টাকা দিলে সুস্থ কয়েদিও হাসপাতালের ‘রোগী’

আদনান রহমান
আদনান রহমান আদনান রহমান , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮:২৩ পিএম, ১৮ এপ্রিল ২০১৮

কথায় আছে ‘টাকা দিলে বাঘের দুধ মেলে।’ যদিও বাঘের দুধ দুষ্প্রাপ্য তবে টাকা খরচ করলে পাওয়া যায় না পৃথিবীতে এমন কিছু নেই।

কেরানীগঞ্জে অবস্থিত ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের চিত্র যেন এমনই। নবনির্মিত কারাগারটিতে পদে পদে চলছে ঘুষের লেনদেন। সম্প্রতি কারাগারের অনিয়ম ও বর্তমান দৈন্যদশা নিয়ে একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

গোয়েন্দা সংস্থার ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘কেরানীগঞ্জের কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রবেশদ্বার থেকে শুরু করে জামিন শাখা, কারা হাসপাতাল, খাবার ক্যান্টিন, বিভিন্ন ওয়ার্ড ও অন্য কারাগারে বদলির ভয় দেখিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন অসাধু কর্মকর্তারা।’ এছাড়া টাকার জন্য বন্দিদের শারীরিকভাবে নির্যাতনেরও অভিযোগ আছে।

অভিযোগ রয়েছে, কারাগারের ভেতরে অবস্থিত হাসপাতালে তৈরি হয়েছে একটি সিন্ডিকেট। সেখানকার চিকিৎসক, নার্স ও ফার্মাসিস্টরা এ সিন্ডিকেটের সদস্য। সুস্থ হোক কিংবা অসুস্থ, টাকা লেনদেন হলেই ওই সিন্ডিকেটের সদস্যরা সুস্থ কয়েদিকে ‘অসুস্থ’ দেখিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে নেন।

jall22015

গোয়েন্দা ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘কারা হাসপাতালের সুরমা বিল্ডিংটি মেডিকেল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। যেকোনো আসামি বা কয়েদি ১২ হাজার টাকা দিলে সেখানে ভর্তি হতে পারেন। হাসপাতালে অসুস্থ রোগীর চাইতে সুস্থ রোগীর সংখ্যাই বেশি। সেখানে থাকা প্রত্যেক আসামিকে চিকিৎসক বাবদ প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা, সার্ভিস চার্জ দুই হাজার টাকা এবং খাবারের খরচ বাবদ ৬-৭ হাজার টাকা দিতে হয়। হাসপাতালের রাইটার রবিন ও রহিমের মাধ্যমে এ টাকা সংগ্রহ করা হয়।‘

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ‘কারাগারের বাইরের হাসপাতালে ভর্তি হতে একজন আসামিকে ৩০-৩৫ হাজার টাকা খরচ করতে হয়। প্রকৃতপক্ষে যার টাকা আছে অথবা উপর থেকে ফোন করানোর ক্ষমতা আছে তারা অসুস্থ হোক বা না-ই হোক বাইরের হাসপাতালে ভর্তি হতে পারেন। যাদের টাকা নাই তারা গুরুতর অসুস্থ হলেও বাইরে যেতে পারেন না, গেলেও হাসপাতালে ভর্তি হতে পারেন না।’

‘সুস্থ’ রোগীদের হাসপাতালে থাকার বিষয়ে ইতোমধ্যে একটি গোয়েন্দা সংস্থা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এ সংক্রান্ত একাধিক চিঠি ও প্রতিবেদন পাঠিয়েছে। এসব প্রতিবেদনে হত্যা মামলার আসামি সংসদ সদস্য আমানুর রহমান খান রানা, যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী তোফায়েল আহমেদ জোসেফ ও ডেসটিনি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রফিকুল আমীনের নাম উল্লেখ রয়েছে।

