নির্বাচন ঘিরে অনিশ্চয়তা দেখছি না

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৬:৫৭ পিএম, ০২ ডিসেম্বর ২০১৮

আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। রাজনীতি ও নির্বাচন প্রসঙ্গ নিয়ে মুখোমুখি হন জাগো নিউজ’র।

সব দলের অংশগ্রহণে দেশে একটি নির্বাচনী পরিবেশ বিরাজ করছে বলে উল্লেখ করেন। ঐক্যফ্রন্টকে স্বাগত জানালেও এর নেতৃত্বের আদর্শ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ‘আদর্শহীন রাজনীতি সমাজের ওপর বিরূপ প্রভাব রাখছে’ বলে মত দেন। আসন্ন নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন। দুই পর্বের সাক্ষাৎকারের আজ থাকছে প্রথমটি।

জাগো নিউজ : বাংলাদেশের রাজনীতিতে বর্তমানে যে সংকট তা মূলত নির্বাচন ঘিরে। ফের নির্বাচনের দিনক্ষণ ধার্য হয়েছে, উদ্বেগও আছে। কীভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনীতি?

আরেফিন সিদ্দিক : গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই। সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় নির্দিষ্ট সময় অন্তর নির্বাচন হবে, এটিই হচ্ছে সাংবিধানিক বিধি-ব্যবস্থা।

গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় ফের নির্বাচনের আয়োজন চলছে দেশে। তফসিল ঘোষণার পর রাজনীতিতে বিশেষ পরিবর্তনও এসেছে। নিবন্ধিত ৩৯টি দল নির্বাচনে অংশ নিতে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছে। সার্বিক বিবেচনায় মনে হচ্ছে, দেশে একটি নির্বাচনমুখী পরিবেশ তৈরি হয়ে গেছে।

জাগো নিউজ : আপনি বলছেন, নির্বাচনমুখী পরিবেশ তৈরি হয়ে গেছে। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন। কমিশন সরকারের হয়ে পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করছে বলে অভিযোগ বিরোধীদের…

আরেফিন সিদ্দিক : নির্বাচন ঘিরে অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ আমাদের রাজনীতির সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। নির্বাচনের পরও অভিযোগ ওঠে। যারা পরাজিত হন, তারা কারচুপির অভিযোগ তোলেন জোরেসোরে।

একে-অপরের প্রতি বিশ্বাসযোগ্যতা না থাকায় আন্তঃদলীয় সম্পর্ক এখন নিম্ন পর্যায়ে। দলগুলোর মধ্যে আন্তঃযোগাযোগ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অথচ আমাদের এখানে আন্তঃদলীয় সম্পর্কের একটি মজবুত ভিত্তি ছিল।

জাগো নিউজ : সর্ম্পকের এ অবনমনের জন্য কোন বিষয়কে দায়ী করবেন?

আরেফিন সিদ্দিক : স্বাধীনতার পর আমরা দেখেছি, বঙ্গবন্ধু সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে পরামর্শ করে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন।

বিভিন্ন আদর্শের ভিত্তিতে রাজনৈতিক দল গঠন হতেই পারে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সেই পরিবেশ আর থাকেনি। আবার ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার পর রাজনৈতিক দলগুলোর সম্পর্কে পঙ্গুত্ব তৈরি হয়। সম্পর্কের মধ্যে একটি দেয়াল তৈরি হয়। একটি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে নিশ্চিহ্নের ষড়যন্ত্র দ্বিতীয়টি আর নেই। একটি ক্ষমতাসীন দল বিরোধী দলের ওপর এভাবে নির্যাতন করতে পারে, তা অচিন্তনীয়। মূলত পারস্পরিক অবিশ্বাস তীব্র হয়েছে গ্রেনেড হামলার পর থেকেই।

জাগো নিউজ : অবিশ্বাস দূর করার দায়িত্ব বর্তমান ক্ষমতাসীন দলেরও?

আরেফিন সিদ্দিক : এমন দূরত্ব রাতারাতি দূর করা সম্ভব নয়। দূর করা যায়ও না।

তবে গণতান্ত্রিক উপায়েই মুক্তি সম্ভব। নির্বাচন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক ধারা গতিশীল করা যায়, তাহলে অবিশ্বাস কিছুটা কমবে বলে বিশ্বাস করি। তবে চলমান অবিশ্বাসের রাজনীতি থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসা দুষ্কর।

জাগো নিউজ : এই অবিশ্বাসের রাজনীতি সমাজের ওপর কী প্রভাব ফেলছে?

