জামায়াতের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ছে শরিকদের

খালিদ হোসেন
খালিদ হোসেন খালিদ হোসেন , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১০:৩৭ এএম, ০৭ জুলাই ২০১৮

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি যখন বৃহত্তর ঐক্যের আহ্বান জানাচ্ছে ঠিক সেই মুহূর্তে প্রবল বজ্র মেঘের ঘনঘটা পরিলক্ষিত হচ্ছে ২০ দলীয় জোটের আকাশে।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন পুরনো এ জোটে হঠাৎ আসা কালবৈশাখীর ঘনঘটায় নিজেদের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে। এ সিটির নির্বাচনে মেয়র মনোনয়ন নিয়ে শক্ত অবস্থান নিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।

অন্যদিকে, জামায়াত ছাড়াই গঠন করা হয়েছে বরিশাল, সিলেট ও রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের সমন্বয় কমিটি। এমন পরিস্থিতিতে জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা তৈরি হলেও আপাতত বিএনপির দিকে ঝুঁকছেন অন্য শরিকরা।

গত বুধবার বিকেলে গুলশানে অবস্থিত বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে ২০ দলীয় জোটের বৈঠকের পর সমন্বয়কারী বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান ও দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সিলেটের মেয়র মনোনয়ন নিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন তাতে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন জামায়াত নেতারা।

২০ দলীয় জোটের ওই বৈঠকের পর অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘বৈঠকে সিলেট, রাজশাহী ও বরিশাল সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। সেখানে সিদ্ধান্ত হয় যে, তিন সিটিতে একক প্রার্থীর পক্ষে ২০ দল সম্মিলিত ও সক্রিয়ভাবে কাজ করবে। ওই তিন সিটিতে ২০ দলের একক প্রার্থী থাকবেন এবং তার পক্ষেই সবাই একযোগে কাজ করবেন।’

জোটের অন্যতম শরিক জামায়াতে ইসলামীর সিলেট মহানগর আমীর এহসান জুবায়েরের প্রার্থিতার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সময় এখনও শেষ হয়নি। আমরা বলেছি যে, প্রার্থী একজনই থাকবেন।’

‘সিলেটে জামায়াতে ইসলামী ছাড় দেবে না’- গণমাধ্যমে এমন বক্তব্য এসেছে। এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘সেটা তো তাদের বক্তব্য। আমাদের ২০ দলের বক্তব্য হচ্ছে, আমরা একক প্রার্থী নিয়েই নির্বাচন করব।’

সেক্ষেত্রে যদি বিএনপির প্রার্থীর সঙ্গে জামায়াতের প্রার্থীর নির্বাচন হয় তাহলে আপনারা কী করবেন- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটা নির্ভর করবে যখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে। বিষয়টি আপনারাও জানতে পারবেন। তবে আমরা সিলেটে যে প্রার্থী দিয়েছি (আরিফুল হক চৌধুরী) সেটাকে ২০ দল ইতোমধ্যে অনুমোদন দিয়েছে।’

সিলেটের প্রার্থী নিয়ে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের কোনো টানাপোড়ন হবে কি না- জানতে চাইলে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘কোনো টানাপোড়ন হয়নি। এখন পর্যন্ত প্রশ্নই ওঠেনি। আপনারা নিশ্চয়ই আমাদের রেজুলেশন লক্ষ্য করেছেন। সেখানে ‘২০ দল একত্রিতভাবেই কাজ করবে’- এমন কথা উল্লেখ আছে।’

নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘আজকের বৈঠকে জামায়াতে ইসলামীর প্রতিনিধি ছিলেন। তারা একমত হয়েছেন যে, তারা একক প্রার্থীর পক্ষে কাজ করবেন।’

বৈঠকে জামায়াতের প্রতিনিধি থাকলেও সংবাদ সম্মেলনে দলটির কেউ উপস্থিত ছিলেন না। তবে শরিকদের অনেকেই সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন। কেউ কেউ জরুরি কাজের কথা বলে বিএনপি চেয়ারপার্সনের গুলশান কার্যালয় ত্যাগ করেন। বিকেল ৪টায় শুরু হওয়া ওই বৈঠক শেষ করে সংবাদ সম্মেলন করা হয় সন্ধ্যা ৬টার পর।

বৈঠক সূত্র জানায়, বরিশাল সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ২০ দলীয় জোটের নির্বাচনী প্রচারণা টিমের সমন্বয়ক করা হয়েছে বিজেপির চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থকে। সিলেটে সম্বয়ক করা হয়েছে ইসলামী ঐক্যজোটের (একাংশ) চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আবদুর রকিবকে এবং সদস্য সচিবের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে খেলাফত মজলিসের মহাসচিব অধ্যাপক আহমদ আবদুল কাদেরকে।

