জামায়াতকে নিষিদ্ধ না করেই আওয়ামী লীগ রাজনীতি করছে

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১০:০৪ পিএম, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৮

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি। নেতৃত্ব দিচ্ছেন বাম গণতান্ত্রিক জোটেরও।

বামপন্থী এ রাজনীতিকের জন্ম ১৯৪৮ সালের ১৬ এপ্রিল ঢাকার অদূরে সাভারে। ছাত্র থাকাকালীন ১৯৬৬ সালে আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে মিছিল করতে গিয়ে কারাবরণ করেন। কলেজে পা দিয়েই সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়েন বামপন্থী ছাত্র আন্দোলন ও রাজনীতিতে। এ সময় গোপনে কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি ছিলেন। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) প্রথম সহ-সভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে অনার্স ও মাস্টার্স করেন সেলিম।

আরও পড়ুন >> সুষ্ঠু নির্বাচনের ক্ষমতা রাখে না এই কমিশন

আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও রাজনীতি প্রসঙ্গে মুখোমুখি হন জাগো নিউজ’র। নির্বাচন কমিশনের পক্ষপাতমূলক আচরণের কারণে নির্বাচনের মাঠ সংঘাতময় হচ্ছে বলে মনে করেন। এবার নির্বাচন ব্যর্থ হলে বিপদ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। দুই জোটের বাইরে মানুষ বিকল্প বামবলয়ে আসতে চাইছে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। দুই পর্বের সাক্ষাৎকারের শেষটি প্রকাশিত হলো আজ।

জাগো নিউজ : নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা বা চলমান পরিস্থিতি নিয়ে কী বলবেন?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : নির্বাচন নিয়ে যে আশঙ্কা করেছিলাম, এখন তাই দেখতে পাচ্ছি। নির্বাচন কমিশন পক্ষপাতের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। সরকার রাষ্ট্রীয় শক্তি প্রয়োগ করে যেনতেন উপায়ে ফের ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে চাইছে।

সরকার জোর করে মিডিয়া দখলে রাখছে। প্রচারে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী রাখতে চাইছে না। বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে ভয় দেখাচ্ছে। পোস্টার ছিঁড়ে ফেলছে। প্রতিনিয়ত হুমকি দিচ্ছে।

নির্বাচন ব্যবস্থাকে প্রহসনে রূপ দেয়া হয়েছিল সামরিক আমল থেকে। লড়াই করে স্বৈরাচার এরশাদকে সরিয়ে দিলাম। আমরা একবার রাজাকারকে পরাজিত করেছি। আরেকবার স্বৈরাচারকে। এখন দুই জোটেই রাজাকার, দুই জোটেই স্বৈরাচার। স্বৈরতান্ত্রিক পন্থায় নৌকা ও ধানের শীষের রাজত্ব কায়েম হয়েছে সমাজে।

জাগো নিউজ : এ পরিস্থিতিতে সমাজ যাচ্ছে কোথায়?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : জাতি সমাজতন্ত্রের দিকে এগোচ্ছে, ভবিষ্যৎ সমাজতন্ত্র। তবে এক লাফে যাওয়া যাবে না। ধীরে ধীরে যেতে হয়। সব দেশে তাই হয়।

জাগো নিউজ : কিন্তু এমন যাত্রা নিয়ে অনেকেই তো হতাশ…

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : হতাশা আসতেই পারে। আবার আশার আলো দেখলে তারা মনোবল ফিরে পায়।

গণজাগরণ মঞ্চ, যৌন নির্যাতন আন্দোলন, কোটাবিরোধী আন্দোলন, নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন তো সাম্প্রতিক। এ আন্দোলনগুলোই আমাদের আশা জাগিয়ে রাখে।

