খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তাই শেখ হাসিনার বড় ভয়

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১০:৫৩ এএম, ০৫ জুলাই ২০১৮

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিএনপির নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটির সদস্য। সাবেক মন্ত্রী। গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন দলীয় কর্মকাণ্ডে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং খালেদা জিয়ার মুক্তির প্রসঙ্গে সম্প্রতি মুখোমুখি হন জাগো নিউজের।

দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন তিনি। আসছে সংসদ নির্বাচন গ্রহণযোগ্য না হলে গণতন্ত্র বিপন্ন হবে বলেও মত দেন। আলোচনায় উঠে আসে সম্প্রতি বিএনপির পক্ষ থেকে ভারত সফর এবং লন্ডনে থেকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন হিসেবে দায়িত্ব পালন করা তারেক রহমানের দেশে ফেরার প্রসঙ্গও।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সায়েম সাবু। তিন পর্বের শেষটি থাকছে আজ।

জাগো নিউজ : নির্বাচনের আর কয়েক মাস বাকি। প্রতিবার নির্বাচনের আগে আন্তর্জাতিক মহল তৎপর হয়। এবার সেই তৎপরতায় ঘাটতি দেখা যাচ্ছে কিনা?

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী : সরকারের ওপর প্রচুর চাপ সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিনিয়ত বিশ্বমহল বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছে।

ইউরোপীয় পার্লামেন্ট, ব্রিটিশ পার্লামেন্টে বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। অন্য দেশের পার্লামেন্টে যখন বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হয়, তখন বুঝতে হবে বাংলাদেশের নির্বাচনে বৈধতার ঘাটতি রয়েছে। যারাই বাংলাদেশে আসছেন তারাই নিরপেক্ষ নির্বাচন, আইনের শাসন নিয়ে কথা বলছেন। বেগম খালেদা জিয়াকে যখন জেল দেয়া হলো, তখন জাতিসংঘের মহাসচিব বিবৃতি দিয়ে বললেন, এ ঘটনা আগামী নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করবে।

গাজীপুরের নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত উদ্বেগ প্রকাশ করলেন। এমন উদ্বেগ অবশ্যই একটি বিশেষ বার্তা। সরকার যদি কানে তুলা দিয়ে না শোনার ভান করে, তাহলে আর কী করার আছে?

জাগো নিউজ : সরকার তো সমালোচনাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবেই নিয়েছে?

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী : জার্মান সরকারের অর্থে পরিচালিত একটি এনজিও বাংলাদেশকে একটি স্বৈররাষ্ট্র বলে উল্লেখ করেছে। আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশকে স্বৈররাষ্ট্র বলে ঘোষণা দিয়েছে। আইনের শাসন লঙ্ঘিত হচ্ছে বলে প্রতিনিয়ত মানবাধিকার সংস্থাগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করছে।

এ পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগ ও লজ্জার। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার এখন ন্যায় ও অন্যায়কে আমলে নিচ্ছে না।

জাগো নিউজ : এর শেষ কোথায়?

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী : কোনো স্বৈর সরকারের বিদায় ভালো হয় না। স্বৈরাচার নিপাত যায় করুণ পরিণতির মধ্য দিয়ে। একদলীয় শাসন, এরশাদের বিদায়, ফখরুদ্দীন সরকারের বিদায় ভালো হয়নি। অনির্বাচিত সরকার চিরদিন টিকে থাকে না। জনগণের শক্তির কাছে সবাই পরাজিত হয়।

জাগো নিউজ : খুলনা, গাজীপুরে বিএনপি হারলো। আসন্ন তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে বিএনপির অবস্থান কী?

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী : আমরা নির্বাচনের পক্ষে। বিএনপি এবং খালেদা জিয়া এখন যে সবচেয়ে জনপ্রিয়, তার প্রমাণ মিলছে সাম্প্রতিক সময়ের নির্বাচনগুলোতে। সরকারের ভীতি থেকেই সবকিছু পরিষ্কার হয়ে আসছে।

জাগো নিউজ : তার মানে রাজশাহী, সিলেট ও বরিশালের নির্বাচনে থাকছে বিএনপি?

