মেধার জায়গায় কোনো প্রশ্ন থাকতে পারে না

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৬:৩০ পিএম, ০৪ মে ২০১৮
ছবি : মাহবুব আলম

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম; বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি। সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন দুই দশক ধরে। সংগঠনের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছান নিজের যোগ্যতা, ত্যাগ আর প্রজ্ঞার বলে। দেশে প্রগতি ধারার ছাত্র রাজনীতির অভিভাবক সংগঠক বলে পরিচিত ছাত্র ইউনিয়নেরও সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

রাজনীতির কারণে ঢাকা কলেজ থেকে বহিষ্কার হন, জেল খাটেন একাধিকবার। স্বাধীনতার পর গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ডাকসুর ভিপি (সহ-সভাপতি) নির্বাচিত হন। নেতৃত্ব দিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের গেরিলা বাহিনীর।

রাজনীতি, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জোটভুক্তিসহ বিভিন্ন বিষয়ে সম্প্রতি মুখোমুখি হন জাগো নিউজ’র। আলোচনায় গুরুত্ব পায় কোটাবিরোধী আন্দোলন প্রসঙ্গেও। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সায়েম সাবু। আজ থাকছে এর দ্বিতীয় পর্ব।

জাগো নিউজ : রাজনীতি ও রাষ্ট্রনীতির নানা অসঙ্গতির কথা বলেছেন গত পর্বে। এ পরিস্থিতির মধ্যে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কী?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : বঙ্গবন্ধু একবার আমাকে বলেছিলেন, ‘সেলিম, মোশতাককে খেয়াল রাখবা। ওর মাথায় খালি প্যাঁচ। ওর মাথায় একটি তারকাঁটা ঢুকিয়ে বের করলে স্ক্রু হয়ে যাবে। মোশতাক আমাকে (বঙ্গবন্ধুকে) বললো, অত ধর্মনিরেপক্ষ ধর্মনিরেপক্ষ করো না, সমাজতন্ত্র সমাজতন্ত্র করো না। একটু মুক্তবাজার নীতিতে দেশ চালাও। আমি মোশতাককে কী জবাব দিয়েছি জানো সেলিম! আমি বলেছি, তোর (মোশতাক) কথা রাখলাম না। আমি সমাজতন্ত্রের পথেই দেশ এগিয়ে নিয়ে যাব এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে দেশ ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তিতেই এগিয়ে যাবে।’

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর ব্যবস্থাটাই বদলে ফেলা হলো। দেশ মোশতাকের নীতিতে পরিচালিত হতে থাকলো। সেই নীতি অনুসৃত হয়েছে জিয়াউর রহমানের দ্বারা, এরশাদের দ্বারা, খালেদা জিয়ার দ্বারা এবং বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার দ্বারাও। আর দুর্ভাগ্য ঠিক এখানেই!

জাগো নিউজ : লক্ষ্য নিয়েই তো সরকারগুলো এগিয়ে যাচ্ছে ...

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : আওয়ামী লীগ ভিশন- ২০২১ এবং ভিশন- ২০৪১ ঘোষণা করেছে। তা দেখে বিএনপি ঘোষণা করলো ভিশন- ২০৩০। অথচ বাঙালির শ্রেষ্ঠ ভিশন হচ্ছে ১৯৭১। এ ভিশন বাস্তবায়ন না করে যারা নতুন করে ভিশনের কথা বলেন তারা ১৯৭১ সালের চেতনার সঙ্গে বেঈমানি করেন, বিশ্বাসঘাতকতা করেন।

আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অর্থাৎ ভিশন- ৭১ বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আমাদের সংগ্রাম চলবেই। জনগণ আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টির শাসন দেখেছে। ‘নৌকা, লাঙ্গল, পাল্লা, শীষ/ সব সাপেরই দাঁতে বিষ/ তফাৎ খালি ঊনিশ আর বিষ।’

