মালয়েশিয়ায় ১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি সম্ভব

মো. শফিকুল ইসলাম
মো. শফিকুল ইসলাম মো. শফিকুল ইসলাম , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৯:৩৯ এএম, ১৮ এপ্রিল ২০১৯

মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) ও বিদ্যমান অশুল্ক বাধা দূর করতে পারলে আগামী পাঁচ বছরে মালয়েশিয়ায় এক বিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি করা সম্ভব বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিএমসিসিআই) সভাপতি সৈয়দ মোয়াজ্জম হোসেন। জাগো নিউজ’র সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় তিনি এমন মন্তব্য করেন।

সৈয়দ মোয়াজ্জম হোসেন একজন সফল উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী। তিনি এসএমএইচ ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। সম্প্রতি তার সঙ্গে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়ার মধ্যে বাণিজ্যের বিভিন্ন ক্ষেত্র, সমস্যা ও সম্ভাবনার বিষয়ে কথা হয়। দুই পর্বের সাক্ষাৎকারের প্রথমটি থাকছে আজ।

জাগো নিউজ : মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি পণ্য রফতানির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে যদি বলতেন…

মোয়াজ্জম হোসেন : ২০০৯ সালে আমরা মালয়েশিয়াতে রফতানি করতাম ৩১ মিলিয়ন ডলারের পণ্য। ২০১৮ সালে এসে রফতানি দাঁড়ায় ২৩২ মিলিয়ন ডলারে। ২০০৯ সালে মালয়েশিয়া বাংলাদেশে রফতানি করতো ৬০০ মিলিয়ন ডলার। ২০১৯ সালে এসে তারা প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি করছে। দুদেশেরই বাণিজ্য বাড়ছে। তবে বর্তমানে আমাদের সঙ্গে তাদের আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের পার্থক্য প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলার। এটা বড় গ্যাপ।

জাগো নিউজ : এ গ্যাপ কমাতে আপনারা কোনো উদ্যোগ নিয়েছেন কি?

মোয়াজ্জম হোসেন : বাংলাদেশ-মালয়েশিয়ার বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে আমাদের চেম্বার (বিএমসিসিআই) বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে ব্যক্তিগত পর্যায়ে ব্যবসায়িক সফর এবং বিভিন্ন সেমিনারের আয়োজন ছিল উল্লেখযোগ্য। মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশে মেলা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে আমাদের ব্যবসায়িক সম্পর্ক আরও উন্নত হচ্ছে। আমরা ব্যবসা সম্প্রসারণ করছি। ফলে আগে যেখানে ১০০-১২০ মিলিয়ন ডলার রফতানি ছিল, সেটা এখন ২৫১ মিলিয়ন ডলারে উঠেছে।

তবে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোসহ রফতানির সব সুযোগ কাজে লাগাতে এফটিএ জরুরি। এফটিএ করতেই হবে। একই সঙ্গে নেগোসিয়েশনে (আপস-আলোচনা) দক্ষতা অর্জন করতে হবে। আমরা ২০১০ সালে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়ার সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা এফটিএ করার একটি প্রস্তাব দেই। তখন মালয়েশিয়ার পক্ষে এটাকে স্বাগত জানানো হলেও বাংলাদেশে এ সংক্রান্ত কোনো আইন না থাকায় আমরা আর অগ্রসর হতে পারিনি। ২০১৭ সালে এফটিএ আইন হয়। কিন্তু আমরা এখনও সেটা কার্যকর করতে পারিনি।

জাগো নিউজ : এফটিএ কার্যকর হলে কোন ধরনের সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যাবে?

মোয়াজ্জম হোসেন : আমরা যে পণ্য রফতানি করব তা ওদের দেশে সরাসরি প্রবেশ করবে। একই সঙ্গে ওরা যা রফতানি করবে আমাদের দেশে তাও সরাসরি আসবে। এতে কোনো শুল্ক আরোপ হবে না।

কিন্তু বাংলাদেশ সরকার বলল, আমরা মালয়েশিয়া থেকে বেশি আমদানি করি, তাহলে এফটিএ করলে আমাদের ক্ষতি হবে। কারণ আমরা আমদানি বেশি করছি। আর আমদানি থেকে শুল্ক পাওয়া যায়। এফটিএ করলে সরকার বড় ধরনের রাজস্ব হারাবে।

এখানে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিলে বাংলাদেশও লাভবান হতো। আমরা বললাম, এফটিএ চুক্তিতে শুধু পণ্য নয় সেবা খাতও যুক্ত করা হোক। এতে আমরা বেশি লাভবান হব। কিন্তু আমাদের সরকার মানবসম্পদ যুক্ত করার প্রস্তাব করল। পৃথিবীর কোথাও এফটিএ-এর আওতায় মানবসম্পদ নাই। যার কারণে এটা হলো না।

