরে এমডি ও চেয়ারম্যান দুজনই দেশ ত্যাগ করেন। এরপরে তারা আজো দেশে ফেরেননি।

রিজার্ভ চুরি
২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ঘটে স্মরণকালের ভয়াবহ আলোচিত রিজার্ভ চুরির ঘটনা। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কে রাখা বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের ১০১ মিলিয়ন বা ১০ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার (৮০০ কোটি টাকা) চুরি হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের দাবি, ‘হ্যাক’করে এ অর্থ সরিয়ে নেয়া হয়েছে। পরে এ ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমানকে পদত্যাগ করতে হয়। অব্যাহতি দেয়া হয় দুই ডেপুটি গভর্নরকেও। এছাড়া অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিবকে ওএসডির পাশাপাশি ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ফরাসউদ্দিনকে প্রধান করে সরকারের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়। রিজার্ভ চুরির ঘটনার এক মাস পর মামলা করা হয় বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের পক্ষ থেকে। চুরি হওয়া অর্থের মধ্যে ফিলিপাইন থেকে কিছু ফেরত পাওয়া গেলেও বেশির ভাগ অর্থ আদায় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এছাড়াও গত দুই বছরে এটিএম ও ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি করে টাকা হাতিয়ে নেয় প্রতারকচক্র।

রেমিট্যান্স প্রবাহে ভাটা
বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে সমৃদ্ধ করে প্রবাসীদের কষ্টার্জিত রেমিট্যান্স। কিন্তু ২০১৪ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে কমছে রেমিট্যান্স প্রবাহ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৪ সালে রেমিট্যান্স এসেছিল এক হাজার ৪৮৩ কোটি ডলার। পরের বছর অর্থাৎ ২০১৫ সালে তা কিছুটা বেড়ে হয় এক হাজার ৫৩১ কোটি ডলার। কিন্তু ২০১৬ রেমিট্যান্স আসে এক হাজার ৩৬১ কোটি ডলার। সর্বশেষ ২০১৭ সালে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স আসে এক হাজার ৩৫৩ কোটি মার্কিন ডলার।

১৪ ব্যাংকে পর্যবেক্ষক
ঋণ জালিয়াতি, অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা আর অনিয়ম ঠেকাতে ১৪ ব্যাংকে পর্যবেক্ষক বসিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক ছাড়া সব কটিতে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। বেসরকারি খাতের ৪০টি ব্যাংকের মধ্যে সাতটিতে পর্যবেক্ষক বসিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আইসিবি ইসলামিক, বাংলাদেশ কমার্স, ন্যাশনাল, ইসলামী ব্যাংক, এবি ব্যাংক। এছাড়া নতুন প্রজন্মের ফারমার্স ও এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক পর্ষদে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে যে শৃঙ্খলা ফেরাতে পর্যবেক্ষক দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সফল হচ্ছে না। অধিকাংশ ব্যাংকের আর্থিক সূচকে উন্নতি নেই। সুশাসনেও ঘাটতি দূর হয়নি। মূলত পর্যবেক্ষকদের চোখে অনিয়ম ধরা পড়লেও রাজনৈতিক চাপে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারছে না। এ সব ব্যাংকে বাড়ছে খেলপি ঋণ। মূলধন ঘটতিতে পড়েছে বেশ কয়েকটি ব্যাংক।

ব্যাংক দখল
গত বছরের শুরুতেই দখল হয় বেসরকারি খাতের অন্যতম ইসলামী ব্যাংক। জামায়াতমুক্ত করতেই ব্যাংকটির পর্ষদে বড় ধরনের পরিবর্তনে আনে ক্ষমতাশীনরা। গত বছরের শুরুতে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক এবং অক্টোবরে সোস্যাল ইসলামী ব্যাংকে (এসআইবিএল) পরিবর্তন আসে। তিনটি ব্যাংকেই শেয়ার কিনে মালিকানায় এসেছে চট্টগ্রামভিত্তিক এস আলম গ্রুপ।

এদিকে গত বছরের ৩০ অক্টোবর ইসলামী ব্যাংকের কায়দায় পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন হয় বেসরকারি খাতের সোস্যাল ইসলামী ব্যাংকে (এসআইবিএল)। এ পরিবর্তনেও জড়িত ছিল এস আলম গ্রুপের সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) চেয়ারম্যান কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, নদী ও চর দখলের মতোই একের পর এক ব্যাংক দখল হচ্ছে, যার কোনো বিচার নেই। ফলে তৈরি হচ্ছে অসমতা। বাড়ছে বৈষম্য।

তিনি আরও বলেন, টেকসই উন্নয়নের কথা বলা হলেও সে জন্য যে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি দরকার তার ঘাটতি রয়েছে। ফলে বিভিন্ন খাতে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এ অবস্থার পরিবর্তন না হলে অর্থনীতি ঝুঁকিতে পড়বে।

তবে ব্যাংকিং সুবিধাবঞ্চিতদের জন্য চালু হওয়া এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের দ্রুত প্রসার হয়েছে। বেড়েছে কৃষি ও দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতের ঋণ বিতরণ। সফলতা এসেছে স্কুল ব্যাংকিংয়ে। ২০১৩ সালে স্কুল ব্যাংকিংয়ের আওতায় দেশের ব্যাংকগুলোতে হিসাব সংখ্যা ছিল প্রায় ৩ লাখ। ২০১৭ সালে তা পৌঁছেছে প্রায় ১৩ লাখে।

২০১৩ সালে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে হিসাবের সংখ্যা দাঁড়ায় দুই লাখ ৯৫ হাজার ৮০৩টি। ওই সময় স্থিতির পরিমাণ ছিল ৩০৫ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। একইভাবে ২০১৪ সাল শেষে স্কুল ব্যাংকিং হিসাবের সংখ্যা ছিল আট লাখ ৫০ হাজার ৩০৩টি। আর হিসাব স্থিতির পরিমাণ ছিল ৭১৭ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। ২০১৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ক্ষুদে সঞ্চয়ীদের হিসাবে জমা পড়েছে ৮৪৪ কোটি ১৯ লাখ টাকা। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর শেষে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে নিবন্ধিত গ্রাহক দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ৩৮ হাজারে। জমার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯২২ কোটি টাকা।

২০১৩-১৪ চলতি অর্থবছরে কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা যেখানে ছিল ১৪ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা। চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার ৪০০ কোটি টাকায়।

প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বদলেছে ব্যাংকিং খাতের গ্রাহকসেবার ধরন। আন্তঃব্যাংকে বড় লেনদেন দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি, চেক জালিয়াতি রোধে ও সার্বিকভাবে পেমেন্ট সিসটেম উন্নয়নের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ রেমিট্যান্সপ্রবাহ দ্রুত ও সহজতর করার প্রযুক্তি আরটিজিএস (রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট) বেশ চালু করা হয়েছে।

এসআই/এএইচ/বিএ

আপনার মতামত লিখুন :