‘সম্প্রতি উন্নত চিকিৎসার নামে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে কারাগার থেকে মিটফোর্ড হাসপাতালে ভর্তি হন মাদক মামলার আসামি সাগর। অতঃপর হাসপাতালে বসে মোবাইল ফোনে মাদক ব্যবসা করতে দেখা যায় তাকে। টাকার বিনিময়ে স্ত্রীকেও সঙ্গী হিসেবে হাসপাতালে পান তিনি’- সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে এমন চিত্রও উল্লেখ করা হয়েছে।

jall22015

সরেজমিন গত রোববার (১৫ এপ্রিল) ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার পরিদর্শনে গোয়েন্দা সংস্থার ওই প্রতিবেদনের সত্যতা পাওয়া যায়। কারাগারের সামনে শাফিন নামে এক যুবকের সঙ্গে কথা হয় জাগো নিউজ’র। তিনি জানান, তার ভাই ইমরান মাদক সেবন ও ব্যবসার অপরাধে কারাগারে। মাদকাসক্তের কারণে তার চিকিৎসার প্রয়োজন, হাসপাতালে ভর্তি করানো দরকার। ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারলাম ভেতরেই কারা হাসপাতাল রয়েছে। ভর্তি হতে প্রয়োজন ১০ হাজার টাকা।

‘পরে টাকা দিয়ে ভাইকে সেখানেই ভর্তি করি। পাঁচদিন ধরে সেখানেই আছে ভাই। এখন পর্যন্ত ১৩ হাজার টাকা খরচ হয়েছে’- বলেন তিনি।

কারাগার ও কারা হাসপাতালে ভর্তি সংক্রান্ত বিভিন্ন অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে অতিরিক্ত কারা মহাপরিদর্শক কর্নেল ইকবাল হাসান জাগো নিউজকে বলেন, ‘নিয়োগ নিয়ে ব্যস্ত থাকায় প্রতিবেদনটির বিষয়ে আমার জানা নেই। এ বিষয়ে আইজি প্রিজন্সের সঙ্গে কথা বললে ভালো হয়।’

গত সোমবার দুপুর ১টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজন্স) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দিনের কাছে অনিয়মের বিষয়ে জানতে তার অফিসিয়াল মোবাইলে পাঁচবার ফোন দেয়া হয়। কিন্তু তিনি রিসিভ করেননি। প্রতিবেদকের নাম-পরিচয়সহ সংবাদ সংগ্রহের বিষয়ে কথা বলা প্রয়োজন- এমন ক্ষুদেবার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি।

jall22015

এ বিষয়ে কথা বলতে সোমবার বিকেল থেকে মঙ্গলবার বিকেল পর্যন্ত ঢাকা জেলার উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি-প্রিজন্স) তৌহিদুল ইসলামকে ছয়বার ফোন দেয়া হয়। তিনি রিসিভ করেননি। একইভাবে ক্ষুদেবার্তা পাঠানো হলেও কোনো জবাব মেলেনি।

সহকারী কারা-মহাপরিদর্শক (এআইজি প্রিজন্স-প্রশাসন) মো. আবদুল্লাহ আল মামুনকেও ফোন দেয়া হয়। তিনিও রিসিভ করেননি।

কারাগারের বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রসঙ্গে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক জাগো নিউজকে বলেন, চিকিৎসাকেন্দ্র হলো আসামিদের সেবার স্থল। কারাগারে আসামিদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনটি যদি সত্য হয়, টাকা লেনদেনের মাধ্যমে সুস্থরা যদি হাসপাতালে অবস্থান করে, তহালে এটা হবে অসুস্থ রোগীদের মৌলিক অধিকার হরণ। আমরা এ ধরনের অভিযোগ আগেও শুনেছি।’

jall22015

‘কারাগারে আসামিরা এমনিতেই কষ্টে থাকেন, এরপরও যদি অসুস্থ হয়ে সেবা না পান তাহলে আর কষ্টের সীমা থাকে না। আমি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আরও তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে এবং কারাগারের চিকিৎসাসেবার মান নিশ্চিতের আহ্বান জানাচ্ছি’- যোগ করেন তিনি।

টাকার বিনিময়ে আসামিদের কারাগারের বাইরের হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সুস্থ আসামিরা বাইরের হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে কিনা, সে বিষয়ে কারা কর্তৃপক্ষের তদারকি দরকার। যদি সুস্থরা বাইরে যাওয়ার সুযোগ পায়, সেক্ষেত্রে নিরাপত্তা ঝুঁকি তো থাকে।’

প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন জাগো নিউজের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক সায়েম সাবু।

এআর/জেএইচ/এমএআর/জেআইএম

আপনার মতামত লিখুন :