আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুর আদর্শ থেকে অনেক দূরে সরে গেছে

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৭:৪৩ পিএম, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০

শাহরিয়ার কবির। বিশিষ্ট সাংবাদিক, লেখক ও গবেষক। ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি। সংখ্যালঘু নির্যাতন বন্ধ এবং যুদ্ধাপরাধ বিচারের দাবিতে সোচ্চার ছিলেন দীর্ঘকাল। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের সম্পর্ক উন্নয়নের বিষয়ে নানা ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে সম্প্রতি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে ‘ভারত অকৃত্রিম বন্ধু’ উল্লেখ করে দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রাখার অভিমত ব্যক্ত করেন।

রাষ্ট্রক্ষমতায় শেখ হাসিনা থাকলে উদ্বেগের কোনো কারণ নেই বলে মন্তব্য করেন। ভারত-চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের নানা দিক নিয়ে মুখোমুখি হন জাগো নিউজের। আলোচনা করেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রসঙ্গেও। তিন পর্বের সাক্ষাৎকারের আজ থাকছে দ্বিতীয়টি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সায়েম সাবু

জাগো নিউজ : আগের পর্বে বঙ্গোপসাগরে চীন-আমেরিকার আধিপত্যের কথা বলছিলেন। এখানে ভারতেরও আধিপত্য আছে...

শাহরিয়ার কবির : ভারতের আধিপত্য তার নিজের অংশে। বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে মামলা করে সীমানা নির্ধারণ করেছে। শেখ হাসিনার সময়ই আমরা জিতলাম। শেখ হাসিনা বলেছেন, আমার সীমানায় কাউকে ঢুকতে দেব না। তিনি পরিষ্কার করে বলেছেন, সোনাদিয়া পোর্ট কাউকে দেয়া হবে না। কিন্তু বেগম জিয়া তো দিয়ে দেয়ার প্রস্তাব দিয়েই রেখেছেন।

জাগো নিউজ : খালেদা জিয়ার প্রস্তাব কিন্তু অতীত। দীর্ঘদিন ক্ষমতাহারাও খালেদা জিয়া...

শাহরিয়ার কবির : ক্ষমতার তো রদবদল হতেই পারে। খালেদা জিয়া ক্ষমতায় আসতেও পারেন।

জাগো নিউজ : কিন্তু যিনি ক্ষমতায় নেই, তাকে নিয়ে এখন এ শঙ্কার কারণ কী?

শাহরিয়ার কবির : না-না, আমাকে তো প্রস্তুত থাকতে হবে। ক্ষমতার পালা বদলের সময় আমাকে এ হিসাবগুলো মনে রাখতে হবে। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় না থাকলে বা জামায়াত-বিএনপি ক্ষমতায় এলে কী কী সমস্যা হতে পারে, তার জন্য তো প্রস্তুত থাকতে হবে।

জাগো নিউজ : আপনাদের এই প্রস্তুত থাকা ভারতকে সুবিধা দিচ্ছে কি-না? অনেকেই তো অভিযোগ করেন, আপনারা ভারতের পক্ষ নেন, যা ভারতের দখলদারিত্বকে বৈধতা দেয়?

শাহরিয়ার কবির : বাংলাদেশে ভারতের দখলদারিত্ব কোন জায়গায়?

জাগো নিউজ : গরু পাচারের অভিযোগে বিএসএফ সীমান্তে পাখির মতো গুলি করে মানুষ হত্যা করছে। এটি দখলদারিত্বর-ই প্রকাশ এবং তারা বহু বছর ধরে এটা করছে…

শাহরিয়ার কবির : সীমান্তে হত্যাকাণ্ড কখনই আমরা সমর্থন করি না। ভারতের সঙ্গে আমাদের অভিন্ন নদী সমস্যা আছে। কিন্তু আমরা মনে করি, প্রতিটি সমস্যাই আলোচনা করে মীমাংসা করতে হবে। যুদ্ধ করে মীমাংসা হবে না।

jagonews24

জাগো নিউজ : ভারত মুক্তিযুদ্ধে সহায়তা করল। অথচ এ সমস্যাগুলো অর্ধশত বছর ধরে জিইয়ে রাখছে…