আরেফিন সিদ্দিক : খারাপ বিষয়ের প্রভাব খারাপই হয়। সমাজে অবিশ্বাস, অস্থিরতা তো বাড়ছেই। এ কারণে রাজনীতিতে আজ অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ বিরাজমান। এর মধ্য দিয়ে জাতি বিভ্রান্ত হয় মাত্র।

এমন অবিশ্বাসের রাজনীতি যে সমাজকে অনিশ্চয়তার দিকে নিয়ে যায়, তা তো অস্বীকার করা যাবে না। এরপরও আমরা মনে করি, বর্তমান যতই খারাপ হোক, ভবিষ্যৎ যেন ভালো হয়। আমরা ভালোর দিকে যেতে চাই।

আমি মনে করি, রাজনৈতিক সহনশীলতার সময় এসেছে। পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা, সমীহ থাকলেই রাজনীতি পরিশালিত হবে। দায় সবার। একটি দল ষড়যন্ত্র করলে অন্যরাও সেই পথ অবলম্বন করতে চাইবে।

জাগো নিউজ : আসন্ন নির্বাচন ঘিরেও রাজনীতি অনিশ্চিয়তার দিকে- এমনটি মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ। আপনার বিশ্লেষণ কী?

আরেফিন সিদ্দিক : আমি এ নির্বাচন ঘিরে অনিশ্চয়তা দেখছি না। সবাই এখন নির্বাচনমুখী। এমনকি যারা সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের বিরোধিতা করে আসছেন, তারাও এখন নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত।

তফসিল ঘোষণার পর রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তাতে রাজনীতির আবহাওয়া একপ্রকার নিশ্চয়তার বার্তা দিচ্ছে। নির্বাচন এলেই বাংলাদেশে উৎসব দেখা যায়। মনোনয়নপত্র পাওয়া থেকে ভোটের দিন পর্যন্ত আনন্দঘন পরিবেশ বিরাজ করে। এখন আমরা সেই আনন্দই দেখতে পাচ্ছি।

যে উৎসব আমরা দেখতে পাচ্ছি, তাতে যদি বিশেষ কোনো দল বা গোষ্ঠী নির্বাচন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত না হয়, তাহলে বড় ধরনের কোনো সমস্যা হবে- তা মনে করি না।

জাগো নিউজ : ২০১৪ সালে বিএনপি নির্বাচন বয়কট করায় বড় ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হয়েছিল বলে মনে করা হয়…

আরেফিন সিদ্দিক : ওই নির্বাচন বয়কট করে মূলত বিএনপিই চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমার ধারণা, বিএনপি এখন সেটা উপলব্ধি করে। যে কোনো ব্যক্তি বা দল নির্বাচন বয়কট করতেই পারে। কিন্তু নির্বাচন প্রতিহতের বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। নির্বাচন প্রতিহত করা কোনো রাজনীতি হতে পারে না।

জাগো নিউজ : গতবারের মতো নির্বাচন প্রতিহতের কোনো ইঙ্গিত পাচ্ছেন কিনা?

আরেফিন সিদ্দিক : আমি এখন পর্যন্ত তেমন কোনো ইঙ্গিত বা শঙ্কাবোধ করছি না। নির্বাচন বয়কট করে বিএনপি এখন অস্তিত্ব সংকটে। তারা ওই সংকট স্থায়ী করবে বলে মনে করি না। বরং তারা নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এবার নির্বাচনে অংশ নেবে।

জাগো নিউজ : এর বিপরীতেও আলোচনা আছে। বিএনপি গতবার নির্বাচন বয়কট করে আওয়ামী লীগকে চরম বিতর্কিত করেছিল- এমনটি মনে করে বিরোধী পক্ষ। গত পাঁচ বছর আওয়ামী লীগ এক ধরনের চ্যালেঞ্জের মধ্যে ছিল…

আরেফিন সিদ্দিক : চ্যালেঞ্জ হয়েছে বটে। তবে তা ধোপে টেকেনি। সব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে পূর্ণ মেয়াদ ক্ষমতায় থেকে সরকার জনমনে আস্থা তৈরি করেছে। এজন্য আওয়ামী লীগ অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে।

সরকার টানা ১০ বছর ক্ষমতায় থেকে উন্নয়নের যে ধারা তৈরি করেছে, তাতে মানুষ অতীতের বিতর্ক ভুলে গেছে বলে মনে করি।

জাগো নিউজ : ২০১৪ সালের পর একটি সুষ্ঠু নির্বাচন দেয়ার কথা ছিল। সেটি না দেয়ায় আজ রাজনীতির সংকট। অস্বস্তি তো আছেই…

আরেফিন সিদ্দিক : সংকট স্থায়ী রূপ পায়নি। সরকার পূর্ণ মেয়াদে দায়িত্ব পালন করে তা প্রমাণ করেছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি দিয়ে পাশে থেকেছে। বাংলাদেশে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতেই প্রমাণিত হয় যে, দেশের জনগণ ও বিশ্ব সরকারের প্রতি সমর্থন অটুট রেখেছে।

যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে বিএনপি নির্বাচন বর্জন করেছিল, তা তারা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে করি।

এএসএস/এমএআর/জেআইএম

সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় নির্দিষ্ট সময় অন্তর নির্বাচন হবে, এটিই হচ্ছে সাংবিধানিক বিধি-ব্যবস্থা

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার পর রাজনৈতিক দলগুলোর সম্পর্কে পঙ্গুত্ব তৈরি হয়

তফসিল ঘোষণার পর রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তাতে রাজনীতির আবহাওয়া একপ্রকার নিশ্চয়তার বার্তা দিচ্ছে

আপনার মতামত লিখুন :