সংসদে বাড়ছে নারী প্রতিনিধিত্ব, ক্ষমতা বাড়ছে কি?

সিরাজুজ্জামান
সিরাজুজ্জামান সিরাজুজ্জামান , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১২:০১ এএম, ০৮ মার্চ ২০১৮

স্বাধীনতার পর প্রথম সংসদ নির্বাচনে কোনো নারী সরাসরি ভোটে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হতে না পারলেও পরের নির্বাচনে দুজন নির্বাচিত হয়েছিলেন। এরপর সরাসরি নির্বাচন ছাড়াও সংসদে নারীদের প্রতিনিধিত্ব বেড়েছে। কিন্তু তাদের ক্ষমতা বেড়েছে কি? এছাড়া নারী নেতৃত্বের কোনো গুণগত পরিবর্তন এসেছে কি না তা নিয়েও দ্বিমত রয়েছে বিশেষজ্ঞদের।

জাতীয় সংসদ ও নির্বাচন কমিশনের পাঠাগারে রাখা বিগত দশটি জাতীয় সংসদের নির্বাচন সংক্রান্ত নথিপত্র, সংসদের আইন ও নোটিশ শাখায় প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, দেশে পর্যায়ক্রমে নারী নেতৃত্ব বাড়লেও আইন প্রণয়নে তেমন অবদান নেই। নারীদের এখনও সংসদের অলংকার হিসেবে দেখছেন কেউ কেউ। আবার এর পাল্টা যুক্তিও এসেছে কারও কারও পক্ষে। তবে গণতন্ত্র সুসংহত করতে সবপক্ষই নারীর ক্ষমতায়নের পক্ষে গুরুত্ব দিয়েছেন।

সংসদ নিয়ে গবেষণা করা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, নারীদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর বিকল্প নেই। সংসদের সংরক্ষিত আসনের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়লেও নেতৃত্বের গুণগত মান বাড়েনি।

স্বাধীনতার পর সরাসরি নির্বাচিত নারী এমপি

স্বাধীনতার পর প্রথম সংসদ নির্বাচনে (১৯৭৩) কোনো নারী সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হতে পারেননি। সে সময় কাউকে মনোনয়নও দেয়া হয়নি। তবে সংরক্ষিত আসনে নারী সংসদ সদস্য হিসেবে ১৫ জন ছিলেন। দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে (১৯৭৯) দুজন নির্বাচিত হন। সে সময়ে খুলনা-১৪ আসন থেকে সৈয়দা রাজিয়া ফয়েজ ও টাঙ্গাইল-১ আসন থেকে আশিফা আকবর নির্বাচিত হন।

তৃতীয় সংসদে পাঁচজন (১৯৮৬), চতুর্থ সংসদে চারজন (১৯৮৮), পঞ্চম সংসদে ছয়জন (১৯৯১), ষষ্ঠ সংসদে তিনজন (১৯৯৬), সপ্তম সংসদে আটজন (১৯৯৬), অষ্টম সংসদে সাতজন (২০০১), নবম সংসদে ২১জন (২০০৮) এবং দশম সংসদ নির্বাচনে ২২ জন (২০১৪) নারী এমপি হিসেবে নির্বাচিত হন।

চলতি সংসদে আওয়ামী লীগের ১৮জন, জাতীয় পার্টির তিন ও ওয়ার্কাস পার্টির একজন নারী সংসদ সদস্য হিসেবে সরাসরি নির্বাচন করে নির্বাচিত হন। যদিও দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ও তাদের শরিক দল অংশ না নেয়ায় এ নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।

সংসদে সংরক্ষিত আসনের যত নারী এমপি

প্রথম সংসদে সংরক্ষিত আসনের ১৫ জনই আওয়ামী লীগের, দ্বিতীয় সংসদে ৩০ জনই বিএনপির, তৃতীয় ও চতুর্থ সংসদে ৩০ জনই জাতীয় পার্টির, পঞ্চম সংসদে ২৮ জন বিএনপির ও দুইজন জামায়াতের ছিলেন। চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় থাকায় দুটি আসন জামায়াতকে দেয় বিএনপি।

ষষ্ঠ সংসদে ১৫ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকারের আমলে এক তরফা নির্বাচনের পর সংরক্ষিত নারী আসনের এমপিদের নির্বাচনের আগেই সংসদ ভেঙে দেয়া হয়। সপ্তম সংসদে ৩০ জন আওয়ামী লীগের, অষ্টম সংসদে বিএনপির ৩৬ জন, ইসলামী ঐক্যজোটের দুইজন ও জামায়াতের চার নারী এমপি ছিলেন। নবম সংসদে আওয়ামী লীগের ৪১ জন, বিএনপির পাঁচ ও জাতীয় পার্টির চার এমপি ছিলেন।

দশম সংসদে আওয়ামী লীগের ৪২, জাতীয় পার্টির ছয়, ওয়ার্কাস পার্টি ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের একজন করে সংরক্ষিত আসনের এমপি রয়েছেন।

