খেলাপি গিলে খাচ্ছে ব্যাংকের মুনাফা

মো. শফিকুল ইসলাম
মো. শফিকুল ইসলাম মো. শফিকুল ইসলাম , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১২:০১ পিএম, ০৬ জুন ২০১৯

# এক বছরে মুনাফা কমেছে সাড়ে ৫৭ শতাংশ
# মন্দ ঋণের প্রভিশন রাখতে গিয়ে কমছে মুনাফা

ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ফেরত দিচ্ছে না। বাড়ছে মন্দ বা খেলাপি ঋণের পরিমাণ। এ কারণে ব্যাংকগুলোকে রাখতে হচ্ছে নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন। এতে করে কমছে মুনাফা। ফলে মুনাফা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০১৮ সালে পরিচালন মুনাফা দাঁড়িয়েছে ২৬ হাজার ৬৪০ কোটি টাকা। যা আগের বছরের তুলনায় ৮ শতাংশ বেশি। আগের বছর পরিচালন মুনাফা হয় ২৪ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা। তবে ব্যাংক খাতে পরিচালন মুনাফা বাড়লেও খেলাপির বিপরীতে প্রভিশন রাখতে গিয়ে কমেছে নিট মুনাফা।

২০১৮ সালে নিট মুনাফা হয়েছে চার হাজার ৪০ কোটি টাকা। যা আগের বছরের তুলনায় সাড়ে ৫৭ শতাংশ কম। ২০১৭ সালে নিট মুনাফা ছিল ৯ হাজার ৫১০ কোটি টাকা। আর ২০১৬ সালে নিট মুনাফা হয় আট হাজার ৩১০ কোটি টাকা এবং ২০১৫ সালে ব্যাংকগুলোর মুনাফা হয় সাত হাজার ৯২০ কোটি টাকা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে ঋণ বিতরণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯ লাখ ১১ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৩ হাজার ৯১১ কোটি টাকা, যা ডিসেম্বর’১৭ শেষে ছিল ৭৪ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা বা ৯ দশমিক ৩১ শতাংশ। অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৯ হাজার ৬০৮ কোটি টাকা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের যে পরিমাণ ঋণ বিতরণ করে তার বেশির ভাগই আমানতকারীদের অর্থ। আমানতকারীদের অর্থ যেন কোনো প্রকার ঝুঁকিতে না পড়ে সে জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা আছে।

আরও পড়ুন : বিশেষ সুবিধা পাচ্ছেন ঋণখেলাপিরা

নিয়ম অনুযায়ী, ব্যাংকের অশ্রেণিকৃত বা নিয়মিত ঋণের বিপরীতে দশমিক ২৫ থেকে পাঁচ শতাংশ হারে প্রভিশন রাখতে হয়। নিম্নমান বা সাব স্ট্যান্ডার্ড ঋণের বিপরীতে রাখতে হয় ২০ শতাংশ, সন্দেহজনক ঋণের বিপরীতে ৫০ শতাংশ এবং মন্দ বা কুঋণের বিপরীতে ১০০ শতাংশ প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। ব্যাংকের আয় খাত থেকে অর্থ এনে এ প্রভিশন সংরক্ষণ করা হয়। খেলাপি ঋণ বাড়লে, আর সে অনুযায়ী ব্যাংকের আয় না হলে প্রভিশন ঘাটতি দেখা দেয়।

ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, প্রভিশন ঘাটতি থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক শেয়ারহোল্ডাদের জন্য কোনো লভ্যাংশ ঘোষণা করতে পারে না।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ব্যাংকগুলো যাচাই-বাছাই না করেই ঋণ দিচ্ছে। যা ঋণের অর্থ নিয়মিত আদায় হচ্ছে না। অন্যদিকে বিশেষ সুবিধায় এসব পুনঃতফসিল করা হলেও ঋণের অর্থ পরিশোধ করছে না। ফলে বেড়েই চলছে খেলাপি ঋণ। আর এ খেলাপি ঋণই এখন ব্যাংকের বড় সমস্যা হয়েছে দাঁড়িয়েছে। কারণ খেলাপির বিপরীতে প্রভিশন রাখতে হয়। আর এটি রাখতে গিয়ে ব্যাংকগুলো মুনাফা কমে যাচ্ছে।

তাই খেলাপি ঋণ না কমলে ব্যাংক খাতের স্বাভাবিক হবে না। এ জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংককে কঠোর হতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারকে সহযোগিতা করতে হবে বলে পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

আরও পড়ুন : খেলাপি ঋণ আদায়ে সন্তুষ্ট নয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক

বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন-২০১৮ তথ্য বলছে, ব্যাংক খাতের বিতরণ করা ঋণের বেশিরভাগ খেলাপি হচ্ছে শিল্প খাতে। ফলে পুনঃতফসিলও বেশি হচ্ছে এ খাতে। আর পুনঃতফসিললের মধ্যে নিয়মিত করা ৩০ শতাংশ ঋণ আবার পরের বছরেই খেলাপি হয়ে যাচ্ছে।

২০১৮ সালে দেশের ব্যাংকগুলোতে ২৩ হাজার ২১০ কোটি টাকার খেলাপির ঋণ পুনঃতফসিলের মাধ্যমে নিয়মিত করা হয়েছে। যা তার আগের বছরের চেয়ে ২৪ শতাংশ বেশি। এভাবে গত পাঁচ বছরে প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল হয়েছে দেশের ব্যাংকিং খাতে।

জানা গেছে, সম্ভাব্য খেলাপি হওয়া থেকে বিরত থাকতে এবং খেলাপি হওয়ার পর তা নিয়মিত করতে পুনঃতফসিল করেন ঋণগ্রহীতারা। পুনঃতফসিল করতে নির্ধারিত হারে নগদ ডাউন পেমেন্ট দেয়ার নিয়ম রয়েছে। ২০১২ সালে ঋণ পুনঃতফসিলের পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা জারি করা হয়। তবে ২০১৩ সালে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বিবেচনায় শিথিল শর্তে ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দেয়া হয়।

আরও পড়ুন : আমাদের কেউ ঋণ দিতে চায় না

এর পরের বছর থেকে ব্যাংকগুলোর ঋণ পুনঃতফসিলের গতি বেড়ে যায় অস্বাভাবিক হারে। ২০১৪ সালে ১২ হাজার ৩৫০ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ পেয়েছিলেন খেলাপি গ্রাহকরা। এরপর ২০১৫ সালে ১৯ হাজার ১৪০ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়। ২০১৬ সালে ১৫ হাজার ৪২০ কোটি টাকা এবং ২০১৭ সালে ১৯ হাজার ১২০ কোটি টাকা ঋণ পুনঃতফসিল করার সুযোগ পায় খেলাপি গ্রাহকরা। সব মিলিয়ে গত পাঁচ বছরে ৮৯ হাজার ২৪০ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলের মাধ্যমে নিয়মিত করেছে ব্যাংকগুলো। এতে করে কাগজে কলমে ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা ভালো হলেও বাস্তবে অবস্থা খুবই নাজুক।

এসআই/এএইচ/এমএস