বাড়িভাড়া না বাড়ালেই সন্তুষ্ট থাকবে শ্রমিক

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৬:৩৪ পিএম, ২৫ জানুয়ারি ২০১৯

শাজাহান খান, এমপি। সাবেক মন্ত্রী, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। শ্রমিক সংগঠনগুলোর নেতৃত্বে আছেন। নতুন মন্ত্রিসভা গঠন, চলমান রাজনীতি, উন্নয়ন-গণতন্ত্র প্রসঙ্গ নিয়ে মুখোমুখি হন জাগো নিউজ’র।

নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার প্রতি জনমানুষের আস্থা আরও বাড়বে বলে মন্তব্য করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক ধারা এবারের নির্বাচনে বিজয়ের প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে- এমনটি উল্লেখ করেন এই রাজনীতিক। দুই পর্বের সাক্ষাৎকারের আজ থাকছে শেষটি।

জাগো নিউজ : দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে কথা বলছেন মন্ত্রীরা। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলছেন প্রধানমন্ত্রীও। দুর্নীতিরোধে সরকার বিশেষ অবস্থানে যাচ্ছে কিনা?

শাজাহান খান : বাংলাদেশ এখন সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার ক্ষমতা রাখে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠায় শেখ হাসিনার সরকার আপসহীন অবস্থানে রয়েছে।

২০০১ সালে চারদলীয় জোট সরকার যখন ক্ষমতায় আসে, তখন টানা কয়েকবার দুর্নীতিতে প্রথম হয়। দুর্নীতি বিএনপি-জামায়াতের আমলেই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। আজ কিন্তু সে অবস্থানে নেই বাংলাদেশ।

আরও পড়ুন >> মন্ত্রিত্ব হারিয়ে কোনো দুঃখ-ব্যথা নেই

জাগো নিউজ : ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় বাংলাদেশ দুর্নীতিতে প্রথম হয় এবং সে ধারা এখনও বিরাজমান বলে গবেষণায় বেরিয়ে আসছে…

শাজাহান খান : বাংলাদেশে দুর্নীতি আর আগের অবস্থানে নেই। দুর্নীতিতে বাংলাদেশ এখন ১৩ কি ১৪তম। সুতরাং দুর্নীতি কমে এসেছে, এটি স্বীকার করতেই হবে।

শুধু দুর্নীতি নয়, শেখ হাসিনা মাদক ও জঙ্গির মতো সামাজিক ব্যাধিও কমিয়ে আনছেন। দুর্নীতিরোধে সবার সচেতনতা দরকার বলে মনে করি। চাইলেই এ ব্যাধি থেকে সমাজকে রক্ষা করা সম্ভব নয়। গণজাগরণ ঘটলেই দুর্নীতি, মাদক ও সন্ত্রাস থেকে দেশকে মুক্ত করা সম্ভব।

বঙ্গবন্ধু ১৯৪৮ সাল থেকে গণজাগরণ সৃষ্টি করেছিলেন। ১৯৭১ সালে আমরা সে জাগরণের ফলাফল পেয়েছিলাম। বাংলাদেশ সৃষ্টির পর দ্বিতীয় জাগরণ সৃষ্টি করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

জঙ্গিবাদের উত্থান নিয়ে সারাবিশ্ব যখন অস্থির তখন প্রধানমন্ত্রী জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে গণজাগরণ সৃষ্টি করেছেন। বিএনপি-জামায়াত লালন-পালন করে জঙ্গিবাদের বিস্তার ঘটিয়েছিল। মানুষ হত্যা করে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা যায় না। সেই ভ্রান্ত ধারণার বিরুদ্ধেই শেখ হাসিনা বাংলাদেশের সকল শ্রেণি ও পেশার মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছেন।

জঙ্গি একটি গোষ্ঠী কিন্তু এর আদর্শ একটি মতবাদ। কয়েকজন জঙ্গিকে নির্মূল করলেই এ মতবাদ শেষ হয়ে যাবে না। মতবাদ ধ্বংস করতেই শেখ হাসিনার সরকার সচেষ্ট। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শুধু জঙ্গিদের প্রতিহত করেনি বরং জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলেছে। মসজিদ, মাদরাসায় জঙ্গিদের বিরুদ্ধে সচেতন করে তোলা হয়েছে। এক লাখ ৩৮ হাজার মুফতির স্বাক্ষরিত ফতুয়া দেয়া হলো জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে। এ কাজগুলো জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করি।

জঙ্গিবাদ হারাম এবং ইসলামের ক্ষতি করছে জঙ্গিরা- এমন ধারণা তো সমাজে এখন প্রতিষ্ঠিত। জঙ্গিবাদ নিয়ে বাংলাদেশে আপাতত অস্থিরতা নেই, এটি এখন বিশ্বও স্বীকার করে। সাধারণ মানুষ এখন জঙ্গিদের প্রতিহত করছে এবং এখানেই শেখ হাসিনার সফলতা।

shajahan-khan

জাগো নিউজ : অস্থিরতা নেই বটে, তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন রাজনীতি নিয়ে গুমট অবস্থা বিরাজ করছে। বিশেষ করে ভোট, নির্বাচন নিয়ে অধিক সংখ্যক মানুষের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠীকে টেনশনে রেখে স্থিরতা টেকশই হবে কিনা?