সংসদে নারীদের যত নেতৃত্ব

শেখ হাসিনা বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে তিনবার সংসদে গেছেন। খালেদা জিয়া দুইবার ও রওশন এরশাদ গেছেন একবার করে। তৃতীয় সংসদে প্রথমবারের মতো বিরোধীদলীয় নেতার আসনে বসেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী। জাতীয় পার্টির আমলে হওয়া ওই নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেয়নি। ৯০ এর স্বৈরশাসকের পতনের আগে জাতীয় সংসদের উচ্চপদে মাত্র একজন নারী (শেখ হাসিনা) বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে ছিলেন।

স্বাধীনতার পর ১৫ জন স্পিকার ও ১১ জন ডেপুটি স্পিকার বিভিন্ন সময় দায়িত্ব পালন করলেও নবম জাতীয় সংসদে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর মাধ্যমে নারী স্পিকার যুগের শুরু হয়। দশম জাতীয় সংসদেরও স্পিকার তিনি। এছাড়া সংসদের উপনেতা সাজেদা চৌধুরীও একজন নারী।

আইন প্রণয়নে অংশ নেন শুধু রওশন আরা মান্নান

জাতীয় পার্টির এমপি অধ্যক্ষ রওশন আরা মান্নান একমাত্র নারী, যিনি আইন প্রণয়নে নিয়মিত অংশ নেন। অন্য কোনো নারী এমপি এ কাজে আগ্রহ দেখাননি। ২০১৭ সালে পাঁচটি অধিবেশনে ২৪টি বিল পাস হয়। এর মধ্যে ১৩টি বিলে জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব দেন তিনি। আর সাতটি বিলের দফাওয়ারি সংশোধনী আনেন রওশন। সংসদে সরকারি দলের এমপিরাও প্রস্তাবিত আইনের ওপর সংশোধনী আনতে পারেন। কিন্তু রহস্যজনক কারণে তারা তা করেন না।

শুধু বিরোধী দলের ছয়-সাতজন পুরুষ এমপি আইন পাসে অংশ নেন। একমাত্র ব্যতিক্রম রওশন আরা মান্নান। তবে বিভিন্ন সময় যুক্তিতর্ক ও রেফারেন্স নিয়ে বক্তব্য রেখে সবার দৃষ্টি কেড়েছেন তথ্য প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম ও ফজিলাতুননেসা বাপ্পি।

আইন প্রণয়নে অংশ নেয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে রওশন আরা মান্নান বলেন, আমি রাতভর স্টাডি করি। বিষয়গুলো নিয়ে স্টাডি করি। অন্য নারীরা বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত। লেখাপড়া করেই আমার জীবন কেটে গেল। তাই মানুষের কল্যাণ হয় এমন কাজ করি।

সংসদে নারীদের উপস্থিতি বেশি

সংসদের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সংসদ অধিবেশনে পুরুষের তুলনায় নারীদের উপস্থিতি বেশি। এছাড়া নারীরা সময়মতো সংসদে আসেন। আবার তারা বেশিক্ষণ সংসদে থাকেন।

তিনি জানান, চলমান দশম জাতীয় সংসদে ২৯ জানুয়ারি পর্যন্ত ৩৪২ কার্যদিবস চলেছে। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২৮৪ দিন উপস্থিত ছিলেন। আর বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ উপস্থিত ছিলেন ২০৪ দিন।

নবম সংসদে কার্যদিবস ছিল ৪১৮দিন। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন ৩৩৬দিন। আর খালেদা জিয়া উপস্থিত ছিলেন মাত্র ১০ দিন। সেই সময় বিএনপি বেশির ভাগ সময় সংসদ বয়কট করায় খালেদা জিয়ার উপস্থিতি কম।

সংসদে নারী এমপিদের বিষয়ে জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার জাগো নিউজকে বলেন, দেশের সুশাসন প্রতিষ্ঠায় নারী নেতৃত্বকে অবশ্যই এগিয়ে নিতে হবে। কারণ জনগণের অর্ধেকই নারী। তাই নারী নেতৃত্বের বিকল্প নেই। কিন্তু দেশে নারীর ক্ষমতায়নের গুণগত মান নিয়ে এখনও প্রশ্ন রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, বিরোধীদলীয় নেতার মতো কয়েকজন নারী নেতৃত্ব ছাড়া অধিকাংশের কোনো ক্ষমতা নেই।

তিনি বলেন, সংসদে সংরক্ষিত আসন পদ্ধতি ক্রটিপূর্ণ। সেখানে যোগ্য নারীরা সুযোগ পান না। আর সংরক্ষিত আসনের এমপিদের অলংকার হিসেবে দেখা হয়। তাদের দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহি কম। কারণ তাদের ভোটারদের মুখোমুখি হতে হয় না। যদি সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে তারা সংসদে যেতেন তাহলে গুণগত মানের পরিবর্তন হত।

তবে এ বিষয়ে রওশন আরা মান্নান বলেন, সবাই তো সব পারে না। কেউ কেউ যথাযথ ভূমিকা পালন করছেন। প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, বিরোধীদলীয় নেতা, সংসদ উপনেতা নারী। তারা অলংকার হলে সংসদ চালাতে পারত না। বিশ বছর আগে মেয়েরা যে পর্যায়ে ছিল এখন সেই পর্যায়ে নেই। ডিজিটাল যুগে মেয়েরা এখন অনেক শক্তিশালী।

এইচএস/এএইচ/জেডএ/আরআইপি