কাশ্মীর যুদ্ধ থেকে ফিরে আসতে পারবে না ভারতও

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১১:০১ এএম, ২৭ আগস্ট ২০১৯

আলতাফ পারভেজ। লেখক ও গবেষক। গবেষণা করছেন দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসের নানা প্রসঙ্গ নিয়ে। লিখছেন এ অঞ্চলের রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ নিয়েও। কাশ্মীর পরিস্থিতি এবং আসামের এনআরসি (জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন) ইস্যু নিয়ে মুখোমুখি হন জাগো নিউজ’র। নির্মোহ আলোচনা করেন দুটি বিষয়েই।

বলেন, আরএসএস’র হিন্দুত্ববাদ নীতির প্রতিফলন ঘটছে আসাম আর কাশ্মীরে। বিজেপি হচ্ছে আরএসএস’র অঙ্গসংগঠন। মূলত, মোদি সরকার হচ্ছে আরএসএস’র সরকার। তারা হিন্দুত্ববাদ-কে সামনে এনে জঙ্গি বা জাতীয়তাবাদে রূপ দিয়েছে।

এ গবেষকের সঙ্গে দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে গুরুত্ব পায় রোহিঙ্গা ইস্যুও। তিন পর্বের সাক্ষাৎকারের আজ থাকছে দ্বিতীয়টি।

জাগো নিউজ : প্রথম পর্বে ভারতে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রসঙ্গ তুলেছিলেন। আরএসএস বা বিজেপির এ হিন্দুত্ববাদের নীতি ভারতকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে?

আলতাফ পারভেজ : বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারতে বিভাজন ক্রমশই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এটি ইতোমধ্যে দেশটির অনেক ক্ষতি করে ফেলেছে।

ভারত একটি বহুজাতিক, বহু ভাষার এবং বহু ধর্মের দেশ। বিজেপি মনে করছে, তাদের ক্ষমতায় যাওয়া এবং ক্ষমতায় থাকতে হলে হিন্দুত্ববাদের রাজনীতিকেই সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। ভারতের রাজনীতির চারটি ধারা আছে। সেক্যুলারিজম বা ধর্মনিরপেক্ষ, যেটি জহরলাল নেহ্রু প্রতিষ্ঠা দিয়েছিলেন। আরএসএস’র হিন্দুত্ববাদ, দলিতবাদ ও আঞ্চলিকতাবাদ। ভারতে এ চারটি মতবাদের লড়াই চলছে।

বিজেপি বিভিন্ন আঞ্চলিকতাবাদকে সঙ্গে নিয়ে প্রথমে নেহ্রুর ধর্মনিরপেক্ষতাবাদকে পরাজিত করেছে। কংগ্রেস ও কমিউনিস্টরা প্রায় ধরাশায়ী। বিজেপির পরবর্তী টার্গেট হবে দলিতরা এবং এখানেও তারা সফল হবে।

জাগো নিউজ : দলিতরা তো হিন্দুধর্মকেই ধারণ করে...

আলতাফ পারভেজ : হ্যাঁ, তারা হিন্দুধর্মের হলেও আরএসএসকে ধারণ করে না। মোদির সরকার হিন্দুত্ববাদ প্রতিষ্ঠা দিতে গিয়ে দলিতদের নানাভাবে বিভাজিত করে ফেলবে। বিভাজনটাই ভারতের ইস্যু হয়ে উঠবে।

মুসলিম বিদ্বেষ, খ্রিস্টান বিদ্বেষ, পাকিস্তান বিদ্বেষ ছাড়া কিন্তু ভারতে আর কোনো ইস্যু দেখতে পাচ্ছেন না। শ্রমিকদের অধিকার, দুর্নীতি, অর্থনীতি আর কোনো ইস্যু নাই। এটি বিজেপির বড় সফলতা বলে মনে করি। ধর্মের বিকৃত মোড়কে রাজনীতিকে বেঁধে ফেলে মানুষের চিন্তার জায়গাটাই পরিবর্তন করে ফেলেছে।

