প্রতিষ্ঠার ৭০ বছর : আদর্শ থেকে বহু দূরে আ. লীগ

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮:২৭ পিএম, ২১ জুন ২০১৯

একটি দল। একটি দেশ। উভয়ের সমর্থক শব্দ যেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠার মাত্র দু’দশকের মধ্যেই একটি স্বাধীন দেশের জন্ম দেয়া যায়, তা-ই দেখিয়েছেন তিনি।

মূলধারার রাজনীতিতে তুমুল জনপ্রিয় আওয়ামী লীগ দলটির আদর্শগত অবস্থান এখন কোথায়? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, ইতিহাসবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন এ প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা এখনও তুঙ্গে। তবে রাজনৈতিক আদর্শ থেকে বিচ্যুতি ঘটেছে দলটির, এতে কোনো সন্দেহ নেই।’

প্রতিষ্ঠার ৭০ বছরে পা রাখছে বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া দল- আওয়ামী লীগ। ২০২১ সালে উদযাপন হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের সুবর্ণ জয়ন্তী উৎসব। জন্ম নেয়ার সাত দশকে দক্ষিণ এশিয়ায় অন্যতম ঐতিহ্যবাহী দলে পরিণত হয়েছে আওয়ামী লীগ। স্বাধীনতার প্রায় অর্ধশত বছরে এসে বাংলাদেশ এখন হাজারও উন্নয়নের গল্পের কথা বলে। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা দীর্ঘ ৩৮ বছর নেতৃত্ব দিয়ে যেমন দলটিকে ঐক্যবদ্ধ রেখেছেন, তেমনি চারবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হয়ে বাংলাদেশকেও এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।

তবে রাজনীতির এ পথচলায় বারবার পিছলে যাচ্ছে বাংলাদেশ, থমকে যাচ্ছে গণতন্ত্র, যার দায় আওয়ামী লীগও এড়াতে পারে না। উন্নয়ন রাজনীতির এমন দিনে মার খাচ্ছে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ধারা। বিশেষ করে সংসদীয় শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পর গত দুই জাতীয় নির্বাচনে গণতন্ত্র যেভাবে হোঁচট খেয়েছে, তা নিয়েই শঙ্কা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।

যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. আলী রীয়াজ এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘গত দশ বছরে বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে রাজনীতির। রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি ভেঙ্গে পড়েছে এবং এটি-ই বাস্তব। রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগও কার্যত এ দেশে আর উপস্থিত নেই।’

গত এক দশকে বাংলাদেশ এগিয়েছে বহু দূর। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ায় এক ঈর্ষার নাম ‘বাংলাদেশ’। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য ও সামাজিক নিরাপত্তায় বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার প্রশংসা করছে বিশ্ব সংস্থাগুলোও।

কিন্তু বাংলাদেশের এমন অগ্রযাত্রাতেও সন্তুষ্ট নন অর্থনীতিবিদ ও গবেষক ড. আকবর আলি খান। তিনি বলেন, বাংলাদেশের আজকের যে অগ্রগতি, তা সাধারণ মানুষের চেষ্টার ফল। উদ্যোমী কৃষক-তরুণ, পোশাক ও প্রবাসী শ্রমিকদের সমন্বিত শ্রমে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। এখানে রাজনৈতিক সরকারগুলোর কোনো কৃতিত্ব নেই। বরং সরকারগুলো সাধারণ মানুষের এগিয়ে যাওয়ার পথে বারবার প্রতিবন্ধকতা তৈরির চেষ্টা করেছে।’

আকবর আলি খান বলেন, ‘জবাবদিহিতা ও সুশাসনের অভাব গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার প্রধানতম অন্তরায়। এখন দেশে গণতন্ত্রই নেই। গণতন্ত্রহীন উন্নয়নে যেকোনো সময়ে বিপর্যয়ে পড়তে পারে দেশ!’

অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা ছিল বাস্তবতা আর বিশেষ আদর্শের ভিত্তিতে। ধর্মীয় আগ্রাসনের বিরোধী অবস্থান নিয়েই আওয়ামী লীগ রীতিমতো গণমানুষের দলে পরিণত হয়। আমরা বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগকে সমানতালে জনপ্রিয় হতে দেখেছি আদর্শের কারণেই। অথচ আওয়ামী লীগ সে আদর্শ থেকে এখন বহু দূরে।

তিনি বলেন, বাস্তবতার নিরিখে একটি দলের নীতিতে সংযোজন-বিয়োজন হতেই পারে। কিন্তু হেফাজতে ইসলামের মতো সংগঠনের সঙ্গে আপস করা কোন ধরনের বাস্তবতা, তা অবশ্যই ভাববার আছে। হেফাজতের কারণে পাঠ্যবই থেকে ১৭টি রচনা বাতিল করা হলো। আধুনিক শিক্ষার বালাই না থাকলেও কওমী শিক্ষার্থীদের ডিগ্রি পাশের সনদ দেয়া হলো। সংবিধান সংশোধন করে রাষ্ট্রধর্ম ইসলামকেই রাখা হলো। এসব আওয়ামী লীগের আদর্শের সঙ্গে যায় না। অথচ আওয়ামী লীগের কাছে ধর্মনিরপেক্ষ নীতির প্রত্যাশা একটু বেশি-ই।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. আলী রীয়াজ বলেন, ‘গণতন্ত্রের কথা বলে, রাষ্ট্র, দল ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে যেভাবে গুলিয়ে ফেলা হলো এ নির্বাচনে, তা কোনোভাবেই প্রত্যাশিত নয়। এমন চিত্র হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ও জিয়াউর রহমানের সময় কিছু ক্ষেত্রে দেখা গেছে। কিন্তু মাত্রাটা তো আপনাকে আমলে নিতে হবে। আপনি যদি বলেন, জিয়াউর রহমান ও এরশাদ এটি করেছেন এবং সেটা জোর গলায় বলেন, দেখবেন কেমন শোনায়!’

এএসএস/এমএআর/এমকেএইচ

আপনার মতামত লিখুন :