সহকর্মীর ক্যান্সার : স্বতন্ত্র কল্যাণ তহবিল গঠনের উদ্যোগ

সিরাজুজ্জামান
সিরাজুজ্জামান , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১০:৪২ এএম, ২৪ এপ্রিল ২০১৮

সংসদ সচিবালয় গঠনের ৪৭ বছর পর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য স্বতন্ত্র কল্যাণ তহবিল গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ তহবিলে কোনো বিদেশি সরকার বা সংস্থা অথবা অন্য কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা বা উৎস থেকে অনুদান নেয়া যাবে।

প্রিয় এক সহকর্মী ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ায় তার চিকিৎসার ব্যয়ভার নিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতির পর স্বতন্ত্র কল্যাণ তহবিল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে সংসদ। এজন্য একটি খসড়া নীতিমালা তৈরি করা হয়েছে। গঠিত হয়েছে ১৮ সদস্যের এডহক কমিটি। কমিটি ইতোমধ্যে একটি বৈঠকও করেছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ভারতীয় লোকসভার জন্য কল্যাণ শাখা নামে একটি শাখা রয়েছে। ওই শাখার মাধ্যমে কর্মচারীদের কাছ থেকে নেয়া অনুদান অসুস্থ ব্যক্তি কিংবা জরুরি প্রয়োজনে ব্যয় করা হয়। ভারতীয় লোকসভার আদলে তৈরি এ কল্যাণ তহবিলও একইভাবে কার্যক্রম পরিচালিত করতে পারবে।

বাংলাদেশে কর্মচারী কল্যাণ বোর্ডও সংসদে কর্মরতদের বেতন থেকে টাকা কেটে রাখে। কিন্তু কেউ অসুস্থ হলে কিংবা অন্য কোনো জরুরি কাজে টাকার প্রয়োজন হলে প্রাপ্ত টাকা পেতে ভোগান্তির শিকার হতে হয়। এ কারণে স্বতন্ত্র কল্যাণ তহবিল গঠনের উদ্যোগ।

এডহক কমিটির সদস্য সংসদ টেলিভিশনের পরিচালক (প্রোগ্রাম অ্যান্ড নিউজ) এস এম মঞ্জুর সোমবার কল্যাণ তহবিলের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে জাগো নিউজকে বলেন, সম্প্রতি সংসদের গণসংযোগ অধিশাখা- ২ এর পরিচালক লাবণ্য আহমদের ব্লাড ক্যান্সার ধরা পড়ে। তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানো পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা। শহীদ বুদ্ধিজীবী শহীদুল্লাহ কায়সারের ভাগনী সবার কাছে মিষ্টি মেয়ে হিসেবে পরিচিত। ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার পর তার আর্থিক সহায়তার বিষয়টি সামনে আসে। তাকে দ্রুত ভারতে নেয়ার প্রয়োজন হলেও বাংলাদেশ কর্মচারী কল্যাণ বোর্ড অর্থ সহায়তা দিতে নানা ধরনের শর্ত বেধে দেয়। পরে সংসদে কর্মরতরা লাবণ্যকে প্রায় আট লাখ টাকা সংগ্রহ করে দেন। তারা স্বতন্ত্র কল্যাণ তহবিল গঠনেরও সিদ্ধান্ত নেন।

এডহক কমিটির আহ্ববায়ক সংসদের বিতর্ক ও সম্পাদনা বিভাগের পরিচালক মো. কামরুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে জাগো নিউজকে বলেন, বাংলাদেশে কর্মচারী কল্যাণ বোর্ড যেভাবে অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের বেতন থেকে টাকা কেটে রাখে, একইভাবে সংসদের প্রায় ১১শ’ কর্মকর্তা-কর্মচারীর মাসিক বেতন থেকে ৫০ টাকা করে কেটে রাখা হবে। সেই টাকা বিপদগ্রস্ত কোনো সদস্যের পেছনে ব্যয় করা হবে। তবে কোনো আর্থিক বছরে মূলধনের শতকরা দশভাগের অধিক ব্যয় করা যাবে না।

সূত্র জানায়, এডহক কমিটির প্রথম বৈঠক গত ১৮ মার্চ বিকেলে সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে খসড়া নীতিমালা উপস্থাপন করা হয়। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়, সংসদ সচিবালয়ের হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা কমিটির সাচিবিক দায়িত্ব পালন করবেন। তিনি কমিটির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন এবং কমিটি কর্তৃক প্রদত্ত দায়িত্ব ও কার্য সম্পাদন করবেন।