জাগো নিউজ : এমন ভারত কিন্তু বিশ্ব আগে দেখেনি…

আলতাফ পারভেজ : বিশ্ব মোদির বিরুদ্ধে দাঁড়াবে, আমি তা মনে করি না। টাটা, বিড়লা, তথা মুকেশ আম্বানিদের সঙ্গে বিশ্ব কর্পোরেট নীতি যায়। গত নির্বাচন তো অনেক কিছুরই মুখোশ খুলে দিল।

আরএসএস যে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে ভারতের আদালতও তাতে সায় দিচ্ছে। সরকার সিদ্ধান্ত নিল উপজাতীয় এলাকাগুলো বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে দেয়া যাবে। আদালতও সেই সিদ্ধান্ত দিল। আমরা জানি, আসামের দুটি সম্পদ আছে। চা ও তেল। মোদি চাইছে, আসামের তেল বেসরকারি খাতে দিয়ে দেয়া হোক। আর চা তো আগেই বেসরকারি খাতে চলে গেছে। চা ও তেল নিয়ে আসামিরা যাতে আন্দোলন করতে না পারে, সে কারণে এনআরসি ইস্যু সামনে আনা হলো। এখন কে বৈধ আর কে অবৈধ নাগরিক, তা নিয়েই আসামিরা ব্যস্ত আছেন।

জাগো নিউজ : আলোচনা হচ্ছিল কাশ্মীর প্রসঙ্গে…

আলতাফ পারভেজ : কাশ্মীরে সংঘাত দীর্ঘমেয়াদে বাড়বে এবং তা ভয়াবহ রূপ নেবে। ভারতের দখলনীতি কাশ্মীরিরা কোনোদিনই মেনে নেবে না। কারণ তাদের মেনে নেয়ার কোনো রেকর্ড নাই।

তবে কাশ্মীরিরা আপাতত নীরব থাকবে, ঠিক উঠপাখি যেভাবে বালুর নিচে মাথা দিয়ে রাখে। ঝড় চলে গেলে ফের ঘুরে দাঁড়াবে এবং কাশ্মীর উত্তাল হবে। এটিই কাশ্মীরের ইতিহাস।

জাগো নিউজ : তার মানে মোদির দখলনীতি ব্যর্থ হবে!

আলতাফ পারভেজ : ব্যর্থ শব্দটা প্রয়োগের চাইতে আমি বলব, বিজেপি সরকারের বর্তমান কাশ্মীর নীতি দীর্ঘমেয়াদে ভারতের বড় ক্ষতির কারণ হবে।

জাগো নিউজ : ক্ষতির বিষয়টি যদি ব্যাখ্যা করতেন?

আলতাফ পারভেজ : ষাটের দশকে ভারত ও পাকিস্তানের জিডিপির সমান ছিল কোরিয়া-থাইল্যান্ডের জিডিপি। এতদিনে ভারত ও পাকিস্তানের জিডিপি হয়তো বেড়েছে দ্বিগুণ, কিন্তু কোরিয়া-থাইল্যান্ডের জিডিপি বেড়েছে বহুগুণ। এর কারণ হচ্ছে ভারত ও পাকিস্তান নিজেরাই নিজের দেশের মানুষের সঙ্গে যুদ্ধ করছে। যুদ্ধের ব্যয় বাড়লে সাধারণ মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ন হবেই।

ভারতের কর্পোরেটরা, আমলারা যুদ্ধ চায়। সামরিক ক্রয়ে তাদের স্বার্থ থাকে। ভারতের অনেক মানুষ না খেয়ে মরছে। অথচ মিসাইল পরীক্ষা করে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করছে। যুদ্ধ করে কেউ ফিরে আসতে পারে না। ভারতও ফিরে আসতে পারবে না কাশ্মীর যুদ্ধ থেকে। সেনাবাহিনী না থাকলেও সেখানে যুদ্ধ থাকবেই। কাশ্মীরিরাও প্রস্তুত দীর্ঘমেয়াদে যুদ্ধ করতে।

জাগো নিউজ : বিশ্ব কীভাবে দেখবে?