শাজাহান খান : কে বলছে, অধিক সংখ্যক মানুষ টেনশনে আছে? টেনশনে তারাই আছেন, যারা শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চেয়েছিলেন।

ষড়যন্ত্রকারীরা এখন বুঝে গেছে যে, শেখ হাসিনাকে আসলে অত সহজে ক্ষমতাচ্যুত করা যাবে না। শেখ হাসিনার ভিত জনগণের হৃদয়ের এত গভীরে যে, চাইলেই কেউ উপড়ে ফেলতে পারবে না। যারা ষড়যন্ত্র করে ব্যর্থ হয়েছে, তারাই এখন টেনশনে আছে।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একদিন অভিযোগ করে বলেছিলেন, আমাদের যে অর্জন, তা বর্তমান সরকার ম্লান করে দিচ্ছে। আমি তাকে প্রশ্ন করতে চাই, বিএনপির আসলে অর্জন কী?

বিএনপির অর্জন ছিল জঙ্গিবাদের প্রসার। বিএনপির অর্জন ছিল দুর্নীতি। বিএনপির অর্জন ছিল উন্নয়ন থমকে দেয়া, অর্জন ছিল বিদ্যুতের খাম্বা বিক্রি করে দুর্নীতি করা। তাদের অর্জন ছিল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হত্যা করা। ১৭ আগস্ট বা ২১ আগস্টের মতো বোমা হামলার ঘটনা যদি তাদের অর্জন হয়, তাহলে সে অর্জনগুলো ধ্বংস করে শেখ হাসিনা সঠিক কাজটিই করেছেন।

সুতরাং আমি মনে করি, মির্জা ফখরুল ইসলাম সঠিক কথাই বলেছেন যে, শেখ হাসিনা তাদের অর্জনগুলো ধ্বংস করে দিচ্ছে। জনগণের অর্জন টিকিয়ে রাখতেই বিএনপি-জামায়াতের জনবিরোধী অর্জনগুলো ধ্বংস করতে হচ্ছে। মানুষকে এখন বিদ্যুতের জন্য জীবন দিতে হচ্ছে না। সারের জন্য কৃষককে জীবন দিতে হচ্ছে না।

গার্মেন্টস শ্রমিকরা আন্দোলন করল। কিন্তু কই, পুলিশ তো শ্রমিকদের ওপর গুলি চালিয়ে আন্দোলন দমানোর চেষ্টা করেনি। মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন করলে বিএনপির আমলে ১৭ শ্রমিককে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল এবং সেটি রমজান মাসে হয়েছিল।

জাগো নিউজ : শ্রমিকের অধিকার নিয়ে আন্দোলন এখনও হচ্ছে এবং পুলিশ আগের থেকে বেশি মারমুখি বলে অভিযোগ রয়েছে? এখনও গুলির ঘটনাও ঘটছে…

শাজাহান খান : কয়টি আন্দোলনে গুলির ঘটনা ঘটেছে? গুলি নয়, শেখ হাসিনা ভালোবাসা দিয়ে শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা করছেন।

১৯৯১ সালে ক্ষমতায় এসে ওই বছরই গার্মেন্টস শ্রমিকদের মজুরি বাড়িয়েছিলেন। ১৯৮৪ সালে শ্রমিকরা ন্যূনতম মজুরি পেতেন ৫৭০ টাকা। ১৯৯৪ সালে এসে করা হলো মাত্র ৯৩০ টাকা। ২০০৬ সালে বিএনপি এসে ১৬৬২ টাকা করেছিল। ২০১০ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনা করলেন তিন হাজার টাকা। এর তিন বছর পর পাঁচ হাজার ৩০০ টাকা হলো। এরও পাঁচ বছর পর করা হলো আট হাজার টাকা। এ হিসাব থেকেই দেখবেন, কে আসলে শ্রমজীবী মানুষের পক্ষে। খালেদা জিয়া কখনই শ্রমজীবী মানুষের পক্ষে ছিলেন না।

খালেদা জিয়া গুলি করে মানুষের অধিকার বঞ্চিত করেন। আর শেখ হাসিনা ভালোবাসা দিয়ে মানুষের মন জয় করেন।

জাগো নিউজ : গ্রেড ভেদে শ্রমিকদের বেতন ১৫থেকে ২০ টাকাও বাড়ানো হয়েছে। এটি অসামঞ্জস্য কিনা?