জোটগুলো নানা ভিশনের কথা বলছে। আমাদের ভিশন ‘মুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১’। বাংলাদেশে এখন স্পষ্টত দুটি পক্ষ। এক ভাগ হচ্ছে লুটেরা, ধনিক শ্রেণি। আর ৯৯ ভাগ হচ্ছে শোষিত সাধারণ মানুষ। ওই এক ভাগ লুটেরাদের মধ্যে আবার দুটি গোষ্ঠী আছে। একটি নৌকা, আরেকটি ধানের শীষ। এ দুই গোষ্ঠীর মধ্যে বিবাদ মূলত ভাগবাটোয়ারা নিয়ে। নৌকা আর ধানের শীষের সঙ্গে দ্বন্দ্ব ৯৯ ভাগ মানুষের। এ দ্বন্দ্বের অবসান হতে পারে কেবল মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ফিরে আসার মধ্য দিয়ে।

জাগো নিউজ : ৯৯ ভাগ মানুষ শোষিত। তবুও মানুষ জাগছে না। তাহলে কী সাধারণ মানুষের আরও পোড় খাওয়ার দরকার আছে?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : মানুষ যথেষ্ট পোড় খাওয়া বলে মনে করি। ইতিহাস বলে, চেতনা অসমভাবে বিকশিত হয়। এটি কেউ বোঝেন আগে, কেউ বোঝেন পরে। এ দেশের মানুষ বিশ্বাস করে যে, বামপন্থীরাই হচ্ছে আন্দোলনের মূল শক্তি। কিন্তু আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সংকট উত্তরণের পথটা এখনও সুগম হয়নি।

জাগো নিউজ : এ পরিপ্রেক্ষিতে বামপন্থীদের নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতেই পারে…

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : বাস্তবতা বুঝতে হবে। কার্ল মার্কস সমাজতন্ত্রের ধারণা দিয়ে গেছেন, কিন্তু প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন অন্যরা। যেখানে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে, সেখানকার বাস্তবতা আর আমাদের এখানকার বাস্তবতা এক নয়। তবে মানুষ বুর্জোয়া নীতির মোহমুক্ত হচ্ছে। মানুষ আমাদের আহ্বানে মাথা নাড়িয়ে বলেন, আমরা আপনাদের শ্রদ্ধা করছি, কিন্তু আপনাদের কাছ থেকে বেশিকিছু আশা করছি না। তারা বলেন, বামপন্থীরা আগে শক্তিশালী হোক, পরে আমরা আসব। আমরা বলছি, আপনারা এলেই আমরা শক্তিশালী হব।

জাগো নিউজ : এ দ্বন্দ্বের নিরসন কি ঘটবে?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : বিপদের মুহূর্তে মানুষ বামপন্থীদের খুঁজে ফিরছে। হাওরে, পাহাড়ে নতুবা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির মানুষ এখন আমাদের পাশে চাইছে। ভরসা পাচ্ছে বলেই তারা আমাদের খুঁজছে। মানুষ এখন অনেক সচেতন। আমার মুখের কথায় তারা বিশ্বাস করবে না। তার মানে আমার মুখের কথা এখন কাজে রূপ দিতে হবে।

আরও পড়ুন >> সরকার সাম্প্রদায়িক শক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করছে

আমরা প্রতিকূলতায় বিশ্বাস রাখি। আমরা এবার যাদের নির্বাচনে মনোনয়ন দিয়েছি, তাদের রাজনৈতিক ইতিহাস ঘেঁটে দেখুন, অবাক হবেন। নৌকা বা ধানের শীষের প্রার্থীর চরিত্র বিশ্লেষণ করুন। আমাদের প্রার্থীর ধারে-কাছেও আসতে পারবে না। অথচ মিডিয়া নৌকা বা ধানের শীষের প্রার্থী নিয়েই ব্যতিব্যস্ত। মিডিয়া সরকার এবং লুটেরা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এ কারণে বামপন্থীদের ভালো কাজের মূল্যায়ন নেই। রাষ্ট্র, প্রশাসন, মিডিয়া, এমনকী সামাজিক মনস্তাত্ত্বিক প্রতিকূলতা মোকাবিলা করেই আমাদের এগিয়ে যেতে হচ্ছে।