আওয়ামী লীগ হচ্ছে আপদ আর বিএনপি হচ্ছে বিপদ। কোনটাকে বাদ দিয়ে কোনটাকে মূল্যায়ন করব! ফুটন্ত কড়াই থেকে জ্বলন্ত চুলায় ঝাঁপ দেয়ার মতো। এর বাইরে জনগণের শক্তিকে কেন্দ্রিভূত করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার রাষ্ট্র গড়ার জন্য বিকল্প শক্তি গঠন করতে হবে।

জাগো নিউজ : এত পোড় খাওয়ার পরও তো মানুষ ঘুরে দাঁড়াচ্ছে না। সংশয়টা আসলে কোথায়?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : চেতনা কোনো ইলেকট্রিক সুইচ নয়। চেতনা বিকশিত হয় ধীরে ধীরে। মানুষ তো সুন্দরবন রক্ষার আন্দোলন করছে। ফুলবাড়ী কয়লা খনি রক্ষায় রক্ত দিয়েছে। হাওর এলাকা বাঁচানোর জন্য আন্দোলন হচ্ছে। গার্মেন্টস শ্রমিকরা অধিকার আদায়ের জন্য আন্দোলন করছে। আমরা সম্প্রতি কোটা ব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন দেখলাম। এ আন্দোলনগুলোর নেতৃত্বে বামপন্থীরাই থাকছেন।

অর্থনৈতিক অধিকার আদায়ে জনগণ বামপন্থীদের ওপর ভরসা করছে। কিন্তু রাষ্ট্র ক্ষমতার প্রশ্নে তথা রাজনৈতিক চেতনায় বামপন্থীদের ওপর ভরসা না করলে জনগণের অথনৈতিক মুক্তি কোনোদিনই মিলবে না।

জাগো নিউজ : : ‘কোটা’ প্রসঙ্গে বললেন। আপনি রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা। কোটা প্রশ্নে আপনার মন্তব্য কী?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : আমি কোটা সংস্কারের পক্ষে। কোটা যা আছে আমি তারও বিপক্ষে। আবার কোটা একেবারে তুলে দেয়ারও বিপক্ষে।

সমতার জন্য কোটা রাখা হয়েছে। যারা অতিরিক্ত পিছিয়ে আছে, তারা এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারবেন না। যারা বেশি পিছিয়ে আছে, তাদের জন্য অবশ্যই বিশেষ ব্যবস্থা রাখতে হবে। আদিবাসী, প্রতিবন্ধী, নারী, জেলা কোটা অবশ্যই রাখতে হবে। এর পক্ষে আমার দৃঢ় অবস্থান।

পাকিস্তান রাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশ সৃষ্টি। রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় যারা বিশ্বাস করেন তাদের দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার কথা ছিল। ১৯৭১- এর পর তা-ই করার কথা। হয়েছে কি, হয়নি; তা নিয়ে আমি এখন আলোচনা করতে চাই না। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৭ বছর পর মুক্তিযোদ্ধাদের চাকরির বয়সসীমা পেরিয়ে গেছে। তাদের জনপ্রশাসনে নিয়োগ দেয়া এখন অপ্রাসঙ্গিক।

জাগো নিউজ : কিন্তু চেতনার পশ্নে দায় তো থাকেই?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : এ প্রশ্নেই মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান এবং নাতি-পুতিদের কোটায় চাকরি দেয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এটি ভ্রান্ত ধারণা। কারণ আদর্শ জেনেটিক্যালি পরের প্রজন্মের ওপর ভর করে না। একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করবেন, এমনটি মনে করার কোনো কারণ নেই। সে স্বাধীনতাবিরোধী মনোভাবও প্রকাশ করতে পারেন। চেতনা অন্যভাবে বিকশিত হয়। ফলে এ যুক্তি এখানে দাঁড় করানো অবান্তর।

মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য আরেকটি যুক্তি দেয়া হয়। বলা হয়, এত কষ্ট করে তারা যুদ্ধ করেছেন, তাদের বিশেষ সুবিধা দেয়া উচিত। আমি মনে করি, অবশ্যই তাদের বিশেষ সুবিধা দেয়া উচিত। তাদের সুবিধার আরও শত জায়গা আছে। সেখানে তাদের সুবিধা দিয়ে সম্মানিত করা হোক। কিন্তু মেধার বাইরে প্রশাসনে ভাগ বসানোর জন্য আমরা মুক্তিযুদ্ধ করিনি। কোটা ব্যবস্থায় মুক্তিযোদ্ধাদের অসম্মানিত করা হচ্ছে।

একপ্রকার অপমানবোধ কাজ করে যে, মনে হয় সুবিধার জন্য মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম। যেন ভাড়াটিয়া বাহিনী দিয়ে যুদ্ধ করিয়ে নেয়া! ষাটের দশকে আফ্রিকার অনেক দেশেই এমন ভাড়াটে বাহিনীকে দিয়ে যুদ্ধ করা হয়েছে। যুদ্ধ করলেই পয়সা পেত। আমরা কি তাই করেছিলাম?

পাকিস্তান সরকার আমাদের সুবিধা দেয়নি। বাংলাদেশ হলে বিশেষ সুবিধা পাব, এ ধারণা থেকে কী যুদ্ধ করেছিলাম? আমরা যুদ্ধ করেছিলাম আদর্শের জন্য। স্বাধীনতার জন্য।

তবে আমি মনে করি, মুক্তিযোদ্ধাদের বিশেষভাবে সম্মান জানাতে হবে। সেটা অন্য পন্থায়। মেধার জায়গায় কোনো প্রশ্ন থাকতে পারে না। দক্ষ ও যোগ্যরাই প্রশাসনে আসবে এবং রাষ্ট্র তা নিশ্চিত করবে।

একটি পরীক্ষায় দশ বা বিশ ভাগ বিশেষ সুবিধা থাকতেই পারে। তাই বলে তথাকথিত বিশেষ সুবিধা শতকরা ৫৬ ভাগ হবে আর মেধাসম্পন্নরা মাত্র ৪৪ ভাগ পাবে- এটি তো একটি রাষ্ট্র বা সমাজের নীতি হতে পারে না। ৫৬ ভাগ বিশেষ সুবিধা রেখে মেধাবীদের জন্য অসুবিধা সৃষ্টি করা হয়েছে। বিশেষ ব্যবস্থা বড় হয় তখন সেটা আর বিশেষ থাকে না। ৪৪ ভাগ হচ্ছে ব্যতিক্রম বঞ্চিত অংশ। ক্ষোভ মূলত এখানেই।

জাগো নিউজ : সরকারপ্রধান কোটা পদ্ধতি তুলে দেয়ারই ঘোষণা দিলেন। আতঙ্কে আন্দোলনকারীরা…

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : ছলচাতুরী করে একটি ন্যায্য দাবি কোনোভাবেই ধামাচাপা দেয়া যাবে না। বিশেষজ্ঞ মত এবং সঠিক গবেষণার মাধ্যমে কোটা সমস্যার সমাধান করা সময়ের দাবি। কে জিতলো আর কে হারলো- সেটা এখানে গুরুত্ব পাওয়ার কথা নয়। যুক্তির জায়গা থেকে বিবেচনা করে এর স্থায়ী সমাধান করা জরুরি।

এএসএস/এমএআর/পিআর

প্রশাসনে ভাগ বসানোর জন্য মুক্তিযুদ্ধ করিনি

মোশতাকের নীতি অনুসৃত হয়েছে জিয়াউর রহমানের দ্বারা, এরশাদের দ্বারা, খালেদা জিয়ার দ্বারা এবং বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার দ্বারাও। আর দুর্ভাগ্য ঠিক এখানেই!

নৌকা, লাঙ্গল, পাল্লা, শীষ/ সব সাপেরই দাঁতে বিষ/ তফাৎ খালি ঊনিশ আর বিষ

স্বাধীনতার ৪৭ বছর পর মুক্তিযোদ্ধাদের চাকরির বয়সসীমা পেরিয়ে গেছে। তাদের জনপ্রশাসনে নিয়োগ দেয়া এখন অপ্রাসঙ্গিক

আপনার মতামত লিখুন :