শাজাহান খান : না। এটি ভুল ব্যাখ্যা এবং না জেনেই অনেকে এমনটি বলছেন। যে শ্রমিক নেতারা দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করছেন, তাদের কাছেও তো হিসাব-নিকাশ আছে।

২০১৮ সালে যখন মজুরি কাঠামো গঠন করা হয়, তখন একটা অসামঞ্জস্য ছিল এবং কর্তৃপক্ষের হয়তো দৃষ্টিগোচর ছিল না। শতকরা পাঁচ টাকা বাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। ওই ঘোষণা অনুযায়ী পুরনো শ্রমিকদের বেতন বেশি বেড়েছে এবং তুলনামূলকভাবে নতুনদের কম বেড়েছে। এটি ভুল বোঝার ব্যাপার ছিল এবং আন্দোলন হয়েছে না জেনেই। আমরা সেটা বুঝাতে সক্ষম হয়েছি। আমি মনে করি, এই কৃতিত্ব প্রধানমন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রী ও শ্রমমন্ত্রীর। শ্রমিক, মালিক ও সরকারপক্ষ একসঙ্গে বসেই সমাধান করা হয়েছে।

জাগো নিউজ : গার্মেন্টস শ্রমিকদের শ্রমের ওপর ভর করেই অর্থনীতির উন্নয়ন। অথচ আন্দোলন করতে হচ্ছে এখনও। সুনির্দিষ্ট নীতিমালা করা সময়ের দাবি কিনা?

শাজাহান খান : নীতিমালা আছে তো। তবে শুধু শ্রমিকদের দিক দেখলেই হবে না। প্রথমত, আমাকে কারখানা রক্ষা করতে হবে। কারখানা রক্ষা পেলেই শ্রমিক বাঁচবে।

shajahan-khan

জাগো নিউজ : কারখানা রক্ষার নামে মালিকের স্বার্থই বড় করে দেখা হচ্ছে বলে অভিযোগ…

শাজাহান খান : আমি তা মনে করি না। শ্রমিকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বেতন বাড়ানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী আগে শ্রমিকের স্বার্থই গুরুত্ব দিয়ে আসছেন। প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনা আছে বলেই শ্রমিকরা সন্তুষ্ট।

বাংলাদেশে ১৬ হাজার টাকা মজুরি দেয়ার মতো ফ্যাক্টরি নেই, তা নয়। তবে তা সংখ্যায় খুবই কম। ১৬ হাজার টাকা করলে ছোট ছোট ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে যাবে। ৪৫ ভাগ শ্রমিক গার্মেন্টসের। তারা সবাই বড় ফ্যাক্টরিতে কাজ পান না। অধিকাংশ কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে লাখ লাখ শ্রমিক কোথায় যাবে? সুতরাং বাস্তবতার বাইরে গিয়ে কথা বললে কারও স্বার্থই রক্ষা হয় না।

নতুন যে বেতন কাঠামো হয়েছে এবং মালিকরা যদি এখানে কোনো কারচুপি না করে তাহলে এ বেতনেও একজন শ্রমিক সন্তুষ্ট থাকতে পারেন।

জাগো নিউজ : অভিযোগ এখানেই। মালিকরা কারচুপির আশ্রয় নিয়ে শ্রমিকদের ঠকিয়ে আসছেন…

শাজাহান খান : হ্যাঁ, এটিই আসলে মূল সমস্যা। বিবেকের তাড়না থেকেই মালিকদের ওয়াদা রক্ষা করা উচিত।

এক্ষেত্রে আরেকটি সমস্যা আছে। মজুরি বাড়লেই বাড়িভাড়া বাড়ানো হয়। ভাড়া না বাড়ালেই শ্রমিকরা সন্তুষ্ট থাকবে। সরকারকে এ বিষয়ে আরও সতর্কমূলক অবস্থান নিতে হবে। অযৌক্তিক বাড়িভাড়া বাড়ালেই সরকারকে ব্যবস্থা নিতে হবে। এটি না বাড়লে শ্রমিকরা যে বেতন পাচ্ছেন, তাতে তারা কিছুটা ভালো থাকবেন বলে আমার বিশ্বাস। এ কারণেই আমি মনে করি, বাড়িভাড়ার বিষয়ে কঠোর অবস্থানে থাকুক সরকার।

এএসএস/এমএআর/এমএস

টেনশনে তারাই আছেন, যারা শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চেয়েছিলেন

পুলিশ তো শ্রমিকদের ওপর গুলি চালিয়ে আন্দোলন দমানোর চেষ্টা করেনি। কিন্তু বিএনপির আমলে ১৭ শ্রমিককে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল

শুধু শ্রমিকদের দিক দেখলেই হবে না। কারখানাও রক্ষা করতে হবে। কারখানা রক্ষা পেলেই শ্রমিক বাঁচবে

আপনার মতামত লিখুন :