ভালো নয় রংপুর বিভাগের ৭২% প্রকল্পের অগ্রগতি

প্রদীপ দাস
প্রদীপ দাস প্রদীপ দাস , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১২:১৫ পিএম, ২২ মে ২০১৯

বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন অনুযায়ী, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, নীলফামারী, পঞ্চগড়, রংপুর ও লালমনিরহাট– এ আট জেলা নিয়ে গঠিত রংপুর বিভাগে এক কোটি ৫৫ লাখের অধিক মানুষের বসবাস। অথচ এ বিভাগের উন্নয়নের জন্য মোট বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বরাদ্দ রয়েছে এক শতাংশেরও কম (০.৯৮)।

সামান্য ওই বরাদ্দও যথাসময়ে ও যথার্থভাবে জুটছে না উত্তরাঞ্চলবাসীর ভাগ্যে। কারণ এডিপির আওতায় এ বিভাগে বাস্তবায়ন হচ্ছে ১২ হাজার ৩৯ কোটি ৩২ লাখ টাকা ব্যয়ে ৪৭টি প্রকল্প। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরীবিক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) তথ্য অনুযায়ী, ওই ৪৭টির মধ্যে ৭২ শতাংশ প্রকল্পের অগ্রগতিই ভালো নয়। এজন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ারও বিশেষ কোনো উদ্যোগ নেই পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের।

আইএমইডির তথ্য মতে, এডিপিতে মোট প্রকল্প সংখ্যা এক হাজার ৯৭৮টি। এর মধ্যে রংপুর বিভাগে ৪৭টি, অর্থাৎ মোট প্রকল্পের ২ দশমিক ৩৮ শতাংশ। ৪৭টি প্রকল্পের মধ্যে ১১টি প্রকল্পের অগ্রগতি একেবারে শূন্য। ২৩টি প্রকল্প ধীরগতির। ১৩টি প্রকল্পের অগ্রগতি ভালো। অর্থাৎ সার্বিকভাবে প্রায় ৭২ শতাংশ প্রকল্পের অগ্রগতি ভালো নয়।

যথাসময়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে না পারলে সে ক্ষেত্রে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হতে পারে, তা জানতে চাওয়া হয় আইএমইডির ভারপ্রাপ্ত সচিব আবুল মনসুর মো. ফয়েজ-উল্লাহর কাছে। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘সে ক্ষেত্রে আমরা আরও দেখব। ওদেরকে সময় বাড়িয়ে দেব।’

এর কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘একটা প্রকল্প আমরা যদি বন্ধ করে দেই, তাহলে জনগণ তো কাঙ্ক্ষিত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে। আমরা আরও দেখব, ওই বাড়তি সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করতে না পারলে… তারপরে বন্ধ করব, কি করব না- সে বিষয়টা আসবে।’

আবুল মনসুর ফয়েজ-উল্লাহ আরও বলেন, ‘যদি দেখা যায়, কোনো প্রকল্প-পরিচালক কাজ করতে পারছে না, আমরা তো আর পরিচালক পরিবর্তন করতে পারব না। তখন ডিপার্টমেন্টকে বলব, প্রকল্পের পরিচালক পরিবর্তন করতে।’

‘ওদের মধ্যে কী সমস্যা আছে, সেটা আমরা লিখে নিয়েছি। ওগুলো আমরা অ্যাড্রেস করব’- বলেন আইএমইডির অতিরিক্ত সচিব।

গত ৮ মে (বুধবার) ২০১৯-২০ অর্থবছরের নতুন এডিপির সুপারিশ চূড়ান্ত করতে বর্ধিত সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে প্রকল্প বাস্তবায়নের দীর্ঘসূত্রিতা ভাঙার জন্য নতুন কোনো পদক্ষেপ থাকছে কি না- জানতে চাইলে পরিকল্পনা মন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, ‘এই ট্রেন্ড ভাঙার জন্য আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আইএমইডিকে আরও শক্তিশালী করা হবে। মাঠে যে প্রকল্প-পরিচালকরা আছেন, তাদের অনেক স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে। আমার মনে হয়, তারা আগের চেয়ে অনেক বেশি গ্রামে থাকছেন। আশা করি, বড় ফল পাবেন। আপনারা বছর শেষে চমকপ্রদ সংবাদ পাবেন।’

শূন্য অগ্রগতির প্রকল্প

‘দিনাজপুর সদর উপজেলায় সাইট অ্যান্ড সার্ভিসেস আবাসিক প্লট উন্নয়ন’ প্রকল্প শুরু হয় ২০১৩ সালের জুলাইয়ে। যথা সময়ে শেষ করতে না পারা ওই প্রকল্পের অগ্রগতি এখনও শূন্য।