জাগো নিউজ : অভিযোগ আছে, মনস্তাত্ত্বিক প্রতিকূলতা বামপন্থীরা নিজেরাও তৈরি করে। নানা বিভাজনের কারণেই আস্থা সংকটে আপনারা…

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : এটি একটি মিথ্যা অপপ্রচার। অভিযোগকারীদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, বামপন্থীদের মধ্যে যে বিভাজন, তার চেয়ে শতগুণ বিভাজন ডানপন্থীদের মাঝে। বিভাজন থাকলেও বামপন্থীরা আরও কাছাকাছি আসছে।

শেখ হাসিনা বলে থাকেন, পাকা বামপন্থীদের তার দলে নিয়েছেন। এটি তার আত্মতৃপ্তির কথা। বামপন্থীরা ভালো না মন্দ, তা প্রমাণিত হয় তার নীতি-আদর্শ বিবেচনায়। বুর্জোয়া শিবিরে গিয়ে বিশেষ সুবিধা নিয়ে বামপন্থী চেতনার কথা বলা যায় না। বরং তারা তখন লুটেরাদের অংশীদার হয়ে যান। এ অবস্থায় তাকে আর বামপন্থী বলে আখ্যায়িত করা যায় না।

জাগো নিউজ : কিন্তু রাশেদ খান মেনন বা হাসানুল হক ইনুরা মনে করছেন, ক্ষমতার কাছে গিয়ে পরিবর্তন আনা সম্ভব…

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : তাহলে মেনন সাহেবরা আইয়ুব খানের মন্ত্রিসভায় গেলেন না কেন? স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর সরকারে না গিয়ে জাসদ তৈরি করলেন কেন ইনু সাহেব? বঙ্গবন্ধুর চামড়া দিয়ে ইনু সাহেবরা কেন তখন জুতা বানানোর স্লোগান দিলেন? বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর রাশেদ খান মেনন কেন অভিনন্দন জানিয়ে বিবৃতি দিলেন? এ প্রশ্নগুলো মানুষের মাঝে এখনও ঘুরপাক খায়। এ রকম অজস্র ঘটনার কথা মনে আছে।

সরকারে গিয়ে প্রভাবিত করার সুযোগ আছে- এটি বুঝলে কেন তারা জিয়াউর রহমান বা এরশাদের সরকারে গেলেন না?

জাগো নিউজ : শেখ হাসিনার সরকারকে জিয়াউর রহমান বা এরশাদের সরকার থেকে আলাদা করা যায়-ই বটে…

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : আপনি আলাদা করতেই পারেন। আমি তেমন পার্থক্য দেখি না। বলা হয়, জিয়ার সঙ্গে জামায়াত ছিল। জামায়াত তো এখনও আছে। নিবন্ধন বাতিল হলো জামায়াতের। অথচ সরকার নিষিদ্ধ করছে না। জামায়াতকে নিষিদ্ধ না করেই আওয়ামী লীগ রাজনীতি করছে।

অন্যদিকে, বিএনপি জোটে গিয়ে জামায়াত শক্তি দিচ্ছে। আর জামায়াতকে মোকাবিলা করতে হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে সরকার আঁতাত করছে। হেফাজতের ফাঁদে সরকার যেভাবে পা দিচ্ছে, তাতে বিপদ সবার জন্যই আসন্ন।

সরকার লুটপাট অব্যাহত রাখতেই ক্ষমতার জন্য মরিয়া হয়। মূলত লুটপাট করতেই নির্বাচনে প্রহসন অনিবার্য করে তুলছে সরকার। একই কায়দায় বিএনপি ক্ষমতায় থাকতে চেয়েছে; পারেনি। এখন আওয়ামী লীগ চেষ্টা করছে; পারবে না। মানুষ মুক্তি চায়। মানুষকে মুক্তি দিতেই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছি।

জাগো নিউজ : মানুষের সাড়া পাচ্ছেন কেমন?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : মানুষ জাগতে শুরু করেছে। তারা আমাদের পক্ষে মাঠে নেমেছে। নতুন নতুন কর্মীরা এসে যোগ দিচ্ছে।

