বেকার সমস্যাই সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৫:১০ পিএম, ০৭ জানুয়ারি ২০১৯

খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ। অর্থনীতিবিদ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর। গবেষণা করছেন উন্নয়নের নানা প্রসঙ্গ নিয়ে। রাজনীতি, উন্নয়ন, গণতন্ত্রের প্রসঙ্গ নিয়ে মুখোমুখি হন জাগো নিউজ’র।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার মালয়েশিয়ার মাহাথির মোহাম্মদের ‘গণতন্ত্র মডেল’র দিকে যেতে পারে বলে মন্তব্য করেন। দুর্নীতিরোধে আশু পদক্ষেপ নিলে সরকারের জনপ্রিয়তা বাড়বে, যা বৈধতার সংকট দূর করবে বলেও মনে করেন এ বিশ্লেষক। দুই পর্বের সাক্ষাৎকারের আজ থাকছে প্রথমটি

জাগো নিউজ : টানা তৃতীয়বার ক্ষমতায় এলো আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার। নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগও আছে। এ মুহূর্তে বাংলাদেশের জন্য কোন চ্যালেঞ্জ সামনে আনবেন?

খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ : বাংলাদেশের এই মুহূর্তের চ্যালেঞ্জকে দু’ভাগে ভাগ করতে হবে। একটি হচ্ছে, এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে একধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। অপরটি হচ্ছে, একটি নতুন সরকার ক্ষমতায় আসলে স্বাভাবিক কিছু চ্যালেঞ্জ সামনে আসে, সে বিষয়টি।

আরও পড়ুন >> নতুন দায়িত্ব ‘চ্যালেঞ্জ’ মনে করছেন আবদুল মোমেন

বেকার সমস্যাই সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ। এক কোটির বেশি হবে বেকার যুবক। তারা না পারছে শ্রমিক হতে, না পাচ্ছে চাকরি। এই শিক্ষিত যুবকদের কাজে লাগাতে না পারলে, তারা অন্যদিকে চলে যেতে পারে- যা জাতির জন্য বড় ক্ষতি বয়ে আনতে পারে।

জাগো নিউজ : কিন্তু এতো বেকারের চাকরি দেয়া কি সম্ভব?

খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ : আমি ঠিক চাকরির কথা বলছি না। এতো লোকের চাকরি দেয়া সম্ভব নয়। তবে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। এজন্য কথায় আটকে না থেকে যথাযথ কমিটমেন্ট এবং কর্মপদ্ধতি নির্ধারণ দরকার। এখন পর্যন্ত আমরা সেটা দেখতে পাইনি। বিশেষ করে এ সরকারের গত আমলে আমরা কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হওয়ার তেমন লক্ষণ দেখতে পাইনি।

জাগো নিউজ : এবার কী আশা করছেন?

খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ : আওয়ামী লীগ তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে বেকার সমস্যা দূরীকরণে প্রতিজ্ঞা করেছে। আমি আশা করছি, এই সরকার যেন এ ব্যাপারে স্বচ্ছ একটি রূপরেখা দেয়।

আমি বলব, এতো মানুষের চাকরি দেয়া সম্ভব নয়, কিন্তু উদ্যোগ তৈরি করা সম্ভব, যার মধ্য দিয়ে কাজের ক্ষেত্র তৈরি করা যাবে। এটি অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি। উদ্যোগ গ্রহণের মানসিকতা দরিদ্রদের মধ্যেও থাকে। মূলধন থাকে না বলে তারা প্রকাশ করতে পারে না। এ কারণে আমরা ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের প্রণোদনা বা ভর্তুকি দেয়ার কথা বলছি।

জাগো নিউজ : প্রণোদনা দেয়ার দাবি অনেক আগে থেকেই। কিন্তু দেয়া হচ্ছে না। বৈষম্যের অর্থব্যবস্থায় প্রণোদনা আসলে কতটুকু ভূমিকা রাখতে পারবে?

খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ : আমরা যদি কল্যাণ অর্থব্যবস্থায় থাকতাম তাহলে প্রণোদনার প্রসঙ্গ আসত না। আমরা এখন পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় পুরোপুরি প্রবেশ করেছি। পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় বড় ব্যবসায়ীরা ছোট ব্যবসায়ীদের সব খেয়ে ফেলে। যেমন- আগে গ্রামের গরিব একজন বৃদ্ধা নিজ হাতে মুড়ি ভেজে বিক্রি করতেন। এখন কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানও মুড়ি বিক্রি করছে। অর্থনীতির ভাষায় উৎপাদন বাড়লে খরচ কমে। এ কারণে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের এক কেজি মুড়ি তৈরি করতে যে খরচ পড়বে, তার চেয়ে বেশি খরচ পড়বে ওই বৃদ্ধার। ফলে ওই বৃদ্ধা আর মুড়ির বাজারে টিকে থাকতে পারছে না।

বাজার থেকে উচ্ছেদ প্রক্রিয়া থেকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের রক্ষা করতে হলে সরকারকে অবশ্যই ভর্তুকি দিতে হবে। ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনা বিশ্বব্যাংকের প্রবল বিরোধিতা সত্ত্বেও কৃষি খাতে ভর্তুকি দিলেন। এর উপকারিতা ছিল বলেই কৃষকরা আজ ফসলে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে তুলছে বাংলাদেশকে।

জাগো নিউজ : পুঁজি নিজেই পুঁজির সমস্যা। এমন রাষ্ট্রে শাসক শ্রেণি পুঁজির ওপর ভর করেই টিকে থাকে…

খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ : হ্যাঁ। তবে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের কল্যাণে অর্থনীতি কাজ করে। জার্মানসহ অনেক দেশেই ধনীদের কাছ থেকে কেটে নিয়ে গরিবদের ভর্তুকি দেয়া হয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবায় ভর্তুকি দেয়া হয়। এটি সমাজে ভারসাম্য আনে।

আমাদের সংবিধানে সমাজতন্ত্রের কথা আছে। কিন্তু আমরা তা ভুলে গেছি। আপনি বড় ব্যবসায়ীদের টিকিয়ে রাখুন, কিন্তু রাষ্ট্র, সমাজ তো মানুষের কল্যাণে। ধনীদের কাছ থেকে বিশেষ ব্যবস্থায় কেটে এনে গরিবদের দেন। পুঁজিবাদী ব্যবস্থাতেও জাপানে সবচেয়ে কল্যাণমুখী অর্থব্যবস্থা বিরাজ করছে। আমি টয়োটা কোম্পানিতে গিয়ে দেখেছি, তারা শুধু ইঞ্জিন তৈরি করে। বাকি সব অন্য কোম্পানিকে তৈরির সুযোগ করে দেয়।

আরও পড়ুন >> তারুণ্যের আস্থার প্রতিদান দিতে চাই

এতে ছোট ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও লাভবান হচ্ছে। মানুষে মানুষে সমতা হচ্ছে। সরকারের উপরেই সবাই নির্ভর করছে না। কিন্তু সরকার সুযোগ করে দিচ্ছে।

জাগো নিউজ : জাপান-জার্মানির প্রেক্ষাপট কি বাংলাদেশে মানায়? এমন সমাজনীতি এ রাষ্ট্র ধারণ করে কি?

খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ : প্রশ্ন এখানেই। রাষ্ট্র পরিচালকদের মানসিকতা আছে কিনা- সেটাই বড় বিষয়। এসএমই ( ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প) নিয়ে অনেক কথাই হচ্ছে। অথচ এর কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেই। কল্যাণ অর্থনীতির কথা সংবিধানে আছে। পুঁজিবাদের কথা বলা নেই। সরকার চাইলে যেকোনো সময়ে উদ্যোগ নিতে পারে।

জাগো নিউজ : ব্যবসায়ীদের হাতে রাজনীতি। দিনে দিনে ব্যবসায়ীদের উপস্থিতি বাড়ছে সংসদে। এমন সরকার ব্যবস্থায় কল্যাণমুখী অর্থনীতির আশা করা যায়?

খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ : এটা ঠিক, রাজনীতি আর ব্যবসা এক বিষয় নয়। পাশের দেশ ভারতে বড় বড় ব্যবসায়ীদের কাউকে ব্যাংকের পরিচালক হতে দেয়া হয় না। আমাদের এখানে সে চিত্র ভিন্ন। টাকার লালসাটাই মুখ্য। অন্যের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে নিজের মুনাফাটাই মুখ্য করে দেখে।

এ কারণেই রাজনীতিটা অন্তত রাজনীতিবিদদের হাতে থাকলে যেকোনো উদ্যোগ নেয়া সহজ হয়। বাংলাদেশের রাজনীতি এখন ব্যবসায়ীরা নিয়ন্ত্রণ করছে। যে কারণে উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে ব্যবসায়ীদের স্বার্থে। যেমন- ব্যাংকিং ব্যবসায় নিয়ম ছিল একই পরিবার থেকে দুজনের বেশি পরিচালনা পর্ষদে থাকতে পারবেন না। কিন্তু আইন পরিবর্তন করে এখন একই পরিবার থেকে চারজনকে আসার সুযোগ করে দেয়া হলো। তার মানে আইন করে একটি ব্যাংককে একটি পরিবারের হাতে তুলে দেয়া হলো। এই নীতি কোনোভাবেই কল্যাণ অর্থনীতির সহায়ক নয়।

জাগো নিউজ : এই নীতিহীন নীতির বিষয়টি সরকারেরও বোঝার কথা…

খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ : আমরা তো আর নীতি পরিবর্তন করতে পারি না। আমরা আমাদের কথা বলেই যাব। সরকার কেন করছে, তার ব্যাখ্যা সরকারই ভালো দিতে পারবে।

জাগো নিউজ : এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের যাত্রা কোন পথে?

খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ : আমি মনে করি, বাংলাদেশ এখন পুঁজির দিকেই যাচ্ছে। যদিও সংবিধান পুঁজির দিকে যাওয়া সমর্থন করে না। কারণ এখনও সংবিধানে সমাজতন্ত্রের কথা বলা আছে। সংবিধানের চার মূলনীতি তো আপনি অস্বীকার করতে পারেন না। আবার মুখে শুধু স্বীকারের মধ্যেই কোনো সার্থকতা থাকে না।

আমি মনে করি না, বাংলাদেশ কঠিন সমাজতন্ত্রের দিকে যাবে। তবে ভারসাম্য বজায় রেখে কল্যাণমুখী অর্থ ব্যবস্থার দিকে যাওয়া যেতেই পারে। জার্মানি পারলে আমরা পারব না কেন?

জাগো নিউজ : বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে আর কী চ্যালেঞ্জের কথা বলবেন?

খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ : বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে মানে জিডিপি’র পরিমাণ বাড়ছে। প্রশ্ন হচ্ছে এই জিডিপি কার হাতে যাচ্ছে। গবেষণায় বেরিয়ে আসছে, মাত্র পাঁচ ভাগ মানুষের হাতে জিডিপি।

জিডিপি ১৭ কোটি মানুষের কাছে সমানভাবে বণ্টিত হবে, তা মনে করি না। কিন্তু অধিক মানুষের কাছে এর সুবিধা যাবে, এটি আশা করা যেতে পারে। পাঁচ ভাগের কাছেই সব আটকে যাবে, এটি হতে পারে না। ট্যাক্স ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাই বেশি দিচ্ছে। বড় ব্যবসায়ীরাই বেশি ট্যাক্স ফাঁকি দিচ্ছে। ব্যবসায়ীরা ঠিক মতো ট্যাক্স দিলে ১০ লাখ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করতে সমস্যা হতো না।

ব্যবসায়ীরা নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে সত্যিকার রাজনীতিকরা আর কিছু করতে পারছেন না। ব্যবসায়ীদের হাত থেকে রাজনীতি মুক্ত হলেই সমতা ফিরবে।

রাজনীতি ব্যবসায়ীমুক্ত এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের মাঝে ভর্তুকি দিতে পারলেই রাষ্ট্র কল্যাণ অর্থনীতির দিকে যাবে। তবে সেটা হবে কিনা- সেটা নির্ভর করে সরকারের উদ্যোগের ওপর।

এএসএস/এমএআর/এমএস

এত মানুষের চাকরি দেয়া সম্ভব নয়, কিন্তু উদ্যোগ তৈরি করা সম্ভব, যার মধ্য দিয়ে কাজের ক্ষেত্র তৈরি করা যাবে

আগে গ্রামের গরিব একজন বৃদ্ধা নিজ হাতে মুড়ি ভেজে বিক্রি করতেন। এখন কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানও মুড়ি বিক্রি করছে

রাজনীতি আর ব্যবসা এক বিষয় নয়। পাশের দেশ ভারতে বড় বড় ব্যবসায়ীদের কাউকে ব্যাংকের পরিচালক হতে দেয়া হয় না