২০১৬ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া ‘ঠাকুরগাঁও জেলার সিংগীয়া মৌজায় স্বল্প ও মধ্যম আয়ের লোকদের জন্য সাইট অ্যান্ড সার্ভিসেস আবাসিক প্লট উন্নয়ন’ প্রকল্পেরও এখন পর্যন্ত অগ্রগতি নেই। ২০১৭ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া ‘পীরগঞ্জ পৌরসভায় পানি সরবরাহ ও এনভায়রনমেন্টাল স্যানিটেশন’ প্রকল্প আগামী জুনে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু প্রকল্পের কাজ এখনও শুরুই হয়নি।

বাকি শূন্য অগ্রগতির প্রকল্পগুলোর মধ্যে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে রংপুর বিভাগে বেশকিছু প্রকল্পের অনুমোদন দেয়া হয় একনেক সভায়। এর মধ্যে একটি সেপ্টেম্বরে ও বাকি প্রকল্পগুলো জুন-জুলাই থেকে শুরু হয়েছে, সেগুলোর অগ্রগতিও এখন পর্যন্ত শূন্য।

এর মধ্যে রয়েছে- ‘জেলা মহাসড়ক যথাযথ মান ও প্রশস্ততা উন্নীতকরণ (রংপুর জোন)’, ‘বীরগঞ্জ-খানসামা-দারোয়ানী, খানসামা-রাণীরবন্দর ও চিরিরবন্দর-আমতলী বাজার জেলা মহাসড়ককে যথাযথ মান ও প্রশস্ততায় উন্নীতকরণ’, ‘গাইবান্ধা-গোবিন্দগঞ্জ ভায়া নাকাইহাট জেলা মহাসড়ক (জেড-৫৫৫৪) যথাযথ মান ও প্রশস্ততায় উন্নীতকরণ’, ‘পুনর্ভবা নদীর ওপর ১১২.৫৬৬ মিটার কাহারোল সেতু নির্মাণ এবং বীরগঞ্জ-কাহারোল জেলা মহাসড়ক (জেড-৫০০৭) যথাযথ মানে উন্নীতকরণ প্রকল্প’, ‘গোবিন্দগঞ্জ-ঘোড়াঘাট-বিরামপুর-ফুলবাড়ী-দিনাজপুর (আর-৫৮৫) আঞ্চলিক মহাসড়ককে যথাযথ মানে উন্নীতকরণ’, ‘জামালপুর-ধানুয়া-কামালপুর-রৌমারী-দাঁতভাঙ্গা সড়ক প্রশস্তকরণ ও মজবুতিকরণ (জেড-৪৬০৬) (কুড়িগ্রাম অংশ)’, ‘ভূরুঙ্গামারী-সোনাহাট স্থলবন্দর-ভিতরবন্দ-নাগেশ্বরী মহাসড়কের দুধকুমর নদীর ওপর সোনাহাট সেতু নির্মাণ’ এবং ‘ঠাকুরগাঁও-বালিয়াডাঙ্গী-নেকমরদ-রাণীসংকৈল-পীরগঞ্জ-বীরগঞ্জ জেলা মহাসড়ক (জেড-৫০০২) এর রাণীসংকৈল-পীরগঞ্জ অংশ যথাযথ মানে উন্নীতকরণ’ প্রকল্প।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আইএমইডির ভারপ্রাপ্ত সচিব আবুল মনসুর মো. ফয়েজ-উল্লাহ জাগো নিউজকে বলেন, ‘একেবারে শূন্য কথাটা ঠিক নয়। প্রকল্পগুলো শুরু হয়েছে বেশিদিন হয়নি। এগুলোর প্রশাসনিক অনুমোদন, প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ, অর্থ ছাড়- এগুলোতে শুরুতে একটু সময় লাগে। এ সময়টা ওরা নিচ্ছে, এটা হয়ে যাবে।’

এর মধ্যে তিনটি প্রকল্প অনেক আগের। সেগুলোর বিশেষ কোনো অগ্রগতি নাই। এ বিষয়ে আবুল মনসুর বলেন, ‘ওগুলোর কথা আমি এ মুহূর্তে বলতে পারছি না।’

ধীর অগ্রগতির প্রকল্প

ধীর অগ্রগতি-সম্পন্ন প্রকল্প ২৩টি। এর বড় অংশের সময় বাড়াতে হয়েছে, তবু শেষ হয়নি প্রকল্পের কাজ। অন্যগুলোর প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হতে চললেও কাজ সম্পন্ন হওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ অগ্রগতি নেই।