নীতিমালায় যা আছে

সংসদ সচিবালয় কর্মচারী কল্যাণ তহবিল (পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ) নীতিমালা- ২০১৮ অনুযায়ী, স্পিকার কর্তৃক প্রদত্ত বা স্পিকার কর্তৃক অনুমোদিত কোনো বিদেশি সরকার বা সংস্থা বা কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা বা অন্য কোনো উৎস হতে পাওয়া অনুদান নেয়া যাবে। তহবিলে টাকা দিতে পারবেন এমপিরাও। তহবিলের টাকা বিনিয়োগ করা যাবে। স্পিকার কর্তৃক অনুমোদিত কোনো লাভজনক খাতে তা বিনিয়োগ করতে হবে। তহবিলের টাকা কমিটির অনুমোদনক্রমে, কোনো তফসিলি ব্যাংকে জমা রাখা হবে।

কর্মচারীদের দেয়া চাঁদা প্রত্যেক কর্মচারী কমিটি কর্তৃক নির্ধারিত ও স্পিকার কর্তৃক অনুমোদিত হারে মাসিক চাঁদা কল্যাণ তহবিলে জমা দেবে। অর্থশাখা- ১ কর্মচারীর অতিরিক্ত খাটুনি ভাতা হতে প্রতি মাসে নির্ধারিত চাঁদার টাকা কেটে কল্যাণ তহবিলের নির্ধারিত ব্যাংক হিসাবে জমা করবে।

নীতিমালা অনুযায়ী, অর্থশাখা- ১ প্রতি মাসে জমাকৃত টাকার বিবরণীসহ ব্যাংকে জমার রশিদ সংসদ-সচিবের কাছে দাখিল করবেন। কল্যাণ তহবিল পরিচালনা ও প্রশাসন কমিটির উপর ন্যস্ত থাকবে। স্পিকার এ তহবিলের প্রধান পৃষ্ঠপোষক, ডেপুটি স্পিকার ও চিফ হুইপ পৃষ্ঠপোষক এবং সংসদ সচিব উপদেষ্টা হবেন।

নীতিমালা অনুয়ায়ী থাকবে একটি কমিটি

সংসদ সচিবালয়ে সরাসরি কিংবা পদোন্নতির মাধ্যমে স্থায়ীভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত জাতীয় বেতন স্কেল- ২০১৫ পাওয়া ব্যক্তিরা এ কমিটিতে থাকতে পারবেন। নবম গ্রেড বা তদুর্ধ গ্রেডভুক্ত পদের কর্মচারীদের মধ্য হতে পাঁচজন প্রতিনিধি, তাদের মধ্যে হতে একজন কমিটির চেয়ারম্যান নিযুক্ত হবেন। এছাড়া দশম গ্রেডভুক্ত পদের কর্মচারীদের মধ্য হতে চারজন প্রতিনিধি; ১৬তম গ্রেড হতে ১১তম গ্রেডভুক্ত পদের কর্মচারীদের মধ্য হতে চারজন প্রতিনিধি; ১৫তম গ্রেড হতে ২০তম গ্রেডভুক্ত পদের কর্মচারীদের মধ্য হতে চারজন প্রতিনিধি; সংসদ সচিবালয় মেডিকেল সেন্টারের চিফ মেডিকেল অফিসার; সংসদ সচিবালয় কর্মকর্তা ও কর্মচারী কল্যাণ সমিতির সভাপতি; সংসদ সচিবালয় কর্মকর্তা ও কর্মচারী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক এবং হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা, পদাধিকারবলে তিনি কমিটির সদস্য-সচিবও হবেন। সচিব তাদের নিয়োগ দেবেন। সদস্য মনোনয়নকালে কর্মচারীর সামাজিক কর্মকাণ্ডে তার সংশ্লিষ্টতাকে বিবেচনায় নেয়া হবে। মনোনীত সদস্যগণ পরপর দুবারের বেশি মনোনীত হতে পারবেন না।

মনোনীত সদস্যের মেয়াদ হবে তার মনোনয়নের পর প্রথম সভার দিন হতে পরবর্তী তিন বছর। যে কোনো মনোনীত সদস্য সংসদ সচিবের উদ্দেশ্যে স্বাক্ষরযুক্ত পত্রযোগে স্বীয় পদত্যাগপত্র পেশ করতে পারবেন এবং সংসদ সচিব কর্তৃক গৃহীত হবার তারিখ হতে উক্ত পদটি শূন্য হবে।

যা করলে কমিটির সদস্য পদ হারাবেন

যদি কমিটির কোনো সদস্য চেয়ারম্যানের অনুমতি ছাড়া পরপর তিনটি সভায় অনুপস্থিত থাকেন; পদোন্নতিজনিত বা অন্য কোনো কারণে তার সদস্যপদ বহাল রাখার জন্য প্রযোজ্য বেতনগ্রেড পরিবর্তন হওয়ার পরবর্তী ১৮০ দিন অতিবাহিত হয় কিংবা চাকরি হতে অবসরগ্রহণ কিংবা কোনো কারণে চাকরি হতে সাময়িক বরখাস্ত হন।

এইচএস/এমএআর/এমএস

আপনার মতামত লিখুন :