শাহরিয়ার কবির : এ সমস্যাগুলো এখনকার নয়। জল বণ্টন সমস্যা পাকিস্তান আমল থেকে রয়ে গেছে। কৃত্রিম একটি সীমারেখে টেনে দেয়া হলো, এক ভাই ভারতে রয়ে গেল, আরেক ভাই পাকিস্তানে। এগুলো তো বিবেচনায় নেয়া হয়নি। সীমান্ত বিরোধ তো পাকিস্তান আমল থেকেই। ছিটমহলের সমস্যা তো শেখ হাসিনার সরকার সমাধান করেছে। এখানে আমরা লাভবান হয়েছি। সমুদ্রের সীমায় আমরা লাভবান হয়েছি। আমাদের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে কোনো চুক্তি করেনি। এমন কোনো রেকর্ড আমাদের নেই।

কংগ্রেসের সঙ্গে আওয়ামী লীগের ভালো সম্পর্ক। কিন্তু বিজেপি সরকারের সঙ্গেও শেখ হাসিনার সরকার বন্ধুত্বসুলভ সম্পর্ক গড়েছে, যেখানে কংগ্রেস নেতা প্রণব মুখার্জিও ভূমিকা রেখেছেন। সম্পর্ক হবে রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের।

জাগো নিউজ : কিন্তু ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কটা দলীয় বিবেচনায়ই গুরুত্ব পায়?

শাহরিয়ার কবির : এখন কী কংগ্রেস ক্ষমতায় আছে? সম্পর্কটা আছে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের সঙ্গে ভারত নামক রাষ্ট্রের।

জাগো নিউজ : সামগ্রিক বিবেচনায় বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে ভারতবিরোধী মনোভাব বাড়ছে এবং আপনি তা অবগত আছেন…

শাহরিয়ার কবির : ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর থেকে বেশির ভাগ সময় ক্ষমতায় ছিল স্বাধীনতাবিরোধীরা। মৌলবাদী পাকিস্তানপন্থীরা ক্ষমতায় থেকে একটি প্রজন্মের মাথা থেকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মুছে ফেলা হয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য আমরা লড়াই করেছি। অথচ ধর্মনিরপেক্ষতা, বাঙালি জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র— সবই তো নির্বাসনে গেল। বাংলাদেশের গায়ে একটি ইসলামিক তকমা এঁটে দেয়া হলো। ইসলামী উম্মাহর সঙ্গে সম্পর্ক করা হয়েছে, বাংলাদেশকে পাকিস্তান বানানোর জন্য, যা গোলাম আযম চেয়েছিলেন।

এখন আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আমরা ১৯৭১ সালের চেতনায় থাকব নাকি ১৯৪৭ সালের চেতনায় ফিরে যাব। এটি মীমাংসা হলে বাকি সব প্রশ্নের উত্তর মিলে যাবে।

জাগো নিউজ : আওয়ামী লীগও দীর্ঘকাল ক্ষমতায় থাকছে এবং ভারতের সঙ্গে শেখ হাসিনার সরকারের বোঝাপড়ার বিষয়টি ইতিবাচক। তাহলে মানুষের মধ্যে ভারতবিরোধী মনোভাব বৃদ্ধি পাওয়ার কারণ এবং এর ফলাফল কী?

