আইন, ধর্মের বিরুদ্ধে মতপ্রকাশ করাই স্বাধীনতা না

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮:০৩ পিএম, ১৫ এপ্রিল ২০১৮ | আপডেট: ০৮:৫৭ পিএম, ১৫ এপ্রিল ২০১৮
আইন, ধর্মের বিরুদ্ধে মতপ্রকাশ করাই স্বাধীনতা না
ছবি- মো. মুখলেছুর রহমান

ফরিদ আহমেদ। প্রকাশক, সময় প্রকাশন। সম্প্রতি জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির নির্বাচনে সভাপতি পদে নির্বাচিত হয়েছেন। সমিতির দায়িত্ব পালন করেছেন এর আগেও। প্রকাশন সংস্থার অধিকার আদায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন দীর্ঘদিন থেকে। নতুন দায়িত্ব, প্রত্যাশা এবং সংগঠনের কার্যক্রম নিয়ে সম্প্রতি মুখোমুখি হন জাগোনিউজ -এর। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সায়েম সাবু

জাগো নিউজ : সভাপতি নির্বাচিত হলেন জ্ঞান ও প্রকাশনা সমিতির। প্রত্যাশা নিয়ে কী বলবেন?

ফরিদ আহমেদ : আমাদের প্রথম প্রত্যাশা হচ্ছে সমিতির কার্যক্রমে গণতান্ত্রিক ধারা ফিরে আনা। সমিতির মধ্যে স্বেচ্ছাচারিতা সৃষ্টি হয়েছে।

জাগো নিউজ : কোন বিষয়কে অধিক গুরুত্ব দিবেন?

ফরিদ আহমেদ : আমরা প্রতিজ্ঞা করেছি সময়মতো নির্বাচন দেয়া এবং এটি করতে পারলেই সমিতির গতি ফিরবে বলে মনে করি। দ্বিতীয়ত, বিগত কয়েক বছরে সমিতির সদস্য ফি অস্বাভাবিক বৃদ্ধি করা হয়েছে। এ কারণে অনেকেই সদস্য হতে পারছেন না। আমরা এটি যুক্তিসংগত পর্যায়ে আনার চেষ্টা করব। তিন হাজার থেকে ত্রিশ হাজার পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এটি হতে পারে না। আমি একটি প্যানেলের লিডার ছিলাম। ২১ পরিচালকের মধ্যে আমাদের প্যানেল জিতেছে ২০টি পদে। নির্বাচনী ফলাফল থেকেই সদস্যদের প্রত্যাশা উপলব্ধি করা যায়। আমরা নির্বাচনে কোনো বড় ধরনের প্রতিশ্রুতি দিইনি। আমরা জানি, আসলে আমাদের সমস্যাটা কোথায়। আমাদের সঙ্গে প্রকাশকদের সম্পৃক্ততা অনেক বেশি। কী করা দরকার এবং কী করব তা প্রকাশকদের পরামর্শেই হবে।

জাগো নিউজ : আপনার চিন্তা কী?

ফরিদ আহমেদ : প্রকাশনার মান বাড়ানোই চ্যালেঞ্জ। এর আগে আমি যখন দায়িত্বে ছিলাম, তখন প্রকাশনার মান বাড়ানোর জন্য আমরা কর্মশালার আয়োজন করেছিলাম। গত পাঁচ বছরে এগুলো আর দেখা যায়নি। প্রকাশনা কোর্স ছিল। এখন আর নেই। উন্নত প্রকাশনা, বানান সংশোধনীর জন্য ভালো তাগিদ অনুভব করা সময়ের দাবি। নতুন প্রজন্মের মানসিক বিকাশের জন্য এটি প্রকাশকদের দায় বলে মনে করি। এই দায় থেকেই নানা কর্মশালার আয়োজন করা হবে।

জাগো নিউজ : অনলাইনের যুগ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কী করণীয় বলে মনে করেন?

ফরিদ আহমেদ : মাঝের ক’বছর সমিতির দায়িত্বে ছিলাম না। কিন্তু আমি এই সময় ইলেকট্রনিক্স বুক এবং অনলনাইনে বইয়ের বাজারের জন্য কাজ করেছি। আমি বেশ কয়েকটি ওয়েবসাইটও বানিয়েছি। আমরা অনলাইন বাজার নিয়ে ভাবছি বলেই এগুলো নিয়ে কাজ করেছি। এই ভাবনা শুধু তো নিজের জন্যই না।

জাগো নিউজ : প্রকাশনার ওপর সরকারের নিষেধাজ্ঞা পরম্পরায়। বইমেলায় বইয়ের কনটেন্ট মনিটরিং করেন পুলিশ। সৃজনশীলতায় এটিকে কতুটুকু চ্যালেঞ্জ মনে করেন?