মালয়েশিয়াতে আমাদের সাত লাখ লোক আছে। আমরা যদি পণ্য ও সেবা এফটিএতে যুক্ত করতে পারি তাহলে মালয়েশিয়ায় অনেক কাজের ক্ষেত্র আছে, সেখানে আমরা জনশক্তি রফতানি করতে পারব। সেখানে অনেক বড় বড় প্রতিষ্ঠান, মার্কেট আছে। যেগুলো মেইনটেন্যান্সের (রক্ষণাবেক্ষণ) ঠিকাদারি নিতে পারি আমরা। ঠিকাদারি কোম্পানিতে এক হাজার লোক লাগবে, আমরা তখন বাংলাদেশ থেকে লোক নিয়ে সেই কাজটা করে দিতে পারি। এতে একদিকে যেমন বিদেশে জনশক্তি রফতানি হবে, অন্যদিকে আমাদের সেবা রফতানির মাধ্যমে আয় হবে।

জাগো নিউজ : এফটিএ কার্যকরের বিষয়ে সরকারের নীতিনির্ধারক পর্যায় থেকে কোনো আশার বাণী পেয়েছেন কি?

মোয়াজ্জম হোসেন : বাণিজ্যমন্ত্রী, সচিব ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে এ বিষয়ে আমাদের আলোচনা হয়েছে। আমরা তাদের বোঝানোর চেষ্টা করেছি যে, যদি এটা সম্ভব হয় তাহলে মালয়েশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য বাড়ানো সম্ভব হবে। এফটিএ করতে পারলে আমাদের আরও বড় একটা সুবিধা হবে। সেটা হলো, তৈরি পোশাক খাত। এ খাতের অনেক পণ্য আমরা মালয়েশিয়াতে রফতানি করছি। আমরা যদি শুল্কমুক্ত তৈরি পোশাক রফতানি করতে পারি তাহলে বাণিজ্য অনেক বাড়বে। সেখানে প্রায় আট কোটি জনসংখ্যা রয়েছে। প্রায় দুই বিলিয়ন ডলার আরএমজি রফতানি হয়। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে যাচ্ছে মাত্র ১৫০ মিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক। এখানে আমরা রফতানি বাড়াতে পারি। বর্তমানে সেখানকার সিংহভাগ বাজার দখল করে আছে চায়নার পণ্য। চীন বিনা শুল্কে রফতানি করছে। এফটিএ করতে পারলে আমরা চায়নার পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারব।

দ্বিতীয়ত, মালয়েশিয়ায় সিরামিক পণ্যের একটা চাহিদা রয়েছে। আমরাও এ পণ্য রফতানি করি। কিন্তু শুল্কসহ বিভিন্ন বাধার কারণে আমরা মালয়েশিয়ায় সিরামিক পণ্য রফতানি করতে পারছি না। এফটিএ করলে আমরা শুল্ক-বিহীন এ পণ্য রফতানি করতে পারব। আমাদের গার্মেন্টস পণ্য ছাড়াও লেদার আছে, প্রক্রিয়াজাত পণ্য আছে। এগুলো আমরা বিনা বাধায় সে দেশে রফতানি করতে পারব।

আমরা তাদেরও বলেছি, মালয়েশিয়ার সব পণ্য শুল্কমুক্ত করব না। এটা ধীরে ধীরে দেয়া হবে। তারা আমাদের সঙ্গে একমত হয়েছে। এখন সরকারকে আলোচনার জন্য একটা কমিটি গঠন করতে হবে। তারা (মালয়েশিয়া) একটা কমিটি করেছে। আমরা কী কী বিষয়ে কাজ করতে পারি, সেসব বিষয়ে তাদের ধারণা দিতে হবে। এটা হলে আমাদের অনেক পণ্য সে দেশে রফতানির সুযোগ পাবে।

আমরা সরকারের নীতিনির্ধারকদের বলেছি, এফটিএ কার্যকর হলে পাঁচ বছরের মধ্যে এক বিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি সম্ভব। এজন্য মালয়েশিয়াস্থ বাংলাদেশি হাইকমিশনকে অর্থনৈতিক কূটনীতির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। জনশক্তি রফতানি ব্যয় কমাতে হবে। খাদ্যপণ্যেও রফতানির সম্ভাবনা অনেক বেশি। বিশেষ করে হালাল পণ্যের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে মালয়েশিয়ায়। সরকারি ও বেসরকারি খাত একসঙ্গে কাজ করলে এ খাতেও ভালো বাণিজ্য সম্ভব।

এসআই/এমএআর/জেআইএম

বর্তমানে আমাদের সঙ্গে তাদের আমদানি-রফতানির পার্থক্য প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলার। এটা বড় গ্যাপ

এফটিএ করতেই হবে। একই সঙ্গে নেগোসিয়েশনে (আপস-আলোচনা) দক্ষতা অর্জন করতে হবে

আমরা যদি পণ্য ও সেবা এফটিএতে যুক্ত করতে পারি তাহলে মালয়েশিয়ায় অনেক কাজের ক্ষেত্র আছে, সেখানে আমরা জনশক্তি রফতানি করতে পারব

হালাল পণ্যের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে মালয়েশিয়ায়। সরকারি ও বেসরকারি খাত একসঙ্গে কাজ করলে এ খাতেও ভালো বাণিজ্য সম্ভব