শাহরিয়ার কবির : আওয়ামী লীগের মধ্যে বিএনপি-জামায়াতও অনুপ্রবেশ করছে। আওয়ামী লীগের অনেকেই জামায়াতীকরণের রাজনীতি করছেন। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ থেকে অনেক দূরে সরে গেছে বর্তমান আওয়ামী লীগ।

রোহিঙ্গা নিয়ে বিএনপি-জামায়াত উসকানি দিয়েছিল, যাতে মিয়ানমারের সঙ্গে যুদ্ধ হয়। শেখ হাসিনা বলেছিলেন, আলোচনা করে সমাধান হবে। মিয়ানমার ১৯৭১ সালেও আমাদের বিপক্ষে ছিল এবং ১৯৭৮ সাল থেকে রোহিঙ্গা বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে। এরপরও আমি মনে করি, আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়েই সব সমস্যার সমাধান সম্ভব।

jagonews24

আপনি চাইলে সবকিছুই পরিবর্তন করতে পারেন, কিন্তু আপনি আপনার প্রতিবেশী পরিবর্তন করতে পারবেন না। আপনার এক পাশে মিয়ানমার আরেক পাশে ভারত। ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ করে সম্পর্ক নির্ধারণ করব, আমি তা মনে করি না।

জাগো নিউজ : রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে বললেন। এই প্রশ্নে চীন বড় একটি পক্ষ। সেই বিবেচনায় শেখ হাসিনার সরকার চীনকে গুরুত্ব দিচ্ছে কি-না, যাতে সমস্যা সমাধানে সহজ হয়…

শাহরিয়ার কবির : এত সোজা নয়। মিয়ানমারে চীনের স্বার্থ আছে। রাখাইন অঞ্চল চীনের জন্য মুক্ত করে দিতে হচ্ছে। সেখানে চীন কোনো উৎপাত দেখতে চায় না। আকিয়াব বন্দর চীনের দরকার। এখানে চীনের পরিষ্কার স্বার্থ রয়েছে। এ কারণে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাংলাদেশ যতবার জাতিসংঘে প্রস্তাব দিয়েছে চীন ততবারই ভেটো দিয়েছে। সুতরাং রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে চীনের কাছে প্রত্যাশার কিছু নেই।

জাগো নিউজ : তাহলে শেখ হাসিনা সরকারের চীনের প্রতি ঝুঁকে পড়ার কী কারণ থাকতে পারে?

শাহরিয়ার কবির : ঝুঁকে পড়ার কিছু নয়। ভারত-চীন সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ব্যালেন্স নীতি অনুসরণ করছে।

জাগো নিউজ : তাহলে আপনারা উদ্বিগ্ন কেন?

শাহরিয়ার কবির : আমরা সম্পর্ক নিয়ে উদ্বিগ্ন নই। আমরা কয়েকটি টার্ম চিন্তা করছি। চীন ঘুষ দিয়ে কাজ আদায় করছে, দেশটির গণমাধ্যমে এমন তথ্য প্রকাশ পাচ্ছে।

জাগো নিউজ : এই ঘুষ-দুর্নীতি তো বাংলাদেশেরও ঐতিহ্য…

শাহরিয়ার কবির : বাংলাদেশে ঘুষের প্রথা আছে বলে ভারত-পাকিস্তান-চীনকে আমরা ঘুষের জন্য অনুমোদন দিতে পারি না। বাইরের একটি দেশ এসে আমার প্রশাসনকে কুলষিত করবে, তা হতে পারে না। আফ্রিকার দেশগুলোতে চীন এমনই করেছে। চীনের কর্তৃত্ব বাড়লে অতিসহজেই পাকিস্তানের মতো বাংলাদেশকে কলোনি বানাতে পারবে।

জাগো নিউজ : শেখ হাসিনার এই ‘ব্যালান্স নীতি’ বাংলাদেশের জন্য লাভবান হওয়ার সুযোগ তৈরি করছে কিনা? বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যে অসম সম্পর্ক তাতে দর কষাকষির সুযোগ তৈরি হতে পারে কিনা?