ফরিদ আহমেদ : প্রকাশনার ওপর নিষেধাজ্ঞা অস্থায়ী। সরকারের প্রকাশনা আইন আছে। আমরা সেই আইন মান্য করেই বই প্রকাশ করি। আমি আইন অমান্য না করলে ঘোষণা দিয়েও সরকার আমাকে আটকাতে পারে না।

জাগো নিউজ : এই ঘোষণাই মুক্তচিন্তার অন্তরায় কি-না?

ফরিদ আহমেদ : চিন্তাশক্তিকে আসলে বেঁধে ফেলা যায় না। সৃষ্টি তার মতোই। বইমেলায় নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘটনা আমরা দেখেছি। তবে সামগ্রিক বিবেচনায় গোটা প্রকাশনা সংস্থার জন্য বিশেষ চাপ সৃষ্টি হয়, তা মনে করি না। আমরা তো আসলে এই ধরনের বই প্রকাশ করি না। আইন, ধর্মের বিরুদ্ধে মতপ্রকাশ করাই স্বাধীনতা না। আমি আমার ধর্মকে শ্রদ্ধা করি, ঠিক আমার বন্ধুর ধর্মকেও। যারা বিভাজন সৃষ্টির লক্ষ্যেই বই প্রকাশ করে থাকেন, তাদের বিশেষ উদ্দেশ্য থাকে। এটি সবার জন্যই ক্ষতিকর।

জাগো নিউজ : প্রকাশকদের বড় আয়োজন অমর একুশে বইমেলা। বইমেলার আয়োজনে কতটুকু এগুলো আমাদের শিল্প-সাহিত্য?

ফরিদ আহমেদ : দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এ নিয়ে কর্তৃপক্ষের কোনো সঠিক পরিসংখ্যান নেই। রেকর্ড সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেই। বই, বিক্রি, বইয়ের মান নিয়ে বাংলা একাডেমির নানা ঘোষণা আসে। কিন্তু এই ঘোষণা সঠিক কিনা তার কোনো রেকর্ড নেই। তবে আমি ইতিবাচকভাবেই মনে করি, এগুনোর জন্য অন্তত কিছু একটা হচ্ছে। যদিও নানা প্রশ্ন আছে অগ্রগতি নিয়ে। বইমেলা তো পুরো জাতিকে এক করতে পারছে না। এখন বিদেশিদের মধ্যেও একুশে বইমেলা, বাংলা সাহিত্যে আলো ফেলতে পারছে। বড় একটি অঙ্কের বাজার সৃষ্টি হয়েছে। হাজার হাজার বই কারও না কারও ঘরে যাচ্ছে। কেউ না কেউ বইয়ের পাতা উল্টিয়ে চোখ রাখছেন।

জাগো নিউজ : একুশে বইমেলায় ভারতীয় লেখকদের বই প্রকাশ পায় না। বাংলা সাহিত্য বিকাশে এই সিদ্ধান্ত অন্তরায় কি-না?

ফরিদ আহমেদ : ব্যাখ্যার মধ্যে ক্রুটি আছে বলে মনে করি। আপনি আপনার শিল্প না বাঁচিয়ে তো অন্যকে প্রবেশ করতে দিতে পারেন না। সরকারের নীতি থাকতেই পারে। আমাদের কিন্তু এই নীতি শতভাগ অনুসরণ করতে হয় না। অমর একুশে বইমেলাটি একেবারেই দেশের আয়োজন। মেলার নামেই যার প্রমাণ। আবেগের জায়গা থেকে এই মেলা। এ দেশে প্রকাশিত বই কেবল মেলায় প্রকাশ পাবে। ভারতের লেখকরাও বাংলাদেশের প্রকাশনার মাধ্যমে বই প্রকাশ করতে পারেন। কোনো নিষেধাজ্ঞা তো নেই। বলা হয়েছে, দেশের বাইরে প্রকাশিত বই আমদানি করে মেলায় বিক্রি করা যাবে না।

এটি হচ্ছে প্রকাশকদের মেলা। এই মেলা তো বিক্রেতাদের আয়োজনে হচ্ছে না।

এএসএস/ওআর/পিআর

আমি আমার ধর্মকে শ্রদ্ধা করি, ঠিক আমার বন্ধুর ধর্মকেও। যারা বিভাজন সৃষ্টির লক্ষ্যেই বই প্রকাশ করে থাকেন, তাদের বিশেষ উদ্দেশ্য থাকে। এটি সবার জন্যই ক্ষতিকর।