রাজশাহী সিটিতে সমন্বয়ক করা হয়েছে এনডিপি চেয়ারম্যান খোন্দকার গোলাম মোর্ত্তজাকে এবং সদস্য সচিবের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে জাগপা সাধারণ সম্পাদক খন্দকার লুৎফর রহমানকে। প্রতীক বরাদ্দের পর তারা নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করবেন বলে জানা গেছে।

গত বুধবার ২০ দলের বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে দেয়া বক্তব্যে বিস্ময় প্রকাশ করেন জামায়াত নেতারা। ওইদিনই রাত ১০টার দিকে বিএনপি নেতাদের এমন বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় দলটির কেন্দ্রীয় প্রচার বিভাগ থেকে এক বিবৃতি গণমাধ্যমে পাঠানো হয়। বিবৃতিতে নজরুল ইসলাম খান ও ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে কোনো কোনো মিডিয়া যে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে তাতে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।

বিবৃতিতে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মাওলানা আবদুল হালিম বলেন, ‘বিএনপির গুলশান অফিসে ২০ দলীয় জোটের বৈঠকে আমি উপস্থিত ছিলাম। কতিপয় মিডিয়ায় প্রচারিত বিভ্রান্তিকর রিপোর্টে আমি বিস্ময় প্রকাশ করছি। সিলেট সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী হিসেবে জামায়াতের অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের রয়েছেন। এতে বিভ্রান্তির কোনো অবকাশ নেই।’

জামায়াতের এমন বিবৃতির পরিপ্রেক্ষিতে জোটের অন্যতম শরিক বাংলাদেশ ন্যাপের চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গাণি মুঠোফোনে জাগো নিউজকে বলেন, ‘বৈঠকে তো ওনারা ওনাদের বিষয়টি বলেছেন। তবে বৈঠকে আমাদের বলা হয় যে, ২০দলীয় জোটের একক প্রার্থী থাকাটাই বাঞ্চনীয়। সেই সেন্টিমেন্টটা উনি (জামায়াত নেতা আব্দুল হালিম) এবং সবাই নিজ নিজ দলীয় ফোরামে গিয়ে উপস্থাপন করবেন। তারপর তারা কী সিদ্ধান্ত দেয় সেটা তাদের ওখান থেকে আসতে হবে, তাদের কেন্দ্রীয় শূরা নাকি ওখান থেকে। তাহলে এ মুহূর্তে বিবৃতিটা আসলো কেন বুঝলাম না। ’

তিনি আরও বলেন, ‘টোটালি কনফিউজড আমি। এখানে জামায়াতে ইসলামী বা কেন হঠাৎ এত বেশি শক্ত অবস্থানে যাচ্ছে এটাকে কেন্দ্র করে।’

জোটের শীর্ষ এ নেতা বলেন, ‘বৈঠক শেষে নিচে যখন প্রেসকে বিবৃতি দেয়া হয়, তখন আমি ছিলাম না। সেখানে কী বলা হয়েছে, সেটা অবশ্য আমি বলতে পারব না। কিন্তু মিটিংয়ের মধ্যে সেরকম বিষয় ছিল না। অনেকেই জামায়াতে ইসলামকে অনুরোধ করেছেন যে, আপনারা অন্তত জোটের স্বার্থে, জোটের ভবিষ্যতের স্বার্থে হলেও আপনাদের প্রার্থীকে বুঝিয়ে সিদ্ধান্তটা পরিবর্তন করান। কিন্তু হঠাৎ করে কেন এ অবস্থান, তা বলতে পারব না।’

বরিশাল, সিলেট ও রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন ঘিরে জোটের পক্ষ থেকে সমন্বয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। সেখানে জামায়াতকে রাখা হয়নি- এমন বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, ‘রাখা হয়নি ঠিক নয়, আসলে যেটা হয়েছে সেটা হলো নজরুল ইসলাম খান সাহেবই মনে হয় তুললেন বিষয়টা… এ রকম সবখানেই তো আমরা কমিটি করেছিলাম। এবারের বিষয়টা নিয়ে আলাপ হলো। গত বৈঠকেও একটু আলাপ হয়েছিল কিন্তু বিস্তারিত হয়নি।’