এই ২৩ প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে- ‘রংপুর বিভাগীয় সদর দফতর নির্মাণ প্রকল্প (সংশোধিত)’ (সেপ্টেম্বর, ২০১৬ থেকে ডিসেম্বর, ২০১৯ পর্যন্ত), ‘ফিজিবিলিটি স্ট্যাডি ফর ডেভেলপমেন্ট অব দিঘীপাড়া কোল ফিল্ড অ্যাট দিঘীপাড়া, দিনাজপুর, বাংলাদেশ’ (জানুয়ারি, ২০১৭ থেকে জুন, ২০১৯ পর্যন্ত), ‘বিদ্যুৎবিতরণ ব্যবস্থা উন্নয়ন প্রকল্প, রংপুর জোন’ (জানুয়ারি, ২০১৬ থেকে ডিসেম্বর, ২০১৯ পর্যন্ত) ‘গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক মহাসড়ক যথাযথ মান ও প্রশস্ততায় উন্নীতকরণ (রংপুর জোন)’ (২০১৭ সালের মার্চ থেকে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত), ‘কুড়িগ্রাম-রাজারহাট-তিস্তা জেলা মহাসড়ক উন্নয়ন (প্রথম সংশোধিত) ’ (২০১৯ সালের জুলাই থেকে ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত)।

‘রংপুর বিভাগ গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন (দ্বিতীয় পর্যায়)’ (২০১৭ সালের অক্টোবর থেকে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত), ‘গাইবান্ধা জেলা সুন্দরগঞ্জ উপজেলাধীন তিস্তা নদীর ওপর ১৪৯০ মি. দীর্ঘ পিসি গার্ডার ব্রিজ নির্মাণ (প্রথম সংশোধিত)’ (২০১৩ সালের জুলাই থেকে ২০১৭ সালের জুন পর্যন্ত), ‘গাইবান্ধা পৌরসভার ঘাঘট লেক উন্নয়ন (প্রথম সংশোধিত)’ (২০১৬ সালের জুলাই থেকে ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত), ‘সাবেক ছিটমহল এলাকাসমূহকে বিশেষ গুরুত্ব প্রদানপূর্বক লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, পঞ্চগড় ও নীলফামারী জেলায় নিরাপদ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন’ (২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত)।

‘যমুনা নদীর ডান তীরের ভাঙন হতে গাইবান্ধা জেলার সদর উপজেলা ও গণকবরসহ ফুলছড়ি উপজেলার বিভিন্ন স্থাপনা রক্ষা’ (২০১৭ সালের জুলাই থেকে ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত), ‘দিনাজপুর জেলার সদর উপজেলাধীন গৌরীপুর নামক স্থানে খরা মৌসুমে সম্পূরক সেচ প্রদানের লক্ষে পুনর্ভবা নদীর ওপর সমন্বিত পানি নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো নির্মাণ (প্রথম সংশোধিত)’ (২০১৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত), ‘শতরঞ্জি শিল্পের উন্নয়ন, রংপুর (দ্বিতীয় পর্যায়)’, ‘ঠাকুরগাঁও চিনিকলের পুরাতন যন্ত্রপাতি প্রতিস্থাপন এবং সুগার বিট থেকে চিনি উৎপাদনের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সংযোজন (সংশোধিত)’ (২০১৩ সালের জুলাই থেকে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত), ‘বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ উন্নয়ন’ (২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত), ‘হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ উন্নয়ন’ (২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত), ‘ড. এম ওয়াজেদ মিয়া টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, পীরগঞ্জ, রংপুর স্থাপন, (প্রথম সংশোধিত)’ (২০১৫ সালের জুলাই থেকে ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত), ‘লালমনিরহাট টেক্সটাইল ইন্সটিটিউট’ (২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত), ‘জেলাপর্যায়ে আইটি/হাইটেক পার্ক স্থাপন (১২টি জেলায়) (২০১৭ সালের জুলাই থেকে ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত)।

‘উত্তরাঞ্চলের অতিদরিদ্রদের কর্মসংস্থান নিশ্চিতকরণ কর্মসূচি (দ্বিতীয় পর্যায়)’ (২০১৪ সালের এপ্রিল থেকে ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত), ‘গাইবান্ধা সমন্বিত পল্লী দারিদ্র্য দূরিকরণ’ (২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত), ‘পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (আরডিএ) রংপুর স্থাপন’ (২০১৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত), ‘কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দুগ্ধ ও মাংস উৎপাদনের লক্ষ্যে গঙ্গাচড়া উপজেলায় (রংপুর) ডেইরি সমবায়ের কার্যক্রম সম্প্রসারণ’ (২০১৬ সালের জুলাই থেকে ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত) এবং ‘বাংলাদেশের বিদ্যুৎবিহীন প্রত্যন্ত চর এলাকায় সৌরশক্তির উন্নয়ন’ (২০১৮ সালের মার্চ থেকে ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত)।

পিডি/এমএআর/এমকেএইচ

আপনার মতামত লিখুন :


আরও পড়ুন