প্রার্থীদের দাঁতে দাঁত, সমর্থকদের কপালে ভাঁজ!

খালিদ হোসেন
খালিদ হোসেন খালিদ হোসেন , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০১:৫৯ এএম, ৩০ নভেম্বর ২০১৮

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে বিএনপির ‘নির্বাচনী কৌশলে’ দলটির সম্ভাব্য প্রার্থীরা যেমন চাপে রয়েছেন, তেমনি দুশ্চিন্তায় তাদের সমর্থকরা। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য ৩০০ আসনের বিপরীতে বিএনপি আট শতাধিক নেতাকে দলের প্রাথমিক মনোনয়ন দিয়েছে। এক আসনে একের অধিক প্রার্থী থাকায় প্রার্থী এবং সমর্থকরা পড়েছেন দ্বিধা-দ্বন্দ্বে।

প্রাথমিক মনোনয়ন পেয়ে শেষ পর্যন্ত দলের গুরুত্বপূর্ণ যে কয়েকজন নেতা তা দাখিল করেননি তাদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল। প্রার্থী প্রক্রিয়া থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্তে কর্মীদের প্রতিক্রিয়া কেমন দেখতে পাচ্ছেন জানতে চাইলে আলাল জাগো নিউজকে বলেন, ‘কোনো প্রতিক্রিয়া নাই, কর্মীদের জিজ্ঞেস করলে ভালো হয়। আমি প্রতিক্রিয়া খুঁজতে যাই নাই।’

দলীয় মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ, জমাদান, সাক্ষাৎকার প্রদান এবং প্রাথমিক মনোনয়নপত্র গ্রহণ- এসব স্তর পার করার পর প্রার্থী হওয়ার প্রক্রিয়া থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্তের কারণ হিসেবে আলাল বলেছেন, ‘বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান নির্বাচন করতে পারছেন না, সে কারণে আমি আমার মনোনয়নপত্র জমা দেইনি।’

আলালের প্রার্থী হওয়ার প্রক্রিয়া থেকে সরে দাঁড়ানোর বিষয়কে দলের ‘নির্বাচনী কৌশল’ হিসেবে মন্তব্য করেছেন বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান।

প্রত্যেক আসনে একাধিক প্রার্থীকে প্রাথমিক মনোনয়ন দেয়াও বিএনপির ‘নির্বাচনী কৌশল’ বলে জানান দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন।

তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করছি, সামনের দিনে সরকার আরও নির্যাতন চালাবে। ত্রাসের পরিবেশ সৃষ্টি করবে। এ সময় মনোনয়নপ্রত্যাশী আরও অনেকেই গ্রেফতার হতে পারেন, কারও কারও মনোনয়ন বাতিল হতে পারে। আশঙ্কা করছি, গুম হয়ে যেতে পারেন নেতারা। এ কারণেই আমরা প্রতিটি আসনে একাধিক প্রার্থীকে মনোনয়ন জমা দিতে বলেছি।’

নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘মনোনয়ন বাছাইয়ের পর প্রত্যাহারের আগে প্রার্থী চূড়ান্ত করা হবে।’

দলের মনোনয়ন প্রক্রিয়া নিয়ে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ওমর ফারুক শাফিন তার ফেসবুক ওয়ালে দেয়া পোস্টে লিখেছেন, ‘দল নমিনেশন দিচ্ছে? নাকি প্রার্থীগণ নিচ্ছেন বুঝতে পারতেছি না।’

তার এই পোস্টে নির্বাহী কমিটির আরেক সদস্য ওবায়দুল হক নাসির মন্তব্য করেছেন, ‘কেউ দিচ্ছে, কেউ নিচ্ছে আমরা দেখছি। মার্কা আপাতত ধানের শীষ এর মধ্যেই আছি।’

বিএনপির প্রাথমিক মনোনয়ন পেয়ে পাবনার চাটমোহর উপজেলা চেয়ারম্যান পদ থেকে পদ পদত্যাগ করেছেন হাসাদুল ইসলাম হীরা। হীরাসহ সেখানে তিনজন বিএনপির প্রাথমিক মনোনয়ন পেয়েছেন।

তার সমর্থক চাটমোহর পৌর ছাত্রদলের সভাপতি তৌহিদুল ইসলাম তাজুল বলেন, ‘চাটমোহর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হাসাদুল ইসলাম হীরা পাবনা-৩ আসনের জনগণের সবচেয়ে পছন্দের নেতা। ওয়ান-ইলেভেনের পর থেকে তিনি চাটমোহরে বিএনপিকে উজ্জীবিত করে রেখেছেন। বিরোধীদলে থেকেও চাটমোহরবাসী তাকে পৌর মেয়র নির্বাচিত করেছেন। তিনি উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন, বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত থাকায় দুইবার তাকে উপজেলা চেয়ারম্যানের পদ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। কিন্তু জনগণের ভালোবাসায় তিনি আবার উপজেলা চেয়ারম্যানের দায়িত্ব ফিরে পেয়েছেন। তার মতো একজন দুঃসময়ের কাণ্ডারি, জনপ্রিয় নেতাকে যদি চূড়ান্ত মনোনয়ন দেয়া না হয় তাহলে কর্মীরা বিমুখ হবে।’

কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলা ছাত্রদলের সাংস্কৃতিকবিষয়ক সম্পাদক মো. আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও ক্ষমতাসীনদলসহ অন্য যেকোনো নেতার চেয়ে দেবীদ্বারের জনগণ আলহাজ আব্দুল আউয়াল খানের ওপর ভরসা রাখে। জনগণ এলাকায় এমন একজন নেতা চায় যে সুখে দুঃখে সবসময় তাকে পাশে পাওয়া যায়, আব্দুল আউয়াল খান তেমনি একজন। আব্দুল আউয়াল খান আমাদের শিখিয়েছেন দলীয় হাইকমান্ড যে সিদ্ধান্ত দেবে দেবীদ্বারের জাতীয়তাবাদী শক্তির কর্মীরা সেই সিদ্ধান্তে কাজ করবে। আউয়াল খানের বাইরে কেউ চূড়ান্ত মনোনয়ন পেলে জাতীয়তাবাদী শক্তির কর্মীরা তথা জনগণের মধ্যে হতাশা তৈরি হবে।’

গোপালগঞ্জ-১ আসন থেকে প্রাথমিকভাবে মনোনয়ন পেয়েছেন সেলিমুজ্জামান মোল্যা সেলিমসহ কয়েকজন। বাবুল সিকদার নামে তার একজন কর্মী বলেন, ‘গোপালগঞ্জ-১ আসনে সেলিমুজ্জামান সেলিম সেটেল্ড প্রার্থী। এখানে অন্য কোনো কাউকে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেয়া হবে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। কারণ গোপালগঞ্জে আসন না পাওয়া যাবে না। কিন্তু দলকে শক্তিশালী করতে সেলিমুজ্জামান সেলিমের বিকল্প কেউ নেই। সুতরাং অন্য কেউ মনোনীত হলে তার অনুসারীরা হতাশ হবে।’

ফরিদপুর-২ আসনের শহিদুল ইসলাম বাবুল বলেন, ‘একাধিক প্রার্থী রাখা হয়েছে বাদপড়ার আশঙ্কা থেকে। সেই ক্ষেত্রে দল যদি মনোনয়ন তুলে নিতে বলে, তাহলে চূড়ান্ত প্রার্থীর পক্ষেই কাজ করবো। তাছাড়া মনোনায়নই বড় কথা নয়। রাজনীতিতে সক্রিয় থাকাই মূল কথা।’

এদিকে আওয়ামী লীগ থেকে সদ্য বিএনপিতে এসে পটুয়াখালী-৩ আসনে মনোনয়ন পেয়েছেন গোলাম মাওলা রনি। তাকে মনোনীত করায় স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছে বলে জানান তিনি।

এ নিয়ে গলাচিপা উপজেলা বিএনপির সভাপতি গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘পটুয়াখালী-৩ আসনে তিনজনকে মনোনয়নের চিঠি দিয়েছে হাইকমান্ড। এতে কিছুটা দ্বিধায় পড়েছেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা। তবে আগামী ৮ তারিখ বিএনপির পক্ষ থেকে প্রার্থী নিশ্চিত করা হতে পারে। তখন যাকেই মনোনয়ন দেয়া হবে তার পক্ষে কাজ করবে স্থানীয় বিএনপি।’

ওই এলাকায় বিএনপির আরেকজন মনোনয়ন পাওয়া হাসান মামুন বলেন, ‘নির্বাচনের সময় নীতি-নৈতিকতাকে বিসর্জন দিয়ে এক দলের নেতা আরেক দলে অবস্থান নেয়, এটা আমি ঘৃণা করি। আমাকে কেন্দ্র মূল্যায়ন করবে এটা আশা করি।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির একজন ভাইস চেয়ারম্যান বলেন, ‘মূল প্রার্থী ঘোষণা না করে প্রত্যেক আসনে একাধিক ব্যক্তিকে মনোনয়ন দেয়ায় সম্ভাব্য প্রার্থীদের দাঁতে দাঁত রেখে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। আর সমর্থকরা এই ভেবে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন যে তাদের নেতা চূড়ান্ত মনোনয়ন পাবেন কি-না। চূড়ান্ত মনোনয়নের পর নেতাদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হলে সে পরিস্থিতি দল কতটা সামাল দিতে পারবে তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়।

তিনি বলেন, আসনপ্রতি একাধিক প্রার্থী বা নেতা না পেলে তার সন্তান বা স্ত্রীকে মনোনয়ন দেয়ার যে বিষয় এতে করে মাঠের নেতাদের মধ্যে কিছুটা হতাশা তৈরি হয়েছে। দলের কৌশলগত অবস্থান যা-ই থাকুক না কেন যদি মূল প্রার্থী ঘোষণা করে তার সঙ্গে ডামি প্রার্থী দিলে নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধ হতে পারতো।

কেএইচ/বিএ