গানি বলেন, ‘বিভাগ ভিত্তিক বরিশালে আন্দালিব রহমান পার্থকে বলা হলো যে তিনি বরিশাল বিভাগের দায়িত্বে। আমার নামটাও কিন্তু মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাহেব প্রস্তাব করেছিলেন রাজশাহীর জন্য। আমি বলেছিলাম, আমি তো এখন রাজশাহী বিভাগে নেই, আমি তো রংপুর বিভাগের হয়ে গেছি। আর আমার পক্ষে সম্ভব হবে না কারণ আমি একটু দেশের বাইরেও যাব। তখন ওইটা খন্দকার গোলাম মোর্ত্তজা সাহেবকে দেয়া হলো। হালিম সাহেব তো তখন উপস্থিত ছিলেনই।’

‘আর যেটা হয়, সত্যি কথা বলতে কী ম্যাডাম থাকলে যেটা হয়… কোনো কমিটি বা এরকম কোনো ইয়ে করা হতো, যেহেতেু জামায়াতে ইসলামী সবখানে যাতায়াত করতে পারে না, বৈঠক ডাকতে পারে না, পুলিশি বাধা থাকে সেজন্য জামায়াতকে বাদ দিয়ে সব সময় এসব কমিটি হয়েছে অতীতে। ম্যাডাম বাইরে থাকলেও এমনটি হয়েছে। তো জামায়াতে ইসলামীর বিষয়টা আমরা ধরেই নিতাম যে, জামায়াতের সঙ্গে ভিন্নভাবে সমন্বয় করছে বিএনপি। তাদের (জামায়াতে ইসলামী) বাদ রেখে কমিটি করা- এটা আমার মনে হয় সঠিক ব্যাখা নয়। ’

সিলেটের মেয়রপ্রার্থীর মনোনয়ন নিয়ে জামায়াতে ইসলামী ও জোটের বাকি শরিকদের মুখোমুখি যে অবস্থান তাতে পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কী ধরনের প্রভাব পড়বে- এমন প্রশ্নের জবাবে গানি বলেন, ‘এটা তো সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন, জাতীয় নির্বাচন নয়। একক প্রার্থী হলে যেভাবে আশাবাদী হওয়া যেত, আরেকটি পক্ষ দাঁড়িয়ে গেলে সেই আশা তো থাকে না। স্বাভাবিকভাবে শরিকদের মুখোমুখি অবস্থান ২০ দলের মধ্যে একটু সমস্যা বা সংকট তৈরি করবে। ২০ দলীয় জোট এখন ১৯ দল, বলতে পারেন। ১৯ দলীয় জোটের প্রার্থী যিনি আছেন তিনিই হবেন। আমি একটু অবাকই হচ্ছি।’

জামায়াতে ইসলামী যদি সিলেটে প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করে তাহলে কি জামায়াতকে বাদ দিয়ে আপনারা সামনে এগোবেন- জাবাবে গানি বলেন, ‘তা-ই হবে। এটাই স্বাভাবিক। এ মুহূর্তে আমি এর চেয়ে বেশি আর কিছু বলতে পারছি না। আসলে আপনার কথা শুনে অবাকই হচ্ছি।’

এদিকে, সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী দেয়া সম্পর্কে বিভিন্ন অসত্য তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে দলটির কেন্দ্রীয় প্রচার বিভাগ। শুক্রবার দলটির প্রচার বিভাগের সেক্রেটারি অধ্যাপক তাসনীন আলম এর তীব্র প্রতিবাদ করে এক বিবৃতিতে জানান, সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে প্রার্থী দেয়া সম্পর্কে অসত্য তথ্য পরিবেশন করা হয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, ‘সিলেটে জামায়াতের প্রার্থী দেয়া হয়েছে দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী। আওয়ামী লীগের কোনো নেতার সঙ্গে জামায়াতের সেক্রেটারির সম্পর্ক থাকা বা তার আগ্রহে জামায়াতের প্রার্থী দেয়ার প্রশ্নই আসে না। জামায়াত কাজ করে দলীয় সিদ্ধান্তে, কারও একক সিদ্ধান্তে নয়। কোনো কোনো পত্রিকার রিপোর্টে ‘জামায়াত সিলেটে প্রার্থী দিয়ে ২০ দলীয় জোটের সিদ্ধান্ত লঙ্ঘন করেছে’ মর্মে যে কথা লেখা হয়েছে, তা সর্বৈব মিথ্যা।’

‘সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ২০ দলীয় জোটের প্রার্থীর ব্যাপারে এখনও চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। কাজেই সিলেটে প্রার্থী দিয়ে জামায়াতের ২০ দলীয় জোটের সিদ্ধান্ত লঙ্ঘনের প্রশ্ন অবান্তর।’

কেএইচ/এমএআর/এমএস

আপনার মতামত লিখুন :