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী : জনগণের জন্য আমরা বিকল্প পথ খোলা রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাব। আমরা সব নির্বাচনেই জনগণের জন্য দরজা খোলা রাখতে চাই।

জাগো নিউজ : ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে আপনারাও দরজা বন্ধ রেখেছিলেন নির্বাচনে অংশ না নিয়ে…

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী : ২০১৪ সালের নির্বাচনের প্রেক্ষাপট কী ছিল, তা সবারই জানা।

আরও পড়ুন >> নির্বাচনে গিয়ে সরকারের স্বরূপ উন্মোচন করছি

জাগো নিউজ : এবার কী করবেন?

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী : সময়ই বলে দেবে। জনগণের সিদ্ধান্তই আমাদের কাছে বড়। একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে মানুষ তার মতের প্রতিফলন ঘটাবে, এটিই তো রাজনীতির মূল লক্ষ্য।

জাগো নিউজ : নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে এখন কী ভাবছেন?

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী : দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন নিরপেক্ষ হয় না, আওয়ামী লীগ বারবার তার প্রমাণ দিয়েছে। এ কারণে আওয়ামী লীগের ওপর আস্থা রাখার কোনো কারণ নেই। যেভাবে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা সম্ভব, আমরা সেভাবেই রূপরেখা দেব।

জাগো নিউজ : সরকার তো তার অবস্থানে অনড়…

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী : সময়ই সব বলে দেবে। স্বৈরাচার সবসময়ই অনড় থাকে। সর্বশেষ বাঘের পিঠে চড়েও নামার উপায় থাকে না।

জাগো নিউজ : সরকারের সঙ্গে কোনো আলোচনা...

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী : আলোচনার বিষয়টি নির্ভর করবে সরকারের আন্তরিকতার ওপর। আওয়ামী লীগ তো সব আলোচনার বিষয়ই উড়িয়ে দিচ্ছে। আমরা আনুষ্ঠানিকতার উদ্যোগ নিতেই পারি। কিন্তু সরকার না চাইলে তো কোনো লাভ নেই। সরকারের কথায় গণতন্ত্রের কোনো ইঙ্গিত মিলছে না।

জাগো নিউজ : তৃতীয় শক্তি বা জোট নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। যদি গঠিত হয়, তৃতীয় জোটকে কীভাবে স্বাগত জানাবেন?

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী : মানুষ জগদ্দল পাষাণ থেকে মুক্তি চায়। এ মুক্তির ঠিকানায় যারাই আসবেন আমরা তাদেরই স্বাগত জানাব।

জাগো নিউজ : এ মুক্তির আন্দোলনে বিএনপি কোনো অন্তরায় কিনা? অর্থাৎ বিএনপি অন্যের পথ রুদ্ধ করে রেখেছে কিনা? 

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী : আমরা কারও পথ বন্ধ করে রাখিনি। আমরা এ দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছি। অন্য কোনো দল বা জোট যদি এসে তাদের অবস্থান তৈরি করে, আমরা অবশ্যই সাধুবাদ জানাব।

বেগম খালেদা জিয়া গণতন্ত্রের প্রশ্নে কোনো আপস করেননি। ভবিষ্যতেও করবেন না। মানুষ মুক্তি চায়। ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সেই মুক্তি আসবে। আওয়ামী লীগ রাজনীতি, অর্থনীতি, বিচার ব্যবস্থা সবই ধ্বংস করেছে। এখন মুক্তি জরুরি। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে যারাই আন্দোলনের ডাক দেবে বিএনপি তাদের সঙ্গে থাকবে। ঘরে আগুন লেগেছে। সবার কাছেই পানি প্রত্যাশা করছি।

জাগো নিউজ : বিএনপিপ্রধান বেগম খালেদা জিয়ার জামিন মিলছে কিন্তু মুক্তি মিলছে না। কী দেখছেন খালেদা জিয়ার জামিনের ভবিষ্যৎ?