শাহরিয়ার কবির : অবাধ বাণিজ্যের যুগে যেখানে লাভ বেশি ব্যবসায়ীরা সেখানে যাবেন। আমি বলছি, ঋণ নেয়ার কথা। ঋণ নেয়ার বেলায় বাংলাদেশকে অধিক সতর্ক থাকতে হবে। ঋণ কোন কোন শর্তে দিচ্ছে, ঋণের টাকা ছাড় দিতে কালক্ষেপণ করছে কিনা, তা ভাবতে হবে।

আমি বলছি না, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করতে হবে। আমি সতর্ক থাকার কথা বলছি। গণজাগরণ মঞ্চ থেকে ইমরান এইচ সরকার পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সকল সম্পর্ক বিচ্ছিন্নের কথা বললেন। আমি বললাম, তা কেন? পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের অনেক বোঝাপড়ার ব্যাপার আছে। সম্পর্ক ছিন্ন মানে, মুক্তিযুদ্ধে অপরাধের জন্য পাকিস্তানের ক্ষমা চাওয়ার দাবি, আমাদের অর্থ পাওনার দাবিও ছেড়ে দিতে হবে। সম্পর্ক সবার সঙ্গেই রাখতে হবে এবং সেটা দেশের স্বার্থ আগে জিইয়ে রেখে।

jagonews24

জাগো নিউজ : ভারত থেকে পার্শ্ববর্তী দেশগুলো মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। বাংলাদেশ ভারতকে কেন আগলে রাখবে?

শাহরিয়ার কবির : আমরা আগলে রাখছি কোথায়? আমাকে কি ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হবে। পাকিস্তান যুদ্ধের মানসিকতা রেখে কোথায় নেমে যাচ্ছে? আজ বাংলাদেশ পাকিস্তানের কাছে রোল মডেল। ভারতের সঙ্গে যুদ্ধের নীতি রেখে পাকিস্তানের গরিব মানুষ আরও গরিব হচ্ছে। পাকিস্তানিরাই সংশয় প্রকাশ করছে যে, রাষ্ট্রটি আদৌও টিকবে কিনা? ভারতে এখনও গণতন্ত্র আছে। জবাবদিহিতার জায়গা আছে। আর নেপাল সবসময়ই চীনের পক্ষে ছিল। আসলে প্রতিটি দেশ তার পররাষ্ট্রনীতি স্ব স্ব অবস্থান থেকে নির্ধারণ করে।

বাংলাদেশেরও নিজস্ব অবস্থান আছে। অতীতের যেকোনো সরকারপ্রধানের চেয়ে শেখ হাসিনার পররাষ্ট্রনীতি বিচক্ষণ। আমরা চীনের সঙ্গে সম্পর্ক নাকচ করার কথা বলছি না, সতর্ক থাকার কথা বলছি।

জাগো নিউজ : এই ‘সতর্ক’ থাকা ভারতের আধিপত্য বাড়িয়ে দিচ্ছে কিনা?

শাহরিয়ার কবির : বাংলাদেশে ভারতের কোনো আধিপত্য আছে বলে মনে করি না। এটি জামায়াতি প্রোপাগান্ডা। ১৯৭২ সাল থেকেই এমনটি বলা হচ্ছে। বরং ভারতীয় সংস্কৃতির আধিপত্য এখনও পাকিস্তানে রয়ে গেছে। আমরা উপনিবেশ ধারা থেকে বেরিয়ে এসেছি বহু আগে। পাকিস্তান কিন্তু পারেনি। বাংলাদেশকে কলোনি বানাতে পারে এমন কোনো শক্তি পৃথিবীতে নেই।

এএসএস/এমএআর/এমএস

অতীতের যেকোনো সরকারপ্রধানের চেয়ে শেখ হাসিনার পররাষ্ট্রনীতি বিচক্ষণ

ধর্মকে নাকচ করা যাবে না, কিন্তু রাষ্ট্র থেকে আলাদা রাখতে হবে

বাংলাদেশে ভারতের কোনো আধিপত্য আছে বলে মনে করি না

বাংলাদেশকে কলোনি বানাতে পারে এমন কোনো শক্তি পৃথিবীতে নেই

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]