সরকার প্রচণ্ডভাবে বাধা সৃষ্টি করছে। সব জায়গায় আমাদের পোস্টার ছিঁড়ে ফেলা হচ্ছে।

জাগো নিউজ : নির্বাচন কমিশনে নালিশ করেছেন?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : নালিশ করা হচ্ছে প্রতিনিয়ত। কিন্তু কোনো সাড়া মিলছে না।

জাগো নিউজ : শেষ পর্যন্ত মাঠে থাকবেন?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : অবশ্যই। আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছি। পাক হানাদার বাহিনীর চাইতে তো খারাপ পরিস্থিতি তৈরি করেনি সরকার। মৃত্যুভয়কে উপেক্ষা করে নির্বাচনী মাঠে থাকব। আমরা মরণে ভয় করি না। আমরা কোনো লোভে আত্মসমর্পণ করি না।

জাগো নিউজ : সামনের দিনে সরকারের মনোবল নিয়ে কী ভাবছেন?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : সরকার আরও কঠোর হবে বলে মনে করি। সব জায়গাতেই দ্বন্দ্ব, সংঘাত হচ্ছে। ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে দ্বন্দ্ব এখন তীব্র হচ্ছে। আরেকটি দ্বন্দ্ব হচ্ছে নৌকা-ধানের শীষের সঙ্গে ৯৯ ভাগ মানুষের। আমরা ৯৯ ভাগের সঙ্গে আছি।

জাগো নিউজ : সংঘাতময় হয়ে উঠছে রাজনীতি। কী বলবেন?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : এমনটি আগে থেকেই ধারণা করেছিলাম। নির্বাচন কমিশন ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়েই আপত্তি আছে। সরকার সার্চ কমিটির কথা বললো। এ নিয়ে আলোচনা করা হলো। কিন্তু সিদ্ধান্ত নেয়া হলো একতরফা। আলোচনা নেয়া আর একতরফা সিদ্ধান্ত নেয়া আলাদা বিষয়।

সংবিধানে বিধি তৈরির কথা আছে নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে। ৪৭ বছরেও সে বিধি তৈরি করা হলো না। সরকারগুলো পরিকল্পিতভাবেই বিধি তৈরি করছে না।

জাগো নিউজ : নির্বাচন বয়কটের সিদ্ধান্ত আসতে পারে কিনা?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : আমরা চাইব শেষ পর্যন্ত মাঠে থাকতে। কিন্তু সরকার যদি ফের ২০১৪ সালের প্রেক্ষাপট তৈরি করে তাহলে আমরা অন্য সিদ্ধান্তও নিতে পারি। সেটা সময়ই বলে দেবে।

জাগো নিউজ : নির্বাচন ব্যর্থ হলে…

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : নির্বাচন ব্যর্থ হলে বিপদ বাড়বে। হতে পারে সেই বিপদে বামপন্থা-ই মুক্তির ঠিকানা হবে।

এএসএস/এনডিএস/এমএস

নৌকা আর ধানের শীষের সঙ্গে দ্বন্দ্ব ৯৯ ভাগ মানুষের। এ দ্বন্দ্বের অবসান হতে পারে কেবল মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ফিরে আসার মধ্য দিয়ে

অথচ মিডিয়া নৌকা বা ধানের শীষের প্রার্থী নিয়েই ব্যতিব্যস্ত। মিডিয়া সরকার ও লুটেরা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত

হেফাজতের ফাঁদে সরকার যেভাবে পা দিচ্ছে, তাতে বিপদ সবার জন্যই আসন্ন

আমরা চাইব শেষ পর্যন্ত মাঠে থাকতে। কিন্তু সরকার যদি ফের ২০১৪ সালের প্রেক্ষাপট তৈরি করে তাহলে আমরা অন্য সিদ্ধান্তও নিতে পারি

আপনার মতামত লিখুন :