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী : সঠিক বিচারের মধ্য দিয়ে খালেদা জিয়ার সাজা দেয়া হয়নি। সরকার যা চাইছে, তাই হচ্ছে। এ কারণে বিচারিক ব্যবস্থায় খালেদা জিয়ার মুক্তি বা জামিন প্রত্যাশা করা ঠিক হবে না। আবারও ক্ষমতায় যেতে খালেদা জিয়াকে জেলে রাখা হয়েছে।

জাগো নিউজ : গণতন্ত্রের মুক্তির কথা বলছিলেন। অথচ খালেদা জিয়ার মুক্তির আন্দোলনে ব্যর্থ বিএনপি…

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী : ব্যর্থ মনে করার কোনো কারণ নেই। ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে আমাদের আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে। গণতন্ত্র এবং খালেদা জিয়ার মুক্তির আন্দোলন একসঙ্গে চলছে এবং চলবে।

jagonews24

জাগো নিউজ : আগামী জাতীয় নির্বাচন এবং খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি কীভাবে মেলাবেন?

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী : খালেদা জিয়া জেলে থাকলে আওয়ামী লীগের ফের ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন কখনও সফল হবে না।

জাগো নিউজ : তার মানে খালেদা জিয়া জেলে থাকলে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেবে না? 

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী : আমরা এখনও কোনো সিদ্ধান্ত নেইনি। সময় আসলেই সব জানতে পারবেন। খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তাই শেখ হাসিনার বড় ভয়।

জাগো নিউজ : এত জনপ্রিয় নেত্রীর জেলে থাকা বিএনপির কাছে বেমানান নয় কি?

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী : আওয়ামী লীগ সবচেয়ে খারাপ রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে। তিনবারের নির্বাচিত একজন প্রধানমন্ত্রীকে মিথ্যা মামলা দিয়ে জেলে দিয়েছে। এটি গোটা জাতির জন্য লজ্জার।

জাগো নিউজ : সামনের নির্বাচন নিয়ে কতটুকু আশাবাদী?

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী : সরকার জনমতকে আমলে নিলেই আমরা নির্বাচন নিয়ে আশাবাদী।

জাগো নিউজ : তারেক রহমানের দেশে ফেরা নিয়ে কী বলবেন?

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী : যেখানে আইনের শাসন নেই, সেখানে তার ফিরে আসা নিরাপদ মনে করি না। আইনের শাসন থাকলে, তিনি আদালতের শরণাপন্ন হতেন। দেশে আর বিচার নেই। বুনো শাসনে কোনো সভ্য লোকের আশ্রয় হয় না। বুনো শাসন চলছে, তার দেশে ফেরাও নিরাপদ নয়।

জাগো নিউজ : তারেক রহমান দেশের বাইরে থেকেই-বা কী ফল পাচ্ছেন?

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী : যেখানে জীবনের নিরাপত্তা নেই সেখানে এসে ভালো কিছু আশা করা যায় না। খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার অনুমতি পর্যন্ত দেয়া হচ্ছে না।

অনেক দেশের নেতা দেশের বাইরে থেকেও রাজনীতি পরিচালনা করছেন। স্বৈরাচার সরকারের আমলে দেশের বাইরেই বরং নিরাপদ। প্রযুক্তির এদিনে অবস্থান কোনো বাধা হতে পারে না।

এএসএস/এমএআর/আরআইপি

 

জনগণের জন্য আমরা বিকল্প পথ খোলা রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাব। আমরা সব নির্বাচনেই জনগণের জন্য দরজা খোলা রাখতে চাই

আওয়ামী লীগের ওপর আস্থা রাখার কোনো কারণ নেই। যেভাবে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা সম্ভব, আমরা সেভাবেই রূপরেখা দেব

আওয়ামী লীগ তো সব আলোচনার বিষয়ই উড়িয়ে দিচ্ছে। আমরা আনুষ্ঠানিকতার উদ্যোগ নিতেই পারি। কিন্তু সরকার না চাইলে তো কোনো লাভ নেই

অন্য কোনো দল বা জোট যদি এসে তাদের অবস্থান তৈরি করে, আমরা অবশ্যই সাধুবাদ জানাব

আপনার মতামত লিখুন :