আলতাফ পারভেজ : জাতিসংঘ ভারত-পাকিস্তানকে সমঝোতায় আসতে বলছে। তবে আমার মনে হয় না, বিশ্ব মোড়লরা বাজার হারাতে ভারতের ওপর হস্তক্ষেপ করবে। তাদের কাছে অস্ত্রেরও বড় বাজার ভারত।

চীন আলোচনার কথা বলছে। তবে এর চেয়ে বেশি কিছু করবে বলে মনে হয় না। আর মুসলমানদের জন্য বিশ্ব দরদ দেখাবে তাও বিশ্বাস করি না। চীন, যুক্তরাষ্ট্র নিজেরাও মুসলিম বিদ্বেষী মনোভাব প্রকাশ করছে।

জাগো নিউজ : ভারত-পাকিস্তানের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে। আলোচনায় আসছে এটিও…

আলতাফ পারভেজ : পাকিস্তানের অর্থনীতি বড় একটি যুদ্ধ অনুমোদন করে না। ফলে প্রথমত, পাকিস্তান এমন কোনো যুদ্ধে জড়াবে না যেখানে তারা পরাজিত হয়। দ্বিতীয়ত, পাকিস্তান এখন অধিক মনোযোগী হবে আফগানিস্তানে। সুতরাং কাশ্মীরে মৌন সমর্থন থাকলেও এ মুহূর্তে পাকিস্তান সেখানে সামরিক সহায়তা দেবে, তা মনে করছি না।

জাগো নিউজ : কাশ্মীরের তরুণদের নিয়ে নানা আলোচনা গুরুত্ব পাচ্ছে…

আলতাফ পারভেজ : তরুণদের মধ্যে হতাশা আছে। এরপরও তারা নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনে আছে। যদি উপায় না থাকে তাহলে তরুণদের মধ্যে জঙ্গি মনোভাব প্রকাশ পেতেই পারে। এরপরও আমার মনে হয় না, তরুণরা নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়বে। হলে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন ব্যর্থ হবে।

জাগো নিউজ : কাশ্মীরিরা নিজেদের মধ্যে কোনো ফোরাম তৈরি করে আলোচনায় আসতে পারে কি-না?

আলতাফ পারভেজ : আপাতত সেটা অনিশ্চিত। আবার ভারতের সামরিক শক্তিকে প্রতিরোধ করে তারা মুক্তি পাবে, এটিও একটি উচ্চাভিলাষী চিন্তা। কাশ্মীরে হত্যা, গণহত্যা হবে। কিন্তু কে জিতবে, তা বলা যাবে না। হয়ত আমরাও এ যুদ্ধের শেষ দেখে যেতে পারব না।

এএসএস/এমএআর/পিআর

কাশ্মীরে হত্যা, গণহত্যা হবে। কিন্তু কে জিতবে, তা বলা যাবে না। হয়ত আমরাও এ যুদ্ধের শেষ দেখে যেতে পারব না

পাকিস্তানের অর্থনীতি বড় একটি যুদ্ধ অনুমোদন করে না। ফলে প্রথমত, পাকিস্তান এমন কোনো যুদ্ধে জড়াবে না যেখানে তারা পরাজিত হয়

ভারতের কর্পোরেটরা, আমলারা যুদ্ধ চায়। সামরিক ক্রয়ে তাদের স্বার্থ থাকে। ভারতের অনেক মানুষ না খেয়ে মরছে। অথচ মিসাইল পরীক্ষা করে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করছে

কাশ্মীরিরা আপাতত নীরব থাকবে, ঠিক উঠপাখি যেভাবে বালুর নিচে মাথা দিয়ে রাখে। ঝড় চলে গেলে ফের ঘুরে দাঁড়াবে এবং কাশ্মীর উত্তাল হবে। এটিই কাশ্